বিজ্ঞানে পিছিয়ে পড়ার শঙ্কা

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক প্রকাশিত: অক্টোবর ২৮, ২০২৩, ১২:৪৮ এএম
  • নবম-দশমে ৪০০ নম্বরের পরিবর্তে ১০০ নম্বরের বিষয়
  • এইচএসসির আগে বিজ্ঞান শিক্ষা চার বছরের পরিবর্তে দুই বছর 
  • অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদের শঙ্কা 

বর্তমান শিক্ষাক্রম তো আসলে মানবিকে পড়া
—ড. কামরুল হাসান মামুন, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক, ঢাবি

সময় ও নম্বর কমলেও শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়বে না
—প্রফেসর মো. ফরহাদুল ইসলাম, চেয়ারম্যান, এনসিটিবি 

আসন্ন ২০২৪ সাল থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বিভাগ থাকবে না। সব শিক্ষার্থী একই ধরনের বই পড়বে। বিভাগ না থাকায় বিজ্ঞান শেখার নম্বরও কমে যাচ্ছে। বর্তমানে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা চারশ নম্বরের বিজ্ঞান পড়ে। আগামী বছর থেকে ১০০ নম্বরের সমমানের বিজ্ঞান থাকবে। এর ফলে বিজ্ঞানে দেশের শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে পড়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছেন শিক্ষাবিদ, শিক্ষক ও অভিভাবকরা। তবে এনসিটিবি বলছে, বিজ্ঞান পড়ার সময় ও নম্বর কমলেও শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়বে না। নতুন কারিকুলামে তাদের হাতে কলমে শেখানো হবে। দশম শ্রেণিতে নতুন বিষয় যুক্ত হবে। এর ফলে তারা ভালো করবে। 
জানা যায়, আগামী বছর থেকে নতুন করে চারটি ক্লাসে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন হচ্ছে। শিক্ষাক্রমের বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ২০২৪ সালে নবম শ্রেণিতে বিভাগ উঠিয়ে দিয়েছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বিজ্ঞান, মানবিক, ব্যবসায় শিক্ষার পরিবর্তে সব শিক্ষার্থী একই ধরনের ১০টি বিষয় পড়বে। 

বিষয়গুলো হলো— বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান, ডিজিটাল প্রযুক্তি, জীবন ও জীবিকা, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, ধর্মশিক্ষা এবং শিল্প ও সংস্কৃতি। বর্তমানে বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা পদার্থ, রসায়ন, জীববিজ্ঞান ও উচ্চতর গণিত পড়ে। আগামী বছর থেকে একশ নাম্বারের সমমানের সাধারণ বিজ্ঞান পড়বে শিক্ষার্থীরা।  এর ফলে নিজেদের সন্তান ও ভবিষ্যৎ প্রজম্মের পিছিয়ে পড়ার শঙ্কার কথা জানিয়েছেন শিক্ষাবিদ, শিক্ষক ও অভিভাবকরা। তারা বলছেন, বর্তমানে আমাদের সন্তানরা ৪০০ নম্বরের বিজ্ঞান বিষয় পড়ে। এসএসসি ও এইচএসসিতে চার বছর বিজ্ঞান পড়ে নিজেদের তৈরি করে। নতুন কারিকুলামে নবম-দশম শ্রেণিতে ১০০ নম্বরের বিজ্ঞান পড়ে তাদের জানার ঘাটতি কীভাবে পূরণ করবে? এ বিষয়ে আমিরুল ইসলাম তোহা  নামে একজন অভিভাবক সোশ্যাল মিডিয়ায় বলেন, ভয়ঙ্কর ভুল সিদ্ধান্ত। বিজ্ঞান, মানবিক, বাণিজ্য এর বিভাজন অষ্টম শ্রেণিতেই হওয়া উচিত। কারণ নবম-দশম শ্রেণির বিজ্ঞান সিলেবাস একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির তুলনায় অনেক ছোট। তাই একাদশে উঠে আমাদের অনেককেই হিমশিম খেতে হয়। যদি বিভাজনটা অষ্টম শ্রেণিতে হতো তাহলে ছাত্রছাত্রীরা সহজেই ভালো করতে পারত।

এ বিষয়ে ফয়সাল আহমেদ বলেন, ১৯৯৬ সালের দিকে নবম-দশম শ্রেণির পাঠ্যক্রমে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয় এবং বেশ স্ট্যান্ডার্ড একটি সিলেবাস প্রণয়ন করা হয়। তখন ৫০ নম্বরের নৈর্ব্যক্তিক সিস্টেম চালু করা হয় লেটার মার্ক পাওয়া সহজ করার জন্য। বেশ কয়েক বছরের পরিমার্জনের পর এটি একটি ভালো অবস্থানে আসে। এর পর যখন গ্রেডিং সিস্টেমের অবতারণা করে মার্ক বেশি দেয়ার এবং পাসের হার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, সেদিন থেকেই সর্বনাশ শুরু হয় এবং এটা শুরু হয় নাহিদ সাহেবের আমলে। পরবর্তিতে সিলেবাসে আরও যোগ করা হয় সৃজনশীলতার, যার মত অসৃজনশীল সিদ্ধান্ত আর হয় না। 

বিজ্ঞান বিষয় কমে যাওয়ায় নিজের শঙ্কার কথা জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন বলেন, মানুষের স্বভাবজাত যেই বিভাজন আছে তাকে অস্বীকার করা হলো। যেই বয়সে ছেলেমেয়েদের প্রিয় বিষয় আবিষ্কারের সময় সেই সময়েই প্রিয় হওয়ার সুযোগটাই নাই করে দিলো। উচ্চতর গণিতকে নাই করে দিলো। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানের মতো তিনটি ভিন্ন বিষয়কে এক করে একটি বিষয় বানানো হলো। এর ফলে কোন সাবজেক্টকেই একটু গভীরে গিয়ে বোঝার বা জানার সুযোগ প্রতিটি বিষয় থেকে তিন ভাগের দুই ভাগ কমে গেল। এই ৪০০ নম্বরের চারটি আলাদা বিষয়ের পরিবর্তে ১০০ নম্বরের বিজ্ঞান পড়বে এরা ভবিষ্যতে বিজ্ঞানকে কিভাবে দেখবে? নিশ্চিতভাবে বিজ্ঞান নিয়ে ভয় ঢুকে যাবে। উচ্চ মাধ্যমিকে গিয়ে বিজ্ঞান নিয়ে সেখানে খাপ খাওয়াতে হাবুডুবু খাবে। কয়েক বছরের ছেলেমেয়েদের হাবুডুবু খাওয়া দেখে এরপর থেকে বিজ্ঞান নেয়াই অনেকে ছেড়ে দেবে। 

এইচএসসিতে বিজ্ঞান পড়ে পরবর্তী সময়ে মানবিক কিংবা ব্যবসায় শিক্ষা বিষয়ে পড়ে। কোনো অসুবিধা তো হয়ই না, উল্টো সুবিধা হয়। বিশেষ করে যারা অর্থনীতিতে পড়ে তাদের জন্য দারুণ সহজ হয়। অর্থনীতিতে এখন ভালো করতে হলে এখন আসলে ভালো গণিত জানা লাগে। আগে বিজ্ঞানে পড়ে মানবিকে যেত। কিন্তু মানবিকে পড়ে বিজ্ঞানে যেতো না। বর্তমান শিক্ষাক্রম তো আসলে মানবিকে পড়াই হলো। তাহলে এরা কীভাবে পরবর্তী সময়ে বিজ্ঞান পড়বে? বিজ্ঞানে শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়বে না জানিয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মো. ফরহাদুল ইসলাম আমার সংবাদকে বলেন, নতুন কারিকুলাম নিয়ে অনেক ধরনের অপ্রপচার হচ্ছে। কেউ কেউ জেনে আবার কেউ না জেনেই এ শিক্ষাক্রমের বিরোধিতা করছেন। নতুন শিক্ষাক্রমে নবম ও দশম শ্রেণিতে বিজ্ঞানে সময় ও বিষয় কমলেও শিক্ষার্থরা পিছিয়ে পড়বে না। তারা আগের মতো গৎবাঁধা মুখস্থ করবে না। তাদের হাতে কলমে শেখানো হবে। ফলে অল্প সময়ে ভালো শিখতে পারবে। আর দশম শ্রেণিতে বিষয় বাড়ানো হবে। নবম ও দশম শ্রেণির বিষয় এক থাকবে না। আর নতুন কারিকুলাম আমরা যাচাই বাছাই করে দেখছি। যেটা শিক্ষার্থীদের জন্য কল্যাণ হবে ওই ধরনের সিদ্ধান্তই আমাদের শিক্ষকরা নিচ্ছেন। আমরা কী চাইব, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা পিছিয়ে যাক?