রাজধানীর রায়ের বাজারে এখনো দৃশ্যমান প্রায় ৩০০ বছর আগের একটি মঠ। দীর্ঘদিন ধরে এটি অরক্ষিত। সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তালিকায়ও নেই এটি। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হওয়ার কথা থাকলেও এ বিষয়ে কোনো তথ্য নেই প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কাছে। তবে মঠের কিছু অংশ এবং এর আশপাশের জায়গা দখল করে দোকান তৈরি হয়েছে অনেক আগেই। দোকান প্রতি চার থেকে ১০ হাজার টাকা ভাড়াও আদায়ের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিনোদ বিহারী রায় নামে এক জমিদারের সমাধি রয়েছে ওই মঠের ভেতরে। তিনি স্থানীয় জমিদার ছিলেন। তার নামানুসারেই রায়ের বাজারের নামকরণ করা হয়েছে। তিনি মন্দিরের জন্য ৩ থেকে ৪ শতাংশ জমি দিয়েছিলেন মঠের পাশে। তবে মন্দির বানানো হয়েছিল কি-না তার সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। তিনি মারা গেলে তাকে ওখানে সমাহিত করা হয়। তার সমাধির উপর তৈরি করা হয় এই মঠ। বহুদিন ধরে মঠের রক্ষণাবেক্ষণে না থাকায় আশপাশ দখল হতে থাকে। প্রভাবশালীরা মঠের জায়গা দখল করে দোকান বানিয়ে ভাড়া দিয়ে আসছেন।
সরেজমিন গিয়ে সেখানে বিভিন্ন দোকান দেখা যায়। জানতে চাইলে এসব দোকানদাররা জানান, তারা এসব দোকান ভাড়া নিয়েছেন। দোকানের আয়তন ভেদে ভাড়ার পরিমাণ চার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বলে জানান তারা। তবে বর্তমানে মঠ ঘেঁষে নতুন করে আরেকটি দোকান তৈরি করা হচ্ছে। দোকানের কিছু অংশ মঠের ভেতরে চলে গেছে। এর ফলে ভাঙতে হয়েছে পুরোনো ইটের তৈরি দৃষ্টিনন্দন এই মঠের অংশ। এ ছাড়াও মঠের পেছন অংশের পুরোটা জুড়ে তৈরি করা হয়েছে দোকান। যেকোনো সময় এটি ধসে পড়ার শঙ্কাও প্রকাশ করছেন স্থানীয়রা। মঠের নিচে ফাঁকা জায়গায় বিভিন্ন মালামাল দেখা যায়। সেখানে কয়েকটি বস্তাও দেখা যায়।
হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ ঢাকা মহানগর উত্তরের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক গৌর শংকর মজুমদার বলেন, ‘এটি রায়ের বাজারের ঐতিহ্যকে বহন করে। যেখানে এটির সংস্কার করে রক্ষণাবেক্ষণ করা উচিত সেখানে চলছে দখলবাণিজ্য। মঠের আশপাশের সব জায়গা দখল হয়ে গেছে। এখন চেষ্টা চলছে এটিও ভেঙে এখানে দোকান তৈরির। কারা দখল করতে চাচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী এর সঙ্গে জড়িত। আমরা আমাদের এমপির কাছে অনুরোধ করব তিনি যেন এটি দখলমুক্ত করে সংস্কারের ব্যবস্থা করেন। তাহলে রায়ের বাজারে মানুষ তার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মোহাম্মদপুর পূজা উদযাপন কমিটির এক নেতা বলেন, ‘এই মঠের পাশে ৩৪ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের অফিস। এ অফিসের সঙ্গে সম্পৃক্ত কেউ এই মঠ দখল করে দোকান বানানোর সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। এই অভিযোগের সত্যতাও পাওয়া যায় মঠের পাশ ঘেঁষে ওঠা দোকানের মালিক জাকির নামের এক ব্যক্তির বক্তব্য থেকে। তিনি বলেন, ‘আসলে এই দোকানটি গত ১০-১৫ বছর ধরে এখানে ছিল। আমি নতুন করে ভাড়া নিয়ে সংস্কার করেছি। তিনি দাবি করেন, এই দোকানের মূল মালিক তিনি নন। তিনি আলম নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে ভাড়া নিয়েছেন। এদিকে জাকির বলেন, ‘আমাকে আওয়ামী লীগের ক্লাব থেকে ভাড়া দেয়া হয়েছে এবং এ বিষয়টি সবাই জানেন।’
কত টাকা দিয়ে ভাড়া নিয়েছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আগে এই দোকানের ভাড়া ছিল চার হাজার টাকা। এখন আমি নিজের টাকা খরচ করে দোকান সংস্কার করেছি। তাই আমি বলেছি আমি তিন হাজার টাকা ভাড়া দেব।’ তবে ভাড়া দেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে ৩৪ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি রবিউল আলম বলেন, ‘আমি ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে জানি না কে কোথায় কীভাবে এই রায়ের বাজারে হরিলুট চালাচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘এসব বিষয়ে কথা বলতে ফোন দেবেন আমাদের সেক্রেটারি সিদ্দিক সাহেবকে।’
এরপর জানতে চাইলে ৩৪ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিক ভুঁইয়া বলেন, ‘এর সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। জাকির নামের ওই ব্যক্তি আলম নামে একজনের থেকে ভাড়া নিয়েছে। আলম যুবলীগের কর্মী ছিল। তাহের খান যখন স্থানীয় কমিশনার ছিল তখন তিনি এই জায়গা আলমকে দিয়েছিলেন কিছু করে খাওয়ার জন্য। এরপর আলম এখানে দোকান দিয়েছিল। এখন আলম অসুস্থ, তাই এটি ভাড়া দিয়েছে। আর আলম অসুস্থ হওয়ায় আমরা বিষয়টি দেখেও দেখিনি যে, ও যদি কিছু টাকা-পয়সা পায় তাহলে পাক গা।’
তিনি বলেন, এটি আগে অন্যরকমভাবে ছিল। এখন যে নিয়েছে সে অনেক ডেভেলপ (সংস্কার ও উন্নয়ন) করছে, অনেক সুন্দর করেছে। শার্টার লাগাইছে। আগে দোকানটা মঠের কোণ স্পর্শ ছিল না। এখন যে নিয়েছে সে এটি করেছে। আমিও ওরে বাধা দিয়েছিলাম যে, তোমার এটি করা উচিত হয়নি। এদিকে, আলম হার্ট অ্যাটাক করে অসুস্থ থাকায় তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রায়ের বাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মোহাম্মদ রেজাউল বলেন, ‘আমাদের কাছে লিখিত সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দিলে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা নেব।’ জানতে চাইলে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. ইমরুল চৌধুরী বলেন, ‘বিষয়টি আমার নলেজে নেই। আমি জেনে আপনাকে জানাতে পারব।’
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক আফরোজা খান মিতা বলেন, সব পুরাতন ভবন আমাদের ন্যাশনাল হেরিটেজ লিস্টে নেই। আর যেটা লিস্টে নেই সেটি আমরা সরাসরি বাধা দিতে পারি না। তবে আমাদের কাছে আবেদন এলে আমরা পরিদর্শন করি এবং প্রস্তাবনা তৈরি করে হেরিটেজ লিস্ট তোলার ব্যবস্থা করি। আমার জানামতে রায়ের বাজারে আমাদের এ রকম সংরক্ষিত কিছু নেই।