২৮ অক্টোবর ডেডলাইন

রাজধানীতে জনসমুদ্র দেখাবে আ.লীগ

মো. মাসুম বিল্লাহ প্রকাশিত: অক্টোবর ২৫, ২০২৩, ০৩:৪৬ পিএম
  • পাড়া-মহল্লায় বসানো হবে পাহারা 
  • ঢাকার সব পর্যায়ের নেতাকে নিয়ে আজ বৈঠক 
  • আসছে ঐক্যবদ্ধ ও সতর্ক থাকার নির্দেশনা

বিএনপি গত ১৮ অক্টোবর ঢাকার এক সমাবেশ থেকে ২৮ অক্টোবর ঢাকায় আরেকটি মহাসমাবেশের ঘোষণা দেয়। বিএনপির ওই ঘোষণার দিন আওয়ামী লীগও পালটা ঘোষণা দেয় মাঠ দখলে রাখার। ক্ষমতাসীন এই দলটি জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে সমাবেশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীও ঢাকার মতিঝিলে সমাবেশ করার ঘোষণা দিয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কাছে চিঠি পাঠিয়েছে। বিএনপির মিত্র অন্য দলগুলোও একইদিন সমাবেশ করবে। তারা সুবিধাজনক স্থানে কর্মসূচি পালন করবে। 

একযোগে ২৮ অক্টোবর বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও তাদের মিত্র দলগুলো রাজপথে কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নেয়ায় আওয়ামী লীগও রাজপথ দখলে রাখার ঘোষণা দিয়েছে। দলটি ২৮ অক্টোবর পুরো ঢাকাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চাইবে। প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় পাহারা দেবে ক্ষমতাসীন দলটি। একইসঙ্গে বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে যে সমাবেশের ঘোষণা দিয়েছে দলটি, সেই সমাবেশটি গুলিস্তান-পল্টনের আশপাশ ছাড়িয়ে মতিঝিল পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে বলে মনে করছে দলটি। স্মরণকালের সবচেয়ে বড় সমাবেশ দেখাবে ক্ষমতাসীন দলটি। এজন্য সব ধরনের প্রস্তুতিও নিচ্ছে তারা। এ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ১৮ অক্টোবরের পর থেকে প্রতিদিনই কোনো না কোনো মিটিং করছে দলটি। এসব মিটিংয়ের উদ্দেশ্য হচ্ছে ২৮ তারিখের সমাবেশে জনস্রোত সৃষ্টির পাশাপাশি পুরো রাজধানী নিজেদের দখলে রাখা। 

অন্য সময়ের চেয়ে ২৮ অক্টোবরের রাজধানী অনেকটা ব্যতিক্রম থাকবে— এমন আভাসই পাওয়া যাচ্ছে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও রাজনীতিকদের দেয়া বার্তা থেকে। ২০১৫ সালের পর মাঠ কাঁপানো কোনো বড় আন্দোলন করতে পারেনি বিরোধী দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ভোটের পর এক বছর বিরতি দিয়ে ২০১৫ সালে কঠোর আন্দোলনে যায় বিরোধী দলগুলো। ওই আন্দোলনেও ঘরে ফল তুলতে পারেনি দলগুলো। পরবর্তীতে ২০১৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর যে নির্বাচন হলো, ওই নির্বাচনের আগেও বড় কোনো আন্দোলন করতে পারেনি বিরোধী দলগুলো। সরকারপ্রধানের সঙ্গে সংলাপ করে শেখ হাসিনার অধীনেই ভোটে যায় তারা। কিন্তু সেই ভোটও বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধী দলগুলোর জন্য সুখকর হয়নি। মাত্র ছয়টি আসন পায় বিএনপি, যেটি বিএনপির জন্য নতুন এক ইতিহাস। 

পরবর্তীতে বিএনপির অন্যতম নীতিনির্ধারক ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন প্রকাশ্যেই বলেছিলেন— ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে সংলাপ করে ভোটে যাওয়া ঠিক হয়নি। এবার কিন্তু পরিস্থিতি ভিন্ন। এবার ভোটের ঠিক এক বছর পূর্বেই মাঠ গরম রেখেছে বিএনপি। বলা যায়, অনেকটা এককভাবেই মাঠে রয়েছে তারা। বিএনপির অন্য মিত্ররা মাঠে যুগপৎ আন্দোলনে থাকলেও ফ্রন্টলাইনে ছিল বিএনপি। অন্য প্রভাবশালী মিত্র জামায়াতে ইসলামী সুযোগ বুঝে শোডাউন করে নিজেদের অবস্থান জানান দিয়েছে। কোনো কোনো সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মুখোমুখি হয়ে বা ডিঙিয়ে এগিয়ে গেছে। গত বছরের ১০ ডিসেম্বর থেকে মূলত আনুষ্ঠানিকভাবে সরকার হটাও আন্দোলনে রয়েছে বিরোধী দলগুলো। ওইদিন ১০ দফা ঘোষণা দেয়া হয় বিএনপির পক্ষ থেকে। রাজধানীর গোলাপবাগ মাঠ থেকে দলটির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন দলের পক্ষ থেকে ওই ঘোষণা দেন। একইদিন বিএনপির সঙ্গে মিল রেখে ১০ দফা ঘোষণা দেয় জামায়াতে ইসলামীও। এরপর থেকে একের পর কর্মসূচি দিয়ে মাঠে রয়েছে বিরোধী দলগুলো। বিরোধী দলগুলোর এই কর্মসূচির দিনে ক্ষমতাসীন দলও পালটা কর্মসূচি দিয়ে মাঠে ছিল। প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় পাহারা বসিয়েছিল ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ।

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর বেশি সময় বাকি নেই। নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহেই তফসিল ঘোষণা হতে পারে। সে কারণে বলতে গেলে  বিরোধী দলগুলোর হাতে আর তেমন সময় নেই। তফসিলের আগেই নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবি আদায়ে মরিয়া বিরোধী দলগুলো। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগের সামনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। 

ক্ষমতাসীন দলের কাছে এখন এক নম্বর চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বিরোধী দলগুলোকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করা। বিরোধী দলগুলোকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর মাধ্যমে দমন করতে চাইলে ভোটের মাঠে আওয়ামী লীগের জন্য নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি হতে পারে— এমন আশঙ্কা  করছেন খোদ দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা। সে কারণে আওয়ামী লীগ চাচ্ছে বিরোধী দলের জনশক্তি ও জনসমর্থন মোকাবিলায় পালটা জনসমুদ্র সৃষ্টি করতে। খবর নিয়ে জানা গেছে, ২৮ অক্টোবরকেন্দ্রিক সংঘাত-সংঘর্ষ এড়িয়ে চলতে চাচ্ছে দলটি। ২৮ অক্টোবর মাঠ নিজেদের দখলে থাকবে বলে ক্ষমতাসীনরা ঘোষণা দিয়েছে। ওইদিন সরকারের পতনযাত্রার যে ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি, তা তাদের নিজেদেরই পতন ডেকে আনবে— এমন মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা। ‘গত বছরের ১০ ডিসেম্বর নয়াপল্টন অফিসের সামনে থেকেও সরকারের পতনযাত্রা শুরু করতে চেয়েছিল বিএনপি। সেটি গোলাপবাগের গরুর হাটে গিয়ে মারা পড়েছিল। এবারও সরকারের বিরুদ্ধে পতনযাত্রা যমুনা কিংবা বুড়িগঙ্গা নদীতে ডুবে যাবে’— তথ্যমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ এমন বক্তব্য দিয়েছেন গত শনিবার। পরদিন রোববার তার এ বক্তব্য সাংবাদিকরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টিতে আনলে তিনি তার ওই বক্তব্য রাজনৈতিক মন্তব্য উল্লেখ করে বলেছেন, কর্মীদের উজ্জীবিত করতে নেতারা এমন বক্তব্য দেন। অর্থাৎ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বোঝাতে চেয়েছেন আওয়ামী লীগও শান্তিপূর্ণ অবস্থান চায়। 

তবে ওইদিন রাজধানী আওয়ামী লীগের দখলে রাখার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাবে ক্ষমতাসীন দলটি। সে লক্ষ্যে তারা এখন ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি সভা করেছে দলটি। আজ বুধবারও একটি সভা করবে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ শাখা, ঢাকা জেলা শাখা, নির্বাচিত দলীয় জনপ্রতিনিধি এবং সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ, ঢাকা জেলা শাখার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদের ওই সভা আজ বুধবার বিকালে তেজগাঁওয়ে ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হবে। ২৩ অক্টোবর আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ আওয়ামী লীগ নেতা, মহানগরের অন্তর্গত থানা ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও কাউন্সিলর, ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগ নেতা, উপজেলা-থানা ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক, সংশ্লিষ্ট এলাকার নির্বাচিত দলীয় সব জনপ্রতিনিধি এবং সব সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ, ঢাকা জেলা শাখার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকরা মতবিনিময় সভায় অংশ নেবেন। 

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় ঢাকায় আওয়ামী লীগের সমাবেশটি জনসমুদ্রে রূপান্তরিত করা এবং প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় শক্ত পাহারা বসানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা রয়েছে। এ বিষয়ে নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ ও সতর্ক থাকার পাশাপাশি ২৮ অক্টোবর এবং পরবর্তীতে করণীয় বিষয়াদি নিয়ে নির্দেশনাও দেয়া হবে।