গণবর্জন হচ্ছে মনে হচ্ছে না। যদি হয়, তাহলে চাপ তৈরি হবে
—আনু মুহাম্মদ
সাবেক অধ্যাপক, জাবি
গণবর্জনের প্রভাব রাজনীতিবিদরাই ভালো বলতে পারবেন
—এম সাখাওয়াত হোসেন সাবেক সামরিক কর্মকর্তা
দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ আইনজীবী আমাদের কর্মসূচিতে থাকবেন
—কায়সার কামাল
আইনবিষয়ক সম্পাদক, বিএনপি
ডামি নির্বাচন বর্জন, সরকারের পদত্যাগ ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে কয়েক দফায় হরতাল-অবরোধ ও গণসংযোগ শেষে আগামী ১ জানুয়ারি থেকে অসহযোগ আন্দোলনের অংশ হিসেবে গণবর্জন কর্মসূচির পথে হাঁটছে বিএনপি। দলটির নেতাকর্মীরা বলছেন, দলের হাইকমান্ড থেকে বার্তা দেয়া হয়েছে অল্প সময়ের জন্য ‘ডু অর ডাই’ কর্মসূচি পালন করা হবে। দেশের সব আদালতে তাদের আইনজীবীরা যাবেন না। শ্রমিকরা কলকারখানায় যাবেন না, ন্যায্য অধিকারে তারা রাজপথে থাকবেন।
এ ছাড়া কৃষক ও পেশাজীবী যারা রয়েছেন তাদের আন্দোলনে যুক্ত করা হবে। বিএনপি ও তার অঙ্গ সংগঠন— যুবদল, ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দল রাজপথে সামনের সারিতে ভূমিকা পালন করবে। আগামী ৭ জানুয়ারি ভোটারদের কিভাবে দূরে রাখা যায় তার চূড়ান্ত ফরমেট তৈরি করেই দলটি এগোচ্ছে। তার অংশ হিসেবে গত ২৩ ডিসেম্বর একটি অনুষ্ঠানে আগামী ১ জানুয়ারি থেকে গার্মেন্ট সেক্টরে শ্রমিক ধর্মঘট কর্মসূচি ঘোষণা করেছে সম্মিলিত শ্রমিক পরিষদ-এসএসপি। এ ছাড়া বিএনপিপন্থি আইনজীবীরাও ১ থেকে ৭ জানুয়ারি আদালত বর্জন কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। এ নিয়ে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে— বিএনপির এমন গণবর্জন কর্মসূচিতে কী প্রভাব পড়বে। স্বয়ং বিএনপির নীতি-নির্ধারকরাও বলতে পারছেন না গণবর্জন কর্মসূচির ফলাফল কী হবে? এ ছাড়া রাজনীতিতে চোখ রাখা সংশ্লিষ্টরাও বিএনপির কর্মসূচি নিয়ে কেউ আগাম মন্তব্য করতে চাচ্ছেন না। কোন পদ্ধতিতে গণবর্জন কর্মসূচি সফল হবে, তৃণমূল নেতাকর্মীরাও অন্ধকারে। ১৯ জন স্থায়ী কমিটি ও ৫০২ সদস্যের নির্বাহী কমিটি নেতাদের মধ্যে আটক মাত্র ৯১ জন। বাকিরা আত্মগোপনে। মাঠপর্যায়ের নেতারা কারো সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না। লন্ডন থেকে আসা নির্দেশনায় বিচ্ছিন্নভাবে কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছে।
রাজনীতিতে চোখ রাখা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিএনপির গত ১৫ বছর শুধু ভুল পথেই হেঁটেছে। সময়ের আলোকে যখন যা করা দরকার তা করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাদের কর্মসূচিতে কোনো পরিকল্পনা লক্ষ করা যায় না। তৃণমূল পর্যায়ে এ দলটির নেতাকর্মী আছে, জনপ্রিয়তা আছে, ভাঙন তৈরি হয়নি। এ জন্য দলটি এখনো টিকে আছে। ঈদের পর আন্দোলন এমন খবরে দলটি দীর্ঘ সময় কাটিয়ে দিয়েছে। এরপর এসেছে পূজার পর আন্দোলনে। গত ২৮ অক্টোবর সমাবেশ পণ্ড হওয়ার পর থেকে হরতাল-অবরোধে তারা জনগণকে তেমন সম্পৃক্ত করতে পারেনি। এখন চলছে অসহযোগ আন্দোলন। পঞ্চম ধাপে চলছে লিফলেট বিতরণ কর্মসূচি। মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মী ও শরিকদের অনেকেই আগে থেকে এই কর্মসূচি সম্পর্কে অবগত নন বলে গণমাধ্যমে অনেক সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। আগামীতে যে গণবর্জন কর্মসূচি পালন হবে কিভাবে, কার্যকর হবে— তা নিয়ে নেতাকর্মীদের আগে থেকে কোনো তথ্য নেই। হরতাল-অবরোধ ডেকেও রাস্তায় না নামা, লিফলেট কর্মসূচি পালন করেই কী ভোটারদের দূরে রাখা যাবে? এমন প্রশ্ন স্বয়ং বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যেও রয়েছে বলে করছেন বিশ্লেষকরা।
জানতে চাইলে একটি জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আমার সংবাদকে বলেন, ‘জামায়াতকে নিয়েই এক মঞ্চে কর্মসূচি হতে পারে। এ কর্মসূচি সফলতা নিয়েও আমরা অনেক স্বপ্ন দেখেছিলাম। আমাদের কিছু বৈঠকও হয়েছে। তাদের সঙ্গে যোগাযোগও অব্যাহত ছিল। এখন অজানা কারণে সেটি হবে কি-না আশঙ্কা রয়েছে। তবে এখন স্বল্প সময়ের বড় কর্মসূচি হবে জনগণকে ভোটকেন্দ্র থেকে বিরত রাখতে— এমন বার্তা রয়েছে।’ তবে কিভাবে কর্মসূচি পালন হবে তিনি অবগত নন বলে জানান। চলমান কর্মসূচি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘দেখুন যাদের দু’-একজন নেতাকর্মী আছে, ব্যানারসর্বস্ব দল দিয়ে পল্টন প্রেস ক্লাবে পুলিশি নিরাপত্তায় কর্মসূচি পালন করলে কী আন্দোলন সফল হবে। পল্টন প্রেস ক্লাবের আন্দোলনে এই সরকার সরবে না।’ তৃণমূল বিএনপিকে বাঁচাতে জামায়াতকে নিয়েই এক মঞ্চে আন্দোলনের বিকল্প নেই বলে যোগ করেন এই তৃণমূল নেতার।
জানতে চাইলে বিএনপির আইন-বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার কায়সার কামাল আমার সংবাদকে বলেন, ‘১ থেকে ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত সর্বোচ্চ আদালতসহ সব আদালত বর্জনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছি। ইতোমধ্যে আমাদের কর্মসূচি সফলে আইনজীবীরা দেশের বিভিন্ন জায়গায় লিফলেট বিতরণ করে গণসংযোগ করছেন। শুধু আমাদের আইজীবীরা নন, দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ আইনজীবী আমাদের এই কর্মসূচিতে থাকবেন। তা ছাড়া ঢাকাসহ দেশের সব জায়গায় আমাদের হাজার হাজার আইনজীবী রয়েছেন, তারা সাত দিন কেউ আদালতে যাবেন না। অসহযোগ আন্দোলনে শ্রমিকদের গণবর্জনে সম্পৃক্ততার বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিশেষ সহকারী ও শ্রমিক নেতা অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস আমার সংবাদকে বলেন, ‘গণবর্জনে শ্রমিকদের বিষয় নিয়ে আমি এখনই কিছু বলতে পারব না। এ বিষয়ে আমাদের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান ও শ্রমিকদের নিয়ে যিনি কাজ করছেন, আনোয়ার হোসাইন— তারা ভালো বলতে পারবেন। তারাই শ্রমিকদের গণবর্জন নিয়ে কথা বলবেন। আমি শ্রমিকদের ইস্যু নিয়ে এখন কোনো কথা বলব না।’
সাবেক সামরিক কর্মকর্তা ও নির্বাচন বিশ্লেষক এম সাখাওয়াত হোসেন আমার সংবাদকে বলেন, ‘নির্বাচন কী? যার ফলাফল সবারই জানা, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কেমন হয়, তা শুধু লক্ষণীয় নয়, বড় ধরনের গবেষণার বিষয় হতে পারে। এখন বিরোধীদের গণবর্জনে কী হতে পারে তা আমার পক্ষে বলা অসম্ভব। রাজনৈতিক বিশ্লেষক যারা রয়েছেন তারা ভালো বলতে পারবেন। আর যারা রাজনীতি করেন তাদের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকতে পারে আমাদের কাছে এ নিয়ে কোনো তথ্য নেই। গণবর্জন কী? রাজনীতিবিদদের জিজ্ঞেস করুন ...তাদের কাছেই জানুন এটিই ভালো হবে।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ আমার সংবাদকে বলেন, ‘কোনো গণবর্জন হচ্ছে বলে আমার মনে হচ্ছে না। যদি হয় তাহলে বহু ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। আর রাজনীতিবিদদের ভাবনা আগাম জানা সম্ভব নয়। তারা শ্রমিক, আইনজীবী ইত্যাদির মাধ্যমে গণবর্জন কর্মসূচি কীভাবে পালন হবে, তারাই ভালো বলতে পারবেন। যদি হয় তখন পরিস্থিতি বোঝা যাবে। আর এবারের নির্বাচনটি তো ২০১৪ সালের মডেলের সমপ্রসারণ। আগে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন, এবার ভোটারদের উপস্থিত করার জন্য স্বতন্ত্র, ডামি প্রার্থী দিয়ে নিজেদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার খেলা তৈরি করেছে। বলা হচ্ছে, যারা ভোট দিতে যাবে না, তারা হচ্ছে গণতন্ত্রবিরোধী, নির্বাচনবিরোধী। সরকার জনগণের ওপর ভর করছে না। তারা অন্য শক্তির ওপর ভর করছে।’