বছরজুড়ে হতাশা শেষ সময়ে ইতিহাস

আহমেদ হৃদয় প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২৮, ২০২৩, ১২:৫৫ এএম
  • তামিম ইস্যু নিয়ে সরগরম ক্রিকেটপাড়া
  • বিশ্বকাপে নানা নাটকীয়তা অতঃপর ব্যর্থতা
  • অভিযোগ-সমালোচনার মধ্যেই হাথুরুর নতুন চ্যালেঞ্জ
  • টাইগার যুবাদের এশিয়া জয়

সময় এগিয়ে যাচ্ছে তার নির্ধারিত গতিতে। দেখতে দেখতে বছরটাও প্রায় শেষ হতে চলেছে। ক’দিন পরই পুবের আকাশে উঠবে নতুন বছরের নতুন সুর্য। সব কিছু হয়তো শুরু আবারও নতুন উদ্যমে। তবে যে সালটা শেষ হলো, বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রাপ্তিই বা কতখানি ছিল! চলতি বছরের ওয়ানডে অধ্যায় শেষ করেছে বাংলাদেশ জয় দিয়ে। তবুও ২০২৩ সালটি বাংলাদেশের ক্রিকেটের এক ব্যর্থতার বছর বলায় যায়। যে বাংলাদেশ ওয়ানডে ফরম্যাটে ছিল সবার আতঙ্ক, সেই বাংলাদেশই এই ফরম্যাটে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে এই বছরে। তবুও যেন শেষটা রঙিন করে নিলো বাংলার টাইগাররা। 

পুরো বছরের ব্যর্থতা হয়তো ভুলে যাবেন বছরের শেষের ইতিহাস গড়া ম্যাচ জয়ে। নিউজিল্যান্ডের মাটিতে কোনো ফরম্যাটেই টাইগারদের জয় ছিল না। তাদের মাটিতে সেই হারের বৃত্ত ভাঙে ২০২২ সালের ৫ জানুয়ারি ২০২২। টেস্ট ক্রিকেটে এর চেয়ে সুন্দর দিন আর দেখেনি বাংলাদেশ। মুমিনুল হকের নেতৃত্বে একদল তরুণে ভর করে টেস্টের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে চমকে দিয়েছিল বাংলাদেশ। সেটিও আবার তাদের মাটিতে যেকোনো ফরম্যাটে প্রথমবার হারানোর স্বাদ। নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে মাউন্ট মঙ্গানুইয়ের বে ওভাল। মাউন্ট মঙ্গানুইয়েতে ঐতিহাসিক টেস্ট জয়ের প্রায় এক বছরের মাথায় নিউজিল্যান্ডের মাটিতে ওয়ানডেতে হারের বৃত্ত ভাঙে বাংলাদেশ। গত ২৩ ডিসেম্বর নেপিয়ারে সিরিজের তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডেতে রূপকথার মতো এক জয় পায় বাংলাদেশ। প্রথমে ব্যাট করতে নেমে শরিফুল ইসলাম-তানজিম সাকিবদের পেস আগুনে পুড়ে ছাই হয় কিউই ব্যাটাররা! পুরো দল মিলে স্কোরবোর্ডে ১০০ রানও তুলতে পারেনি স্বাগতিকরা অলআউট হয়েছে মোটে ৯৮ রানে। যা বাংলাদেশের বিপক্ষে ওয়ানডেতে তাদের সর্বনিম্ন সংগ্রহের রেকর্ড হয়। 

এ ছাড়া ঘরের মাঠে কিউইদের ওয়ানডে ইতিহাসেরই চতুর্থ সর্বনিম্ন এবং ২০০৭ সালের পর সর্বনিম্ন সংগ্রহের রেকর্ডও এটি। বোলারদের এমন বীরত্বের পর নেপিয়ারে বাকি কাজটা সহজেই সারেন টাইগার ব্যাটাররা। সেটিও ৯ উইকেটের বিশাল ব্যবধানে। নিউজিল্যান্ডের মাটিতে স্বাগতিকদের বিপক্ষে ওয়ানডেতে প্রথম জয়ের স্বাদ পায় বাংলাদেশ। ভেন্যু ও উইকেট একই। নেপিয়ারের ম্যাকলিন পার্কে যে মাঠে নিউজিল্যান্ডকে নিয়ে ছেলেখেলা করেছে, গতকাল বুধবার তিন ম্যাচ টি-টোয়েন্টি সিরিজের প্রথম ম্যাচও একই উইকেটে হয়েছে। সে দিনও বাংলাদেশ আগে বোলিং করে কিউইদের ব্যাটিংয়ে ধস নামায়। বুধবারও সেটির পুনরাবৃত্তি দেখা গেল। টি-টোয়েন্টিতেও এবার নিউজিল্যান্ডকে তাদেরই মাটিতে হারিয়ে আরও একটি ইতিহাস গড়ল বাংলাদেশ, ঠিক বছরের শেষে এসে। ২০২৩ সালটা তামিম ইকবালের ক্রিকেট ক্যারিয়ারে অন্যতম স্মরণীয় বছর হয়ে থাকবে। এ বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে আচমকাই অবসর ঘোষণা, ২৮ ঘণ্টার ব্যবধানে অবসর ভাঙা, অধিনায়কত্ব ছাড়া ও বিশ্বকাপ স্কোয়াড থেকে বাদ পড়া। 

সব মিলিয়ে বছরজুড়েই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন তামিম। বছরের মাঝামাঝি সময়, ৬ জুলাই হুট করে যখন সংবাদ সম্মেলন ডাকলেন, তখনই গুঞ্জন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিতে পারেন তামিম ইকবাল। শেষ পর্যন্ত হলোও তাই। বিদায়ই বলে দিলেন ওয়ানডে অধিনায়ক। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বিদায় নেয়ার পরের দিনই নিজের সেই ঘোষণা তুলে নেন তামিম ইকবাল। এর আগে ঢাকায় এসে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা ও ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনের সাথে প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রীয় বাসভবনে যান তিনি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তামিমের কাছে জানতে চান, কেন হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত। এরপর তামিমকে তিনি ক্রিকেটে ফিরতে বলেন। প্রধানমন্ত্রী তামিম ইকবালকে দেড় মাসের ছুটিও দিয়েছেন জানিয়েছেন তামিম ইকবাল। 

এই সময়ে ফিটনেস নিয়ে কাজ করবেন। তবে এখনো তামিম ইস্যু নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েই গেছে। এখনই কেন্দ্রীয় চুক্তিতে না রাখার অনুরোধও করেছেন এই ওপেনার। আর এতেই আবারও গুঞ্জন ওঠেছে, তামিম কী ফিরবেন, নাকি আর ফিরবেন না। এরপরই বিশ্বকাপ, দলে রাখা হয়নি তামিম ইকবালকে। সে নিয়েও নানা নাটক। দ্বিতীয় মেয়াদে বাংলাদেশের দায়িত্বে তখন সমালোচিত হাথুরু সিংহে। কোনো রকমে একটি দল নিয়ে বিশ্বকাপ খেলতে যায় বাংলাদেশ। সেখান বড় আশা নিয়ে গেলেও ফিরেছে ব্যর্থতা নিয়ে। আবারও শুরু হয় কোচ চান্ডিকা হাথুরু সিংহকে নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনা। সব কিছু ছাপিয়ে নতুন চ্যালেঞ্জে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টায় হাথুরু। 

সর্বশেষ এশিয়া কাপ ও ওয়ানডে বিশ্বকাপে মোটাদাগে ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল। স্বাভাবিকভাবেই টিম টাইগার্সের হতাশাজনক পারফরম্যান্সে মন খারাপ হয়েছে ক্রিকেটপ্রেমীদের। তবে বছরের শেষ মুহূর্তে এসে দেশের ক্রিকেটাঙ্গনে আনন্দের স্মৃতি উপহার দিয়েছে টাইগার যুবারা। অনূর্ধ্ব-১৯ এশিয়া কাপে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে হারিয়ে শিরোপা ঘরে তুলেছে বাংলাদেশের যুবারা। এর মধ্য দিয়ে নিজেদের ইতিহাসে এশিয়ার সেরা দলের তকমা পেয়েছে মুশফিক-সাকিবদের উত্তরসূরিরা। পুরো বছরে বলতে গেলে এটিই বাংলাদেশের সেরা অর্জন। কদিন পরেই শেষ হতে যাওয়া বছরের সবশেষ ওয়ানডেটি খেলে ফেলেছে বাংলাদেশ দল। নেপিয়ারে হওয়ায় সেই ম্যাচে দুর্দান্ত নৈপুণ্যে তারা করেছে স্মরণীয় ফল।

 ১৬ বছরের অপেক্ষার ইতি টেনে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তাদের মাটিতেই প্রথমবারের মতো ওয়ানডে জিতেছে টাইগাররা। তবে শেষটি রঙিন হলেও সার্বিক বিচারে এই সংস্করণে ২০২৩ সালটি ভালো কাটেনি তাদের। বাংলাদেশ অন্য দুই সংস্করণ অর্থাৎ টেস্ট ও টি-টোয়েন্টির চেয়ে ওয়ানডে ভালো খেলে, এই বাস্তবতা চলতি বছর পড়েছে প্রশ্নের মুখে। সব মিলিয়ে ৩২ ম্যাচ খেলে তাদের জয় কেবল ১১টিতে। লাল-সবুজ জার্সিধারীরা হেরেছে ১৮টি ম্যাচে। ফল আসেনি তিনটিতে। ঘরের মাঠে ইংল্যান্ড, আফগানিস্তান ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ হেরেছে তারা, জিতেছে কেবল আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে। বিদেশের মাটিতেও কেবল আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষেই সিরিজ জিতেছে বাংলাদেশ, হেরেছে নিউজিল্যান্ডের কাছে। এশিয়া কাপের সুপার ফোরে পৌঁছানো বাংলাদেশ ওই প্রতিযোগিতায় জেতে দুটি ম্যাচ। 

এরপর বিশ্বকাপে ভরাডুবি হয় তাদের। বড় আশা নিয়ে ওয়ানডে ক্রিকেটের সর্বোচ্চ আসরে খেলতে গিয়ে তারা হয় অষ্টম, জিততে পারে কেবল আফগানিস্তান ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। দলীয় পারফরম্যান্স হতাশাজনক হলেও ব্যক্তিগতভাবে কয়েকজন ক্রিকেটার দারুণ একটি বছর উপভোগ করেছেন। ২০২৩ সালে ওয়ানডেতে বাংলাদেশের হয়ে সবচেয়ে বেশি রান করেছেন নাজমুল হোসেন শান্ত আর সবচেয়ে বেশি উইকেট নিয়েছেন শরিফুল ইসলাম। বাঁহাতি টপ-অর্ডার ব্যাটার শান্ত ২৭ ম্যাচে ৪১.৩৩ গড়ে ও ৮৫.৮১ স্ট্রাইক রেটে করেছেন ৯৯২ রান। তার নামের পাশে আছে দুটি সেঞ্চুরি ও আটটি হাফসেঞ্চুরি। বাঁহাতি পেসার শরিফুল ১৯ ম্যাচে ২৪.৮৭ গড়ে শিকার করেছেন ৩২ উইকেট। একবার চার উইকেট পেলেও কোনো ম্যাচে ফাইফার মেলেনি তার। 

২০২৩ সালে বাংলাদেশের রান সংগ্রাহকদের তালিকার শীর্ষ পাঁচের বাকি স্থানগুলোতে আছেন যথাক্রমে মুশফিকুর রহিম (২৯ ম্যাচে ৩৬.৭৮ গড়ে ৮৪৬ রান), সাকিব আল হাসান (২৩ ম্যাচে ৩৫ গড়ে ৭৩৫ রান), তাওহিদ হূদয় (২৭ ম্যাচে ৩৪.৬১ গড়ে ৭২৭ রান) ও লিটন দাস (২৯ ম্যাচে ২৬.০৪ গড়ে ৬৫১ রান)। তা ছাড়া, অন্তত ১০ ম্যাচ খেলা ব্যাটারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গড় অবশ্য মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের। বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সেঞ্চুরি হাঁকানো অভিজ্ঞ তারকা ১৪ ম্যাচে ৪২.৬৩ গড়ে করেছেন ৪৬৯ রান। বাংলাদেশের উইকেটশিকারিদের তালিকার সেরা পাঁচের পরের স্থানগুলোতে রয়েছেন যথাক্রমে তাসকিন আহমেদ (১৮ ম্যাচে ২৫.৩৪ গড়ে ২৬ উইকেট), মেহেদী হাসান মিরাজ (২৭ ম্যাচে ৪২.০৪ গড়ে ২৩ উইকেট), সাকিব (২৩ ম্যাচে ৩৫.৪৭ গড়ে ২৩ উইকেট) ও হাসান মাহমুদ (১৬ ম্যাচে ৩২.১৩ গড়ে ২২ উইকেট)। অন্যদিকে, অন্তত ১০ ওয়ানডে খেলা স্বীকৃত বোলারদের মধ্যে সবচেয়ে বাজে গড় নাসুম আহমেদের। বাঁহাতি স্পিনার ১১ ম্যাচে ৬০.২৮ গড়ে পেয়েছেন সাত উইকেট।