সর্বজনীন স্বাস্থ্যসুরক্ষা দিবস আজ

স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কমছে

সাহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া প্রকাশিত: ডিসেম্বর ১২, ২০২৩, ১০:২০ এএম
  • ৭২ শতাংশ চিকিৎসা ব্যয় ব্যক্তি বহন করে
  • সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা সূচকে পিছিয়ে বাংলাদেশ

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে 
—অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ  স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগ, ঢাবি

সব মানুষের জন্য বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে গুণগত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সর্বজনীন স্বাস্থ্যসুরক্ষার মূল নীতি। তবে দেশে এখনো মানসম্মত সেবা নিশ্চিত হয়নি। দেশের প্রান্তিকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ভিত্তি তৈরি হয়েছে। কিন্তু নগরে এখনো গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। অথচ দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষের বসবাস শহরে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৯৭ সাল থেকে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ে সরকারের অংশ ক্রমান্বয়ে ছোট হচ্ছে। এতে হিমশিম খাচ্ছে রোগীর পরিবার। সরকার ২০১২ সালে চিকিৎসায় রোগীর নিজস্ব ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেয়। ওই বছর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগ সর্বজনীন স্বাস্থ্যসুরক্ষা অর্জনের কৌশলপত্র প্রণয়ন করে। সেখানে ২০৩০ সালের মধ্যে রোগীর নিজস্ব ব্যয় ৩২ শতাংশ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় পরও এ ব্যবস্থার উন্নতি হয়নি। ২০১৫ সালে ব্যক্তির চিকিৎসা ব্যয় ৬৪ থেকে বেড়ে ৬৭ শতাংশ হয়।

২০২০ সালে স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের সর্বশেষ গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যক্তির স্বাস্থ্য খাতের মোট ব্যয় ৬৮ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। যা বর্তমানে ৭২ দশমিক ৭০ শতাংশে পৌঁছেছে। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার লক্ষ্য অর্জনে গত ১৩ বছরেরও বেশি সময় পার হলেও প্রকৃত কাজে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। স্বাস্থ্যসুরক্ষা শুধু পাইলট প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। টাঙ্গাইলের পর আরও দুই জেলায় পাইলট প্রকল্প স্থাপনেই সময় ক্ষেপণ হচ্ছে। সঠিক পরিকল্পনার অভাবে ধীরগতির এসব উদ্যোগ গ্রহণের ফলে আগামি ২০৩০ সালের মধ্যে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসুরক্ষা অর্জনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ পরিস্থিতিতে আজ মঙ্গলবার দেশে পালিত হবে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য— ‘হেলথ ফর অল : টাইম ফর অ্যাকশন’ অর্থাৎ— সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবার উদ্যোগ গ্রহণের এখনই সময়। এবারের প্রতিপাদ্যে মানুষ আর্থিক কষ্ট ছাড়াই মানসম্পন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তি, চিকিৎসা নিতে গিয়ে দারিদ্র্য না হওয়া এবং জনস্বাস্থ্য সংকট থেকে রক্ষার উপায় সম্পর্কে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

সমপ্রতি স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের প্রকাশিত এক গবেষণা বলা হয়, ২০১৮, ’১৯ ও ’২০ সালে চিকিৎসা ব্যয়ের সরকারের অংশ ছিল যথাক্রমে মোট ব্যয়ের ২৮, ২৬ ও ২৩ শতাংশ। আর ওই বছরগুলোতে ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় ছিল ৬৪, ৬৬ ও ৬৯ শতাংশ। অর্থাৎ চিকিৎসা ব্যয়ে সরকারের অংশ ক্রমান্বয়ে কমছে আর ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় বাড়ছে। এ ব্যয় করতে গিয়ে বছরে ৮৬ লাখের বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছে। চিকিৎসার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যয় হচ্ছে ওষুধ কিনতে। এতে ব্যয় ৬৪ দশমিক ৬ শতাংশ। এ ছাড়া রোগ শনাক্তের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ১১ দশমিক ৭ শতাংশ, বিকল্প চিকিৎসাসেবায় ১৩ দশমিক ২ শতাংশ এবং হাসপাতালে খরচ ১০ দশমিক ১ শতাংশ। ২০১৯ সালের তুলনায় এ বছর হাসপাতাল ও বিকল্প চিকিৎসাসেবা নেয়ায় ব্যয় বেড়েছে। এসব ব্যয়ের মধ্যে সরকার ও দাতা সংস্থা থেকে আসে ৩১ শতাংশ। শুধু সরকার বহন করে ২৩ দশমিক ১ শতাংশ। এদিকে বিশ্বব্যাংকের সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা সূচকে এখনো অনেক পিছিয়ে বাংলাদেশ। ১০০ স্কোরে বাংলাদেশের অবস্থা ৫১, যেখানে নেপালের ৫৩, ভারতের ৬১, ভুটানের ৬২, শ্রীলঙ্কার ৬৭ ও মালদ্বীপের ৬৯। অন্যদিকে ৪৫ স্কোর নিয়ে বাংলাদেশের নিচে আছে পাকিস্তান।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে মাতৃ ও শিশুমৃত্যু কমেছে। গড় আয়ু বেড়েছে। কিন্তু স্বাস্থ্যে বৈষম্য বাড়ছে। অন্য অনেক দেশে যেখানে বিনামূল্যে ও সহজ উপায়ে জনগণকে চিকিৎসা ও ওষুধ দেয়া হয়, সেখানে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। এ ছাড়া অন্যান্য দেশে জিডিপির ২ থেকে ৩ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করা হলেও বাংলাদেশে তা ১ শতাংশেরও কম। ফলে কিছুটা অগ্রগতি হলেও অব্যবস্থাপনাজনিত কারণে পিছিয়ে পড়ছে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসুরক্ষার লক্ষ্য। 

জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল বলেন, ‘২০৩০ সালের মধ্যে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসুরক্ষার লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব। যদি না আমরা ঠিকমতো পরিকল্পনামাফিক কাজ না করি। সেকেন্ডারি ও টারশিয়ারিতে স্বাস্থ্য খাতের অনেক বেশি খরচ হচ্ছে। ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আর মাত্র সাত বছর বাকি আছে, আমরা কি সঠিক পথে যাচ্ছি, তথ্য বলছে না আমরা কোথায় যেন আটকে আছি, কিছু ক্ষেত্রে উল্টো পথে হাঁটছি। এটি যদি এখনি অনুধাবন করা না হয়, তাহলে ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য স্বাস্থ্য যে স্বপ্ন তা অর্জন করা সম্ভব হবে না।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, ‘সমপ্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি ছাড়া আর কোনো খাতে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসুরক্ষার লক্ষ্য সেভাবে অর্জিত হয়নি। এখন যেভাবে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসুরক্ষার লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা চলছে, এভাবে চলতে থাকলে লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে। সামনে নির্বাচন। রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে স্বাস্থ্যসেবার প্রতিশ্রুতি থাকে। সরকার গঠনের পর সঠিকভাবে লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা ও পরিকল্পনা করা হয় তাহলে আগামী সাত বছরে সম্ভব হবে।’ তিনি বলেন, ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার একটি আন্তর্জাতিক লক্ষ্য হলো সর্বজনীন স্বাস্থ্যসুরক্ষা অর্জন। এটি আমাদের ইমেজের সাথে সম্পৃক্ত। এই লক্ষ্য অর্জিত হলে অন্য লক্ষ্যগুলো অর্জন করা সহজতর হবে। আর এখানে গরমিল হলে বাকি লক্ষ্য অর্জনও সংকটে পড়বে।’ 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বছরে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১০০ কোটি মানুষ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ১৫ কোটি মানুষ স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় মেটাতে গিয়ে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছেন, দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাচ্ছেন। বাংলাদেশে চার কোটি ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থান করছে এবং প্রতি বছর অসুস্থতার কারণে নতুন করে ৬৪ লাখ মানুষ দারিদ্র্যতার শিকার হচ্ছেন।