বিজ্ঞাপন ব্যবসায় আসছে মেট্রোরেল

আব্দুল কাইয়ুম প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২৪, ০১:৩৩ এএম
  • চার কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হয়েছে
  • মেট্রোরেলে হাফ পাসের সুযোগ নেই
  • যোগ হবে টিওডি হাব
  • পৌনে তিন লাখ যাত্রী চলাচল করছে
  • স্টিকারের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেয়া হবে
  • টিকিট বিক্রি থেকে আসছে না পরিচালনা ব্যয়ের আয়
  • সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখে বিজ্ঞাপনের ব্যবস্থা করা হবে

মেট্রোরেলে বিজ্ঞাপন না থাকলে যাত্রীভাড়া বেড়ে যাবে; কারণ আয় ছাড়া মেট্রোরেল চলতে পারে না
—মোহাম্মদ আবদুর রউফ, সচিব, ডিএমটিসিএল

মেট্রোরেলের পরিচালনা ব্যয় মেটাতে না পেরে নন-রেল বিজনেসের দিকে যাচ্ছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ। এরই মধ্যে কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে বিজ্ঞাপনের জন্য চুক্তিবদ্ধও হয়েছে। বর্তমানে টিকিট বিক্রির আয় থেকে ট্রেনের পরিচালনা ব্যয়ের মাত্র ৬৫ শতাংশ আসছে। মেট্রোরেল এখনো পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ আয় করতে পারছে না। সামনে মেট্রোরেলে যাতায়াতে যোগ করা হবে ট্রানজিট ওরিয়েন্টেড ডেভেলপমেন্ট (টিওডি) হাব। ব্যক্তিগত গাড়ি রেখে মেট্রোতে ভ্রমণ করতে পারবেন যাত্রীরা। পার্কিং ছাড়াও বাড়তি রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যে এসব টিওডিতে থাকবে বিপণিবিতান, হোটেল, বিনোদনকেন্দ্রসহ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মেট্রোরেলে বিজ্ঞাপন নিয়ে ইতোমধ্যে সমালোচনা উঠেছিল। যার প্রধান কারণ ছিল সৌন্দর্য নষ্ট। তবে এবার যেন সবকিছু ঠিক থাকে, সেদিকে লক্ষ রাখা জরুরি।

ডিএমটিসিএল সূত্রমতে, ইতোমধ্যে বিজ্ঞাপনের জন্য বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে কথা চলছে তাদের। তাছাড়া কিছু মিডিয়ার সঙ্গেও কথা হয়েছে। মিডিয়াকম, ডাচ্-বাংলা, ইস্টার্ন ব্যাংক ও চ্যানেল আইয়ের মাত্রাডটকমের সঙ্গেও চুক্তি হয়েছে বলে জানা গেছে। এগুলো থেকে যে আয় আসবে, তা নন-রেল বিজনেসের আওতায় থাকবে। কেউ শুটিং করতে চাইলে সেখান থেকেও আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া যাবে। আর এসব বিষয় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ। 

মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের দাবি, যখন সংখ্যায় পাঁচ লাখ যাত্রী পুরোদমে চলাচল করবে, তখন থেকে ৬৫ শতাংশ পরিচালনা ব্যয় আয় করা সম্ভব। বর্তমানে পৌনে তিন লাখ যাত্রী চলাচল করছেন। তারা আরও বলেন, কমলাপুর পর্যন্ত সম্পূর্ণ লাইন চালু হলে পাঁচ লাখের অধিক যাত্রী চলাচল করতে পারবেন। মেট্রোরেল দিন-রাত চলাচল করলে ব্রেক ইভেন্ট পয়েন্টের অধীনে থাকবে। এর জন্য অবশ্যই আরও দুই থেকে তিন বছর অপেক্ষা করতে হবে। মেট্রোরেলের পরিচালনা ব্যয় অনেক বেশি, যা শুধু যাত্রীদের ভাড়া থেকে আসা সম্ভব নয়। এজন্য অন্য দিক থেকে আয় করতে হয়। এর জন্য বিজ্ঞাপনের ব্যবস্থা করতে হবে, যাকে নন-রেল বিজনেস বলা হয়।

ডিএমটিসিএল সূত্র জানায়, তারা এখনো সফট অপারেশনে আছে। পুরোপুরি কমার্শিয়াল অপারেশন এখনো শুরু করতে পারেনি। কারণ প্রজেক্টের কাজ এখনো শেষ হয়নি। কমলাপুর পর্যন্ত প্রজেক্ট শেষ হতে আগামী বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তারপর থেকেই মূলত লাভ-ক্ষতির হিসাব করা যাবে। সম্পূর্ণভাবে চালু হলে কর্মীদের ব্যয়, পরিচালনা ব্যয়, বিদ্যুৎ বিল ও সবকিছুর আর্থিক বিষয় উঠে আসবে। টিকিট বিক্রির আয় দিয়ে পুরোপুরিভাবে লাভের আশা করা যাবে না। কারণ, এখনো সব কাজ সম্পন্ন হয়নি। এই প্রজেক্টে প্রায় ৩৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। তাছাড়া এখানে ঋণের একটি বিষয় রয়েছে। ইতোমধ্যে দুটি কিস্তি পরিশোধ করা হয়েছে। আরেক কিস্তি আগামী মে মাসে পরিশোধ করা হবে। যেহেতু পুরো কাজ এখনো শেষ হয়নি, তাই আর্থিক ক্ষতি বা লাভের বিষয়টি এখনো বলা যাচ্ছে না। 

ডিএমটিসিএল কোম্পানি সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ আমার সংবাদকে বলেন, প্রতিমাসে শুধু কর্মীদের বেতনই আসছে তিন কোটি টাকা। বিদ্যুৎ বিল প্রায় পাঁচ কোটি টাকার মতো আসে। তাছাড়া বিভিন্ন জিনিসপত্র এবং ম্যানপাওয়ারের খরচও রয়েছে। প্রায় তিন লাখ এআমারটি পাস বিভিন্ন যাত্রীর কাছে আছে। এটিতে এক থেকে ১০ বছর পর্যন্ত মেয়াদি টাকা রিচার্জ করা যাবে। শুধু যাত্রীদের কাছে বিক্রীত টিকিট থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় দেড় কোটি টাকা আয় আসে। এই মেট্রোরেলের পুরো টাকাই সরকারের পক্ষ থেকে দেয়ার কথা। এর মধ্যে দেড়শ কোটি টাকা আমরা পেয়েছি; বাকি টাকা সরকারের কাছ থেকে চেয়েছি। পুরোপুরিভাবে চালুর জন্য সিটমানি হিসেবে এক হাজার কোটি টাকা চেয়েছি। এর মধ্যে দেড় কোটি টাকা পেয়েছি। জাপান সরকারের ঋণ পরিশোধের জন্য ইতোমধ্যে এক কোটি টাকা সরকারের হাতে হস্তান্তর করেছি। সব মিলিয়ে প্রায় ১০০ কোটি টাকা ঋণ রিকভার করা হয়েছে। 

ডিএমটিসিএল কোম্পানি সচিব মোহাম্মদ আবদুর রউফ বলেন, কিছু চুক্তির কার্যক্রম গত ছয় মাস ধরে চলমান রয়েছে। রেলের স্ক্রিনগুলোতে বিজ্ঞাপনের জন্য মাত্রা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। তারা বিভিন্ন কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করবে। ইতোমধ্যে আরও চারটি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হয়েছে। মেট্রোরেল কোনো ব্যক্তি বা কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে। সেই ব্যক্তি বা কোম্পানি বিভিন্নজনের সঙ্গে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। ট্রেনের বাইরে পিএইচডি ডোরগুলোতে বিজ্ঞাপনের ব্যবস্থা থাকবে। ভেতরের বডির মধ্যেও বিজ্ঞাপন দেয়ার সুযোগ থাকবে। বিভিন্ন কোম্পানি স্টিকারের মাধ্যমেও তাদের প্রচার চালাতে পারবে। ট্রেনের বাইরে-ভেতরে এবং স্টেশনের বিভিন্ন স্থানেও তা থাকবে। এমনসব বিজ্ঞাপন না থাকলে যাত্রীভাড়া বেড়ে যাবে। কারণ, আয় ছাড়া মেট্রোরেল চলতে পারে না। ট্রেনের সৌন্দর্য যেন অক্ষুণ্ন থাকে, সেদিকে খেয়াল করে আমরা বিজ্ঞাপনের ব্যবস্থা করব। অনেক দেশে বিজ্ঞাপনের জন্য ট্রেনের চেহারা পাল্টে যায়। তবে আমরা তেমন করব না। মেট্রোরেলে সাধারণত দুই হাজার ৩০৮ যাত্রী উঠতে পারেন। তবে এখনো পর্যন্ত এ পরিমাণে যাত্রী উঠছেন না। প্রতিটি ট্রেনে এখন প্রায় সাড়ে ১৫০০ যাত্রী চলাচল করছেন। তবে সবাই ঠিকমতো উঠতে পারলে এবং দাঁড়ালে ভোগান্তি কমে যাবে।

সম্প্রতি মেট্রোরেলে শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়ার জন্য আন্দোলন করার ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ট্রেন পরিচালনার যে ব্যয়, তা হাফ ভাড়া দিয়ে কখনো চালানো সম্ভব নয়। এ বিষয়ে যতই আন্দোলন হোক না কেন, তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। এমনিতেই যাত্রীভাড়া বেশি বলে অনেকের অভিযোগ, হাফ ভাড়া করলে তখন টিকিটির মূল্য আরও বেড়ে যাবে। তিনি বলেন, অবশ্য ট্রেন চালাতে হলে হাফ ভাড়ার চিন্তাও করা যাবে। সেক্ষেত্রে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ অনেক বেড়ে যাবে। সরকার যদি চায়,  তাহলে হয়তো হাফ ভাড়ার বিষয়ে কথা হবে। তবে আমাদের পক্ষ থেকে এমন কোনো সুযোগ নেই।