দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত ৬৩টি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ একাই ২২৪ আসনে এবং তাদের অনুগত ৬৩ স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন। জাতীয় পার্টি পেয়েছে মাত্র ১১টি আসন। তারাও সরকারের নির্দেশিত পথের অনুসারী। শুধু আওয়ামী লীগ দিয়েই সরকার গঠন হওয়ায় বিএনপিসহ সরকারবিরোধীরা তাদের আন্দোলনকে সফল হিসেবে দেখছে। একতরফা নির্বাচনের বিজয়ে সরকারকে অবশ্যই কঠিন পরাজয়বরণ করতে হবে বলেও ভাষ্য তাদের।
তারা বলছে, দেশের অন্তত ৮৫ ভাগ নাগরিক ভোটকেন্দ্রে যায়নি। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্পষ্ট হয়ছে যে, ভোটকেন্দ্রে তেমন ভোটার ছিল না। অতীতে কুকুর-ছাগলের সঙ্গে এবার ভোটকেন্দ্রে বানরকেও দেখা গেছে। নির্বাচন কমিশন ওপর মহলের নির্দেশে যে ৪০ শতাংশ ভোট দেখিয়েছে, তা ভুয়া। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী দেশের ৬০ শতাংশ মানুষকে ভোটের বাইরে রেখে কেউ সরকারে থাকতে পারে না। তাদের দাবি, দেশের মানুষ বিএনপির আহ্বানে সাড়া দিয়েছে। বিএনপির প্রতি আস্থা জ্ঞাপন করে ভোটকেন্দ্রে না গিয়ে আওয়ামী লীগকে লাল কার্ড দেখিয়েছে।
সরকারবিরোধী নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো বলছে, জনগণ যেহেতু সরকারবিরোধী শক্তির ওপর আস্থা রেখেছে, তাই তারা আন্দোলন থেকে পিছু হটবে না। রাজনৈতিক আলোচনা ও কূটনৈতিক কিছু সমঝোতা শেষে যে আন্দোলনে সরকার সরতে বাধ্য হয়, সেই আন্দোলনেই তারা যাবে। নির্বাচন-পূর্ববর্তী তিন মাস আগে থেকেই সারা দেশে সেই ছক তৈরি করা হয়েছে। দিন-মাস ঠিক করে নয়, যে কোনো সময় বিরোধী রাজনীতিতে সুদিন ফিরবে। জনগণের সমর্থনে আন্দোলনের মাধ্যমেই আওয়ামী লীগের পরাজয় ঘটবে। এবার নির্বাচন সামনে রেখে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে বিএনপিকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিতে। সরকার সে জায়গায় ব্যর্থ হয়েছে। দলের মূল আদর্শের কেউ লোভে পড়েননি। বিএনপির যৌথ নেতৃত্বের প্রতি সব নেতাকর্মীর আস্থা আছে।
বামপন্থি শীর্ষ দুই নেতা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কূটনৈতিক বৈঠকে যান— এমন দুজনের সঙ্গে কথা হয় আমার সংবাদের। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হয়ে তারা বলেন, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী বলেছেন ‘আমেরিকার লজ্জা নেই, কখন কাকে তারা ক্ষমতায় নিয়ে আসে’। এ কথার সঙ্গে অবশ্যই বহু হেকমত জড়িয়ে রয়েছে। তিনি রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তি হিসেবে সেই আভাস জানেন। এবার বিএনপিসহ সরকারবিরোধী যারা রয়েছেন, তারা আন্দোলনে সফল। তাদের আহ্বানে দেশের সিংহভাগ মানুষ ভোটে যায়নি। বিদেশিরাও এ নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য বলেনি। বিষয়টি প্রায় স্পষ্ট যে, ক্ষমতাসীন দল একটি দেশের চাওয়া-চাহিদাকে অধিক গুরুত্ব দিয়েছে। একটি দেশের প্রেসক্রিপশনের আলোকে নির্বাচনপর্ব থেকে শপথ পর্যন্ত সব কাজ শেষ করেছে। এ বিষয়গুলো ভৌগোলিক কারণে প্রভাব পড়বে। এখন এটি প্রায় অনুমান করা যায় বিএনপি-জামায়াতসহ সরকারবিরোধী কোনো দলকে সামনে এনে কূটনৈতিকশিষ্টতা রক্ষা করে বিপরীত অংশ স্বার্থ হাসিল করবে। সরকারবিরোধীরা এখন নীরব থাকলেও তারা নীরব থাকবে না। যে কোনো সময় ক্ষোভের বিস্ফোরণ এখন মাত্র সময়ের ব্যাপার। আওয়ামী লীগ যেমন কিছু শক্তির হাত ধরেই সামনে চলছে, তেমনই সরকারবিরোধীরাও বিরোধী শক্তিগুলোকে নিয়ে আওয়ামী লীগকে চূড়ান্ত বাধা দেবে। তখন কে চূড়ান্তভাবে সামনে থাকবে, তা এখনই বলা না গেলেও সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দল বাংলাদেশে ক্ষমতায় নাও আসতে পারে। সংস্কার পদ্ধতিতে রাষ্ট্র নির্মাণের পর বিএনপিসহ সরকারবিরোধীদের সুদিন ফেরার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও ভাষ্য তাদের।
রাজনীতিতে চোখ রাখা সংশ্লিষ্ট ও বিএনপির সিনিয়র নেতারা বলছেন, শুধু দেশের নাগরিকরা নন, বিদেশিরাও এ নির্বাচনকে বৈধতা দেননি। নির্বাচনে অনিয়মের বিষয়টি উল্লেখ করেছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জাতিসংঘ। নির্বাচনে সব দল অংশ না নেয়ায় তারা হতাশ হয়েছে বলে জানায়। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এর আগে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে র্যাবের বর্তমান ও সাবেক সাত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে এবং ভিসানীতি প্রয়োগ করেছে। বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার হাস সাক্ষাৎ করেছেন গুমের শিকার পরিবারগুলোর সঙ্গে। গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য চিঠি দিয়ে সংলাপের আহ্বান করা হলেও আওয়ামী লীগ তাতে সাড়া দেয়নি। নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে হোয়াইট হাউস থেকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের নীতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। অস্ট্রেলিয়া সরকার থেকে বলা হয়েছে, দুঃখজনক যে, এ নির্বাচন এমন এক পরিবেশে হয়েছিল যেখানে সব অংশীজন অর্থপূর্ণ ও প্রকৃতভাবে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বন্ধু হিসেবে নির্বাচনের আগে ঘটে যাওয়া ‘সহিংসতা ও বিরোধী দলের (রাজনৈতিক) সদস্যদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে অস্ট্রেলিয়া উদ্বিগ্ন’ শীর্ষক এক প্রতিবেদন দ্য ডিপ্লোম্যাট জানিয়েছে— নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যখন আরও পাঁচ বছর মেয়াদ নিশ্চিত করল, তখন তা একটি ‘পিরিক বিজয়’ হিসেবে ঝুঁকি সৃষ্টি করছে (এমন একটি বিজয়কে পিরিক বিজয় বলে আখ্যায়িত করা হয়, যে বিজয়ে বিজয়ীকে ভীষণ মূল্য দিতে হয়— যা তার পরাজয়ের সমতুল্য)। এছাড়া আরও বেশকিছু মানবাধিকার সংগঠনও অংশগ্রহণ এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
সামগ্রিক বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আমার সংবাদকে বলেন, আওয়ামী লীগই বিদেশিদের ওপর ভর করে ক্ষমতায় টিকে আছে। ডামি নির্বাচনের মাধ্যমে ডামি সরকার গঠন করে ক্ষমতায় এসেছে। এবার জনগণ ভোটকেন্দ্রে না গিয়ে তাদের বয়কট করেছে। জনগণ চূড়ান্তভাবে তাদের লাল কার্ড দেখিয়েছে। গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জালভোট ও অনিয়মের হাজারো চিত্র ভাইরাল হয়েছে। শিশুরাও দেদার সিল মেরেছে। আগে ভোটকেন্দ্রে গরু-ছাগলসহ চতুস্পদ প্রাণী বিচরণ করলেও এবারের নির্বাচনে নতুন সংযোজন হয়েছে বানর। এই প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন দেশে-বিদেশে কোথাও গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও আমাদের উন্নয়নে অংশীদারী দেশগুলোও এই তামাশার নির্বাচন বাতিল করে নতুনভাবে নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানিয়েছে। আমরা দাবি জানাচ্ছি, আন্দোলনে রয়েছি। আমাদের আন্দোলনের পরিপূর্ণতার স্রোত আমরা যত বয়ে দেব, স্রোতের ধারা যত আসবে, ততই আন্দোলন পরিপূর্ণ হবে এবং তারা (সরকার) পরাজিত হবে।
সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আবদুর রব আমার সংবাদকে বলেন, ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ নির্বাচন বর্জন করায় ডামি নির্বাচনে ‘ডামি সংসদ’ এবং ‘ডামি সরকার’ গঠিত হয়েছে। সুতরাং জনগণের সম্মতি ও সমর্থনের ভিত্তিতে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজনে অবিলম্বে ডামি সংসদ বাতিল করতে হবে এবং তার সঙ্গে ডামি সরকারকেও পদত্যাগ করতে হবে। তিনি বলেন, আত্মঘাতী নির্বাচন রাষ্ট্রকে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে চরম বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছে। দেশের আর্থিক অবস্থাসহ স্থিতিশীলতা চরম হুমকির মুখে পড়েছে। এ অবস্থায় এমন একটি নির্বাচন প্রক্রিয়া প্রবর্তন করতে হবে যা জনগণের অভিপ্রায়ের ভিত্তিতে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে সমাজের সব অংশের মানুষের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটবে; যে প্রক্রিয়ায় সব মানুষের শ্রদ্ধা ও আস্থা স্থাপিত হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অণুপ্রাণবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মামুন আহমেদ আমার সংবাদকে বলেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসলে অর্থবহ নির্বাচন হয়নি। কারণ, এটি ছিল সাজানো নির্বাচন। সরকার যাকে চেয়েছে তিনিই নির্বাচিত হয়েছেন; যাকে চায়নি তিনি নির্বাচিত হয়ে আসতে পারেননি। নির্বাচনটি ছিল একতরফা। যারা প্রার্থী হয়েছেন, তারা প্রায় সবাই একই রাজনৈতিক ঘরানার।
বিএনপিসহ সরকারবিরোধী যারা রয়েছেন, এবার তাদের আন্দোলন সফল বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এবার বিএনপি সফল হয়নি— এটা বলার সুযোগ নেই। দেখতে হবে বিএনপি প্রথম থেকে কী চেয়েছে? একটি অগ্রহণযোগ্য নির্বাচনি ব্যবস্থার কারণে যে রাজনৈতিক সংকট দেশে আছে, এর সমাধান চেয়েছে তারা। তাদের দাবির মূলে ছিল কার্যত গণতন্ত্র ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা, মানুষের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং একটি মানবাধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন করা। বিএনপির এ রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার প্রতি সাধারণ মানুষ আস্থা রেখেছে। এই সফলতার মাধ্যমে তাদের এখন যে কোনো আহ্বান সফল হওয়া সময়ের ব্যাপার। যেহেতু দেশের সিংহভাগ মানুষ এ দলটির ওপর আস্থা রেখেছে, তাই তাদের সুদিনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না।