এক দিন পর শুরু হচ্ছে নতুন বছর। বিগত বছরের হালখাতার হিসাব মেলাচ্ছেন অনেকে। কেমন ছিলেন দেশের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা? এমন জবাব খুঁজছেন তারা। প্রত্যেক সরকারের শেষ বছরকে ধরা হয় নির্বাচনের বছর। এ সময় বিভিন্ন দাবি-দাওয়া আদায়ে হিড়িক পড়ে। এসব আন্দোলনের অধিকাংশই ব্যর্থ হয়। কিছু কিছু সফলতা পায়। এ সময় সরব থাকে বিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলো। সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা ও প্রতিবাদ সক্রিয় থাকেন তারা। ২০২৩ সাল সাধারণ বাস্তবতার ব্যতিক্রম ছিল না। এ ছাড়া প্রতি বছরই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার ও বাকস্বাধীনতা লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার প্রতিবাদ জানান শিক্ষার্থীরা। এ বছরও এর ব্যতিক্রম হয়নি। কেমন ছিল ২০২৩ সালের প্রতিবাদ ও দাবি আদায়ের আন্দোলন?
জানা যায়, ২০২৩ সালে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় অর্ধশত বিষয়ে প্রতিবাদ ও দাবি আদায়ে আন্দোলন করেছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। এর মধ্যে বৈষম্যবিরোধী ও দাবি আদায়ের আন্দোলনগুলো বেশি জমেছে। তবে শিক্ষার্থীদের দাবি আদায় ও প্রতিবাদের অধিকাংশই হয়েছে সাধারণ শিক্ষার্থীর ব্যানারে। আন্দোলনগুলো হলো— মাধ্যমিক শিক্ষা ও ইবতেদায়ি মাদ্রাসা জাতীয়করণ, চাকরিতে বয়সসীমা বৃদ্ধিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের আন্দোলন, শিক্ষক ও অভিভাবকদের কারিকুলামবিরোধী আন্দোলন, এনটিআরসির ও প্রাথমিকের চাকরিতে অনিয়মের প্রতিবাদে আন্দোলন, ম্যাটস শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, এইচএসসি পরীক্ষা পেছানোর দাবি, ইন্টার্ন ডাক্তারদের সম্মানী ৫০ হাজার করার দাবি। হরতাল-অবরোধের মতো রাজনেতিক কর্মসূচিতে বেশি সরব ছিল সরকারবিরোধী ছাত্র সংগঠন। ফিলিস্তিন ইস্যুতে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিবাদ মিছিল করেছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।
মাধ্যমিক শিক্ষা জাতীয়করণ আন্দোলন : দেশের মাধ্যমিক শিক্ষা জাতীয়করণের (সরকারিকরণ) দাবিতে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে টানা ২৩ দিন আন্দোলন করেছেন বেসরকারি শিক্ষকরা। গত ১১ জুলাই থেকে ২ আগস্ট পর্যন্ত এ আন্দোলন হয়। বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির নেতৃত্বে সারা দেশ থেকে শিক্ষকরা আন্দোলনে আসেন। আন্দোলনে শিক্ষকদের সরব উপস্থিতি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে। এর ফলে সরকারি শিক্ষকদের মতো এমপিওভুক্ত শিক্ষকরাও ৫ শতাংশ প্রণোদনা পান। যদিও শিক্ষকদের জাতীয়করণ বাস্তবায়ন হয়নি। এরপরও শিক্ষক নেতারা মনে করছেন, আগামীতে এর ভালো প্রভাব থাকবে। এ দাবিতে বড় আন্দোলন করতে পারলে তারা সফল হবেন।
কারিকুলামবিরোধী আন্দোলন : অর্ধবছর পরই দেশে কারিকুলামবিরোধী আন্দোলন গড়ে উঠে। এ নিয়ে ধীরে ধীরে আন্দোলনে নামেন তারা। বিগত দুই মাস ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও স্কুলগুলোতে অভিভাবকদের মধ্যে প্রচারণার মাধ্যমে শিক্ষাক্রমবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলেন। অভিভাবকদের আন্দোলনে নতুন করে ঘি ঢেলে দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি আন্দোলনকারীদের ‘কোচিং ব্যবসায়ী’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এরই প্রতিবাদে বড় ধরনের আন্দোলনের চেষ্টা করেছেন অভিভাবকরা। নিজেদের যৌক্তিক আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্যই সরকার এমন কথা বলছে, বলে অভিযোগ তাদের। এক লিখিত বক্তব্য তারা এ ধরনের বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি জানান।
ইবতেদায়ি শিক্ষা জাতীয়করণ আন্দোলন : প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা জাতীয়করণসহ আট দফা দাবিতে পুরো বছরজুড়ে বিভিন্ন ধরনের আন্দোলন করেছেন স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা শিক্ষক ঐক্যজোট। প্রতি বছর নির্বাচন পূর্ব সময়ে ইবতেদায়ি শিক্ষকদের আন্দোলন সরব থাকে। এরপরও তাদের বৈষম্যগুলো এখনো দূর হয়নি। মাঝে মধ্যে সরকারের কর্তাদের আশ্বাস পেলেও বাস্তবে কিছু পাননি দেশের মাদ্রাসা শিক্ষার প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষকরা।
বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের আন্দোলন : ক্যাডার বৈষম্য, পদোন্নতিসংক্রান্ত সমস্যা সমাধানসহ বিভিন্ন দাবিতে সেপ্টেম্বরের শেষে ও অক্টোবরের মাঝামাঝিতে আন্দোলনে ছিলেন শিক্ষকরা। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ও অফিস আদালতে কর্মবিরতি পালনের পাশাপাশি মানববন্ধনও করেন তারা। বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির অভিযোগগুলো হলো— পদোন্নতি বৈষম্য কমাতে সব ক্যাডারে সুপারনিউমারারি পদ সৃষ্টি করে পদোন্নতি দেয়া, অধ্যাপকদের বেতন গ্রেড তৃতীয় ধাপে উন্নীত করা। শিক্ষা ক্যাডারের তফসিলভুক্ত পদ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর ও সরকারি আলিয়া মাদ্রাসার জন্য পৃথক নিয়োগ বিধিমালা করা হয়েছে।
ইন্টার্ন ডাক্তারদের আন্দোলন : প্রজ্ঞাপনসহ ৫০ হাজার টাকা মাসিক ভাতার দাবিতে আবারও আন্দোলন করেছে বেসরকারি রেসিডেন্ট ও নন-রেসিডেন্ট পোস্টগ্র্যাজুয়েটরা। বছরের মাঝামাঝি সময়ে এ আন্দোলনে প্রধানমন্ত্রীর বরাতে পাঁচ হাজার টাকা বৃদ্ধির তথ্য জানায় স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর। কিন্তু আন্দোলনকারী চিকিৎসকরা এ টাকায় সন্তুষ্ট হননি।
মানবাধিকার ইস্যুতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিবাদ : ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনে ইসরাইলের হামলার প্রতিবাদে দেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবাদ মিছিল হয়েছে। স্কুল ও মাদ্রাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরাও এ প্রতিবাদে অংশ নিয়েছেন। ইসলামী সংগঠনগুলো ঢাকায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের সামনে বিক্ষোভ মিছিল করেন।
রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বিরোধী ছাত্রসংগঠন : ছাত্র সংগঠনের অন্যতম কাজ ছাত্রদের অধিকারের পক্ষে খুবই কম সরব ছিলেন। নিজেদের দলীয় হরতাল ও অবরোধ কর্মসূচিতে বেশি ব্যস্ত দেখা যায়।