বেসরকারি এক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন রফিকুল ইসলাম। কর্মস্থলের সুবাধে দীর্ঘদিন ধরে স্বপরিবার ঢাকায় বাস করছেন তিনি। কিন্তু বর্তমানে নিত্যপণ্যের দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে ব্যয় বেড়েছে কয়েকগুণ। এতে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার আয়ের পরিমাণ আগে যা ছিল এখনো তেমনই আছে। ফলে তিনি পরিবার নিয়ে ঢাকাতে থাকা অসম্ভব হয়ে গেছে। আয়ের বড় একটি অংশ চলে যায় আবাসন খরচ হিসেবে। বাকি টাকায় সংসার পরিচালনা করা দুরূহ ব্যাপার হয়ে পড়েছে।
রাজধানী ঢাকা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর শহরের মধ্যে ব্যয়বহুল শহরের তালিকায় প্রথম স্থানে রয়েছে। ব্রিটিশ ম্যাগাজিন দ্য ইকোনমিস্টের ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের বিশ্বব্যাপী জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে তাদের সর্বশেষ প্রকাশ জরিপে এমনটিই উঠে আসে। জরিপে বলা হয়েছে, গ্লোবাল লাইভেবিলিটি ইনডেক্স-২০২৩-এ ১৭৩টি শহরের মধ্যে জিম্বাবুয়ের হারারের সঙ্গে যৌথভাবে ১৬৬তম অবস্থানে রয়েছে রাজধানী ঢাকা। এটি সূচকে সপ্তম সর্বনিম্ন বাসযোগ্য শহর হিসেবে অবস্থান করছে। ঢাকা একদিকে যেমন ব্যয়বহুল শহর ঠিক তেমনি বসবাসেরও অযোগ্য। আগের বছরের সূচকে ঢাকা নিচের দিক থেকে সপ্তম স্থানে অবস্থান করেছিল।
ব্রিটিশ ম্যাগাজিন দ্য ইকোনমিস্টের ইন্টেলিজেন্স ইউনিট সাধারণত পাঁচটি দিক বিবেচনা করে বাসযোগ্য শহরগুলোকে পরিমাপ করে।
সেগুলো হলো— স্থায়িত্ব, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা ও অবকাঠামো। তবে ঢাকা ছাড়াও অন্যান্য বেশ কয়েকটি শহর রয়েছে যা খুব ব্যয়বহুল এবং বাসযোগ্যতা সূচকে নিচে অবস্থান করছে। ব্রিটিশ ম্যাগাজিন দ্য ইকোনমিস্টের ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের জরিপে আরও জানা যায়, বিশ্বে সবচেয়ে ব্যয়বহুল শহরের তালিকায় প্রথমে রয়েছে সিঙ্গাপুর। যার সূচক মান ১০৪। আর সবার শেষে অর্থাৎ সবচেয়ে কম ব্যয়বহুল শহর হল সিরিয়ার দামেস্ক (সূচক মান ১৩)। দামেস্ক কম ব্যয়বহুল শহর হলেও বিশ্বব্যাপী বসবাসযোগ্যতার র্যাংকিংয়ে নিচে ১৭৩তম স্থানে অবস্থান করছে। আর জরিপে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার সূচক মান ৫৬। এই জরিপের জন্য ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) ১৭৩টি শহরের ২০০টিরও বেশি পণ্য এবং পরিষেবাগুলোর ৪০০ এরও বেশি স্বতন্ত্র মূল্যের তুলনা করেছে। জীবনযাত্রার ব্যয়ের দিক থেকে টরন্টো, ক্যালগারি, মন্ট্রিল ও লিসবনের মতো শহরগুলোর কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে ঢাকা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জীবনযাত্রার সূচক হিসেবে উন্নত পরিবহনে চলাচল, সাশ্রয়ী মূল্যের যোগাযোগ ব্যবস্থা, ট্রাফিক ঘনত্বের পাশাপাশি আবাসন, খাদ্য, শিক্ষা এবং সাশ্রয়ী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একটি শহরের জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় রয়েছে, এর অর্থ শহরটি তার জনসংখ্যার ৪০ থেকে ৫০ শতাংশের জন্য অত্যন্ত অসাশ্রয়ী হয়ে উঠেছে। একইসঙ্গে জীবনযাত্রার মান এই গোষ্ঠীর জন্য চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠবে। যদি কোনো শহরে খুব বেশি বিনিয়োগ হয় তবে এর অর্থ আপনি বিনিময়ে কিছু পেতে প্রচুর অর্থ ব্যয় করছেন। শহরটি আসলে এর সঙ্গে আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। মেগাসিটিগুলোতে বিশাল জনসংখ্যা রয়েছে, যা সবকিছুর জন্য উচ্চ চাহিদা তৈরি করে। আদর্শ পরিকল্পনার মাধ্যমে একটি শহরে অ্যাক্সেসযোগ্য অবকাঠামো, অ্যাক্সেসযোগ্য আবাসন এবং অ্যাক্সেসযোগ্য অর্থনৈতিক সুবিধা থাকতে পারে।
ঢাকায় আবাসনের মান খুবই খারাপ। নিম্ন আয়ের মানুষ বস্তিতে বসবাস করে এবং নিম্ন মধ্যবিত্তদের বাসস্থান ভালো মানের নয়। আমাদের পরিবহন ব্যবস্থারও গুণগত মান নেই। উন্মুক্ত ও সবুজ স্থান এবং পার্কের পরিমাণে আমরা বিশ্বব্যাপী সর্বনিম্ন। প্রাথমিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মানের মধ্যেও একটি উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে। বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে আয়ের স্তরের বৈষম্যের দিক থেকেও বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম খারাপ অবস্থানে রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান আমার সংবাদকে বলেন, রাজধানীর ব্যয় বাড়ার অনেকগুলো কারণ রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো আবাসন খরচ খুবই বেশি। যা আমাদের আয়ের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। ফলে আয়ের বেশিরভাগ এখানে চলে যাচ্ছে। সেই সাথে পরিবহন ব্যয়ও বেশি। নিত্যপণ্যের দাম লাগামহীনভাবে বাড়ার কারণে ব্যয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঢাকাতে নিম্ন মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত প্রায় ৭০ শতাংশ লোক বাস করে। এই বিশাল সংখ্যক জনগোষ্ঠীর ব্যয় বাড়াতে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে গেছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অধ্যাপক আরও বলেন, ঢাকাতে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল খুবই সীমিত। বাধ্য হয়ে সবাই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যেতে হয়। ফলে ব্যয়ের পরিমাণও বেড়ে যায়। ব্যয়ের পরিমাণ বাড়লেও মানুষের প্রকৃত আয় বাড়েনি। মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য ব্যয়বহুল শহরে বাস করাটা কষ্টকর। বর্তমানে সব ধরনের ব্যয়ের খাত ঊর্ধ্বমুখী। আয়ের চেয়ে ব্যয় বাড়াতে কম খরচের আবাসনে থাকছে অনেকে। ব্যয়ের সাথে টিকতে না পেরে অনেকে পরিবার গ্রামে পাঠিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে পরিবর্তন হয়ে গেছে খাবারের তালিকাও। ফলে প্রতিদিন যে পরিমাণ ক্যালরি গ্রহণ করা দরকার তা পাচ্ছে না। কেউ কেউ ব্যয় সামলাতে না পেরে ঢাকা ছেড়ে দিচ্ছেন।
বিআইপির সভাপতি বলেন, আবাসন ব্যয়ের জন্য সরকারি আইন বাস্তবায় করা জরুরি। যদিও সরকার ইতোমধ্যে আবাসন আইন জারি করেছে কিন্তু তার প্রয়োগ নেই। আবাসন খরচ খুব বেশি হওয়ায় ব্যয়ের পরিমাণটা বেড়ে যাচ্ছে। যানবাহনের ব্যয়ের পরিমাণ কমিয়ে আনতে হবে। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে খাদ্য পণ্যের দামকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ব্যয়ের পরিমাণ কমানো যাবে না। এভাবে চলতে থাকলে শহরের অবস্থা আরও শোচনীয় হতে পারে।