বাড়ছে অপরিণত শিশুর জন্ম

সাহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া প্রকাশিত: নভেম্বর ১৭, ২০২৩, ১১:৩৬ পিএম

রাজধানীর আগারগাঁও এলাকায় ঢাকা শিশু হাসপাতালের নিউনেটাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (এনআইসিইউ) সামনে বিমর্ষ মুখে বসে আছেন আফজাল হোসেন। সাথেই বসে আছেন তার স্ত্রী আমেনা রহমান। গত ২০ দিন আগে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে সিজারের মাধ্যমে জন্ম নেয় তাদের প্রথম সন্তান। জন্মের পর সন্তানের হার্ট ও রক্তনালিতে সমস্যা ধরা পড়ে। ডাক্তার বলছেন তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন শিশুটিকে বাঁচাতে। 

আফজাল হোসেনের সাথে কথা হয় আমার সংবাদের এ প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, গর্ভকালীন তার স্ত্রীর বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়। ডাক্তারের পরামর্শে গর্ভধারণের ৩৪ সপ্তাহে তাদের সন্তানের জন্ম হয়েছে। প্রথম সন্তান হওয়ায় তাদের গর্ভকালীন সেবার বিষয়ে তেমন জ্ঞান ছিল না। গ্রামে বসবাস করার কারণে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিয়েছেন অনিয়মিত।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় গর্ভধারণকালে ৩৯ সপ্তাহের আগে ২৮ থেকে ৩৭ সাপ্তাহের মধ্যে জন্ম নেয়া শিশুদের প্রিম্যাচিউরড বেবি বা অপরিণত শিশু বলা হয়। এসব শিশুর বেশির ভাগেরই জন্ম হয় মায়ের স্বাস্থ্য জটিলতার কারণে সিজারিয়ান সেকশনের মাধ্যমে। শিশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রিম্যাচিউরড শিশুদের জন্মের পর পরই মৃত্যুঝুঁকি থাকে এরা কম ওজন নিয়ে জন্ম নেয় । এদের মধ্যে অসুস্থতার হারও বেশি এবং জন্মের পর পরই নিউনেটাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (এনআইসিইউ) রাখা ছাড়া এদের বাঁচিয়ে রাখা কঠিন হয়ে থাকে। বাংলাদেশে এ ধরনের এনআইসিইউয়ের সংখ্যা খুবই কম। এনআইসিইউয়ের অভাবে অনেক শিশু জন্মের পর পরই মারা যায়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বলছেন, বাংলাদেশে বছরে লাখ পাঁচ লাখ ৭৩ হাজার শিশু অপরিণত হয়ে জন্ম নেয়। এ অপরিণত ও অল্প ওজনের বাচ্চাদের মধ্যে ২২ শতাংশ শিশু অনুর্ধ্ব পাঁচ বছরে মৃত্যুবরণ করে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলেন, নিউমোনিয়ার পর বিশ্বে নবজাতক মৃত্যুর বড় একটি কারণ অপরিণত শিশুর জন্ম। প্রায় ৪৫ শতাংশ নবজাতকের মৃত্যু ঘটে সময়ের আগে জন্ম নেয়ার কারণে। বিশ্বে প্রতি বছর এক কোটি ৫০ লাখ নবজাতক ৩৭ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগেই জন্মগ্রহণ করে। অর্থাৎ প্রতি ১০টি শিশুর মধ্যে একটি প্রিম্যাচিউরড শিশু জন্মায়। তাদের মধ্যে অনেকেই স্বল্প ওজনের বা আড়াই কেজির কম ওজন নিয়ে জন্ম নেয়। এসব শিশুর বেঁচে থাকাটা বড় কঠিন। বিশেষ যত্ন ছাড়া এসব শিশুকে বাঁচিয়ে রাখা যায় না। বেঁচে থাকলেও এসব শিশু ঘন ঘন অসুস্থ হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ঠাণ্ডা অথবা নিউমোনিয়া সংক্রমণ বেশি ঘটে থাকে। কারণ এসব শিশুর মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমই থাকে। সুস্থতার সাথে বাঁচিয়ে রাখতে হলে চিকিৎসকদের নিয়মমতো পরামর্শে থাকতে হয়। বাংলাদেশে প্রতি ১০০টি শিশুর মধ্যে ১৯ শিশুর জন্ম হয় প্রিম্যাচিউরড বেবি বা অপরিণত শিশু হিসেবে। সময়ের চেয়ে আগে জন্ম নেয়া শিশু জন্ম দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশেই বেশি। অপরিণত শিশুর জন্মে পৃথিবীর শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। 

বিশ্ব বিখ্যাত মেডিকেল জার্নাল লেনসেটের সবশেষ তথ্যানুসারে সার্কভুক্ত দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতে অপরিণত শিশু জন্মের হার ১৩ শতাংশ, পাকিস্তানে ১৪.৪ শতাংশ, নেপালে ১১.২ শতাংশ, মালদ্বীপে ৯.৮ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় ৭.৮ শতাংশ। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, গর্ভাবস্থায় মায়ের পুষ্টির ঘাটতি, গর্ভাবস্থায় ঘন ঘন খিচুনি হলে, গর্ভাবস্থায় জীবাণু সংক্রমণের শিকার হলে এবং মায়ের কম বয়সে সন্তান ধারণ করলে প্রিম্যাচিউরড শিশুর জন্ম হয়ে থাকে।  অপরিণত শিশুর জন্ম ও গর্ভকালীন সেবার বিষয়ে আমার সংবাদের এ প্রতিবেদক কথা বলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের গাইনি বিভাগের অধ্যাপক ডা. সেতারা বিনতে কাসেমের সাথে। 

তিনি বলেন, প্রিম্যাচিউরড শিশুর জন্ম বিভিন্ন কারণে হতে পারে। বিশেষ করে গর্ভকালীন সময়ে কোন ইনফেকশন, জরায়ু ছোট থাকলে বা জরায়ুতে কোনো টিউমার থাকলে প্রিম্যাচিউরড শিশু হতে পারে। এ ছাড়া মায়ের উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হার্টের অস্বাভাবিকতা, কিডনির সমস্যা, গর্ভাবস্থায় যথেষ্ট ওজন বেড়ে যাওয়া, অত্যধিক ওষুধ সেবন করলে অপরিণত নবজাতকের জন্ম হতে পারে। আবার অনেক সময় বাচ্চাও মাকে বাঁচানোর জন্য প্রিম্যাচিউরড শিশুর জন্ম হয়। ২৮ থেকে ৩৭ সপ্তাহ মধ্যে জন্মগ্রহণ নিলে ওই শিশুর ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে কম হয়। এই শিশুদের শারীরিক ও মানসিক সমস্যা লেগেই থাকে। এ জন্য মায়েদের এন্টিনেটাল বা গর্ভকালীন সেবা, প্রাতিষ্ঠানিক ডেলিভারি ও মায়ের সুষম পুষ্টিসহ সব ধরনের পরিচর্যা বাড়াতে হবে। নিয়মিত বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। এতে কমে আসবে অপরিণত শিশুর জন্ম। অপরিণত শিশুর জন্ম কোনোভাবেই কাম্য নয়।