বিকট শব্দে অতিষ্ঠ নগরবাসী

আজ ঢাকা মহানগর থাকবে এক মিনিট শব্দহীন

আব্দুল কাইয়ুম প্রকাশিত: অক্টোবর ১৫, ২০২৩, ১২:০২ এএম
  • শব্দদূষণের ফলে ১১.৮ শতাংশ ট্রাফিক পুলিশ কানে কম শোনেন
  • যানবাহন থেকে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ শব্দদূষণ হয়
  • শব্দদূষণে উচ্চ রক্তচাপ ও হূৎপিণ্ডের ক্ষতি হয়

যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করা গেলে শব্দদূষণ কমবে তবে আইনের সঠিক প্রয়োগ জরুরি
—আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার, পরিচালক, ক্যাপস

শব্দদূষণ বেড়েই চলছে। কোনোভাবেই তা হ্রাস করা সম্ভব হচ্ছে না। এ বিষয়ে বিভিন্ন আইন থাকলেও তেমন কার্যকর নেই। বিশেষ করে রাজধানীতে প্রাইভেটকার, মোটরসাইকেল ও গণপরিবহনগুলো যেন হর্ন বাজানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছে। তাছাড়াও শব্দদূষণের প্রধান কারণগুলো হলো বিভিন্ন যানবাহনে ব্যবহূত হাইড্রোলিক হর্ন, নির্মাণকাজে বিভিন্ন যন্ত্রপাতির ব্যবহার, রাজনৈতিক-সামাজিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উচ্চ শব্দে মাইক বা সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার, পটকা ফাটানোর উচ্চ শব্দ। এসব শব্দদূষণ শুধু ঢাকাতেই হয় এমনটা নয়, জেলা শহরগুলোতেও মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়েই যাচ্ছে। 

অথচ এশিয়ার দেশ নেপাল হর্নমুক্ত সিটি ঘোষণা করে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। শব্দদূষণের জন্য দায়ী গাড়ির চালকদের শাস্তির আওতায় আনতে পারলে এ সমস্যা কিছুটা হলেও লাঘব হবে। শব্দদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে মানুষকে সচেতন করতে আজ রোববার সকাল ১০টা থেকে ১০টা ১ মিনিট পর্যন্ত ঢাকা মহানগরে এক মিনিট শব্দহীন কর্মসূচি পালন করা হবে। গত ১২ অক্টোবর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মানববন্ধন থেকে গাড়িচালকদের মধ্যে শব্দসচেতনতামূলক লিফলেট ও স্টিকার বিতরণ করা হবে। ওই এক মিনিট হর্ন বাজানো থেকে তাদের বিরত থাকার জন্য আহ্বান জানানো হবে। 

শব্দদূষণের ফলে মানুষের কানের শ্রবণ শক্তি হ্রাস পাচ্ছে। শোনার সক্ষমতা কমে যায় কয়েকগুণ। এতে করে বধির হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। কানের ভেতরে ঝিঁঝি শব্দ, মাথাব্যথা, অস্বস্তি এবং মেজাজ খিটখিটে ভাব শব্দদূষণের কারণেই হয়। হূৎপিণ্ডের সমস্যা ও উচ্চ রক্তচাপ এবং হূৎপিণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয় শব্দদূষণের ফলে। অধিক সময় ধরে উচ্চমাত্রার শব্দে থাকলে মনোযোগ ক্ষমতা হ্রাস এবং স্মৃতিভ্রংশতা তৈরি হয়। শব্দদূষণের কারণে মানুষের মধ্যে অভিযোজন ক্ষমতা হারিয়ে যায়। এতে মানুষ ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। শিশুদের পড়াশোনায় মনোযোগ কমার প্রধান কারণও এটি। শব্দদূষণ মানুষের মাঝে বিভিন্ন রোগ ও জীবনমান কমিয়ে আনে। 

বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫-এর শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০০৬-এ উল্লেখ করা হয়েছে, রাজধানীতে শব্দের গ্রহণযোগ্যতা এলাকাভেদে রাতে সর্বোচ্চ মাত্রা ৪০ ডেসিবেল আর দিনে ৫০। আবাসিক এলাকায় রাতে ৪৫ ও দিনে সর্বোচ্চ ৫৫ ডেসিবেল শব্দ করা যাবে। কেউ আইন অমান্য করলে প্রথমবার অপরাধের জন্য এক মাস কারাদণ্ড বা অনধিক পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড এবং পরবর্তী অপরাধের জন্য ছয় মাস কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এ আইনের তেমন প্রয়োগ দেখা যায় না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ১৯৯৯ সালের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, মানুষের জন্য শব্দের গ্রহণযোগ্য মাত্রা ৫৫ ডেসিবেল আর বাণিজ্যিক এলাকার জন্য ৭০ ডেসিবেল। সংস্থাটির পক্ষ থেকে ২০১৮ সালের নির্দেশিকায় সড়কে শব্দের তীব্রতা ৫৩ ডেসিবেলের মধ্যে সীমিত রাখার সুপারিশ করা হয়। শব্দদূষণের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় ট্রাফিক পুলিশ। এছাড়াও নারী,  শিশু এবং সব বয়সের মানুষও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাঁচ থেকে সাত বছর কেউ এমন শব্দদূষণের ভেতরে থাকলে তার স্বাভাবিক শ্রবণশক্তি কমে যাবে এবং তার ঘুমের সমস্যা হবে। ঘুমের প্যাটার্ন নষ্ট হয়ে গেলে তা শরীরের সব স্থানে প্রভাব ফেলবে। সবচেয়ে বেশি সমস্যা হলো— সে মানসিক অবসাদগ্রস্ত হবে।

চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞরা জানান, এভাবে শব্দদূষণ বাড়তে থাকলে আগামী পাঁচ বছরে ঢাকায় শ্রবণ রোগীর সংখ্যা কয়েকগুণ হবে। একটি শহরে শব্দের সর্বোচ্চ মাত্রা ৬০ ডেসিবেল থাকা প্রয়োজন, অথচ ঢাকাতে অধিকাংশ স্থানে গড় মাত্রা ১০০ ডেসিবেল। শব্দদূষণের ফলে গর্ভবতী মায়েদের বেশি ক্ষতি হয়। কানের সমস্যা হতে পারে, উচ্চ রক্তচাপ ও হার্টবিট বেড়ে যেতে পারে। মা যখন উচ্চ রক্তচাপ, মানসিক অস্থিরতায় ভোগে, ঘুম ঠিকমত না হলে এর প্রভাব বাচ্চার ওপরও পড়ে। উচ্চ শব্দে তাদেরও হার্টবিট বেড়ে যায়। এতে বাচ্চাদের স্নায়বিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে, ওজন কমে যেতে পারে; এমনকি সময়ের আগেই প্রিম্যাচুর বাচ্চার জন্ম হতে পারে। এজন্য আমরা বলি, গর্ভবতী মায়েরা যেন ৮৫ ডেসিবেলের অধিক শব্দের স্থানে না যান।

বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) গবেষণার দেখা যায়, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৮২ জায়গায় জরিপ করে ক্যাপস। তার মধ্যে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডে ৯৯.৭৭ ডেসিবেল শব্দদূষণ পাওয়া গেছে। উত্তরার মাস্কাট প্লাজা এলাকায় ৯০ ডেসিবেল শব্দ পাওয়া গেছে। দক্ষিণ সিটিতে উত্তর সিটির চেয়ে কিছুটা শব্দদূষণ বেশি রয়েছে। নিউমার্কেট এলাকায় ১০০.৪ ডেসিবেল, প্রেস ক্লাবের সামনে ৯২.২২ ডেসিবেল এবং পল্টন মোড়ে ৯০ ডেসিবেল শব্দের মান মাত্রা পাওয়া গেছে। শব্দদূষণের ফলে ১১.৮ শতাংশ ট্রাফিক  সদস্য কানে কম শোনেন। 

গবেষণায় আরও দেখা যায়, পাঁচ বছর  আগেও ঢাকার রাস্তায় গড়ে ১১০ থেকে ১১৫ ডেসিবেল পর্যন্ত শব্দ হতো। এখনো গড়ে একই মাত্রার শব্দদূষণ পাওয়া যায়। যদিও আগে শব্দদূষণের সময়টি আগে ছিল গড়ে ১২ ঘণ্টা। কিন্তু বর্তমানে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গড়ে ১৪ ঘণ্টা শব্দদূষণ থাকে। তীব্রতা আগের চেয়ে অনেকটাই বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু ঢাকাতেই এমনটি তা কিন্তু নয়, সারা দেশের জেলা শহরগুলোতেও একইরকম শব্দদূষণ হচ্ছে। এসব শহরে সময়টা তুলনামূলক কিছু কম। শব্দদূষণের উৎসগুলো ইতোমধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে। যানবাহন হলো শব্দদূষণের প্রধান উৎস। এসব থেকে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ শব্দদূষণ হয়ে থাকে। এরপরই নির্মাণকাজের মাধ্যমে শব্দদূষণ হয়ে থাকে। রাজনৈতিক অনুষ্ঠান, ধর্মীয় উৎসবে মাইক ব্যবহারের ফলে শব্দদূষণ হয়। শিল্প-কারখানার মাধ্যমে ব্যাপক শব্দদূষণ হয়ে থাকে।

শব্দদূষণ সম্পর্কে জানতে চাইলে ক্যাপস পরিচালক ও পরিবেশবিদ ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার আমার সংবাদকে বলেন, প্রতিনিয়তই শব্দদূষণ বাড়ছে। কিছু কিছু এলাকায় ‘হর্ন বাজানো নিষেধ’ লেখা থাকলেও তেমন কার্যকর নেই। পিলখানা ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় শব্দদূষণের মানমাত্রা অন্যসব এলাকার চেয়ে অনেক কম। আমরা যদি সঠিকভাবে আইনের প্রয়োগ করতে পারি, তাহলেই শব্দদূষণ কমানো সম্ভব। 

শব্দদূষণের প্রতিকার সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি আরও বলেন, যানবাহনের দিকে নজর দিতে পারলে শব্দদূষণ অনেকটা কমে আসবে। যদি যানজট কমে যায়, তাহলে গাড়ির হর্নও কম বাজবে; ফলে শব্দদূষণ হবে না। সড়কের শৃঙ্খলা ও মানোন্নয়ন করতে পারলে শব্দদূষণ হ্রাস পাবে। হাইড্রোলিক হর্নের আমদানি নিষিদ্ধে আইন থাকলেও তার কোনো বাস্তবায়ন নেই। এ হর্ন ব্যবহারে আইনের প্রয়োগ ঘটাতে হবে। নির্মাণকাজগুলো বিধি মেনে করার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রচুর পরিমাণে গাছ লাগতে হবে। কারণ, গাছ শব্দকে কমিয়ে আনে। ‘গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে হর্ন বাজনো যাবে না’ এমন সাইনবোর্ড টানানো যেতে পারে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উচ্চ শব্দে সাউন্ড মিস্টেম বন্ধ করতে হবে। প্রয়োজনে তারা এসব ইনডোরে করতে পারে। তাহলে শব্দদূষণ অনেকটাই কমানো সম্ভব।