নজরুলের রাবণ সৌমিত্র শেখর

মো. নাঈমুল হক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৮, ২০২৪, ১২:৩৭ এএম
  • বিশ্ববিদ্যালয়ের সব পর্যায়েই তার একক আধিপত্য
  • শিক্ষক সমিতিতে অনুগতদের বসাতে ফন্দিফিকির
  • গুচ্ছের আর্থিক বণ্টনে  শিক্ষকদের ক্ষোভ  
  • উন্নয়ন কাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ

একটি শ্রেণি আমাদের বিব্রত করার জন্য এসব করছে
—অধ্যাপক ড. সৌমিত্র শেখর
উপাচার্য, জাককানইবি

কথায় আছে— যে যায় লঙ্কায় (ক্ষমতায়) সেই হয় রাবণ। এ কথার প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাককানইবি) বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. সৌমিত্র শেখর। দায়িত্বের দুই বছরের মাথায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সব পর্যায়ে বসিয়েছেন নিজের অনুগতদের। এমনকি পর্যাপ্ত অনুগত না পাওয়ায় শিক্ষকদের সংগঠন নীল দলের নির্বাচনও গত এক বছরের মতো আটকে রেখেছেন। একই সঙ্গে বন্ধ রেখেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকারপন্থি ছাত্র সংগঠনের কমিটিও। 

এসবের নেপথ্যে তার উদ্দেশ্য— বিশ্ববিদ্যালয়টিতে  অনিয়ম-দুর্নীতির রাজত্ব কায়েম করা। এসব অভিযোগ করছেন খোদ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরাই। তবে সব অভিযোগই অস্বীকার করে তিনি বলেন, আমরা যখন শিক্ষা, গবেষণা ও উন্নয়ন নিয়ে কাজ করছি, তখন একটি শ্রেণি এগুলো উসকাচ্ছে। একটি শ্রেণি আমাদের বিব্রত করার জন্য এসব করছে। ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে কবি নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের ষষ্ঠ ভিসি হিসেবে দায়িত্ব পান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক সৌমিত্র শেখর। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই প্রতিষ্ঠানটিতে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও বজায় রাখতে ধারাবাহিক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের সব পর্যায়ে একক আধিপত্য : বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার, প্রক্টর, ছাত্র উপদেষ্টা, চার হলের প্রভোস্ট, শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও সেক্রেটারি সবাই উপাচার্যের একান্ত অনুগত। আনুগত্য বজায় রাখার জন্য তিনি বিশ্ববিদ্যায়ের আইন ভঙ্গ করে ছাত্র উপদেষ্টা, চার হলের প্রভোস্ট নিয়োগ দিয়েছেন। নিয়োগে বিজ্ঞপ্তিতে পদের সময় উল্লেখ করা হয়নি; বরং বলা হয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত ওই পদে বহাল থাকবেন। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে উল্লেখ আছে, ছাত্র উপদেষ্টা ও প্রভোস্ট হবে দুই বছরের জন্য। অনুগত মনে না করায় বিভিন্ন শিক্ষককে পদোন্নতি বা দায়িত্ব না দেয়া ও বিভিন্ন কর্মকর্তাকে বিভিন্ন দপ্তরে বদলি করার অভিযোগ রয়েছে। তার অনুগত মনে না করায় চারুকলা অনুষদের দুজন অধ্যাপকের পরিবর্তে একজন সহযোগী অধ্যাপককে চারুকলা অনুষদের বিভাগীয় প্রধান করা হয়। 

অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের ২৪ (২) ধারায় বলা হয়েছে, বিভাগীয় অধ্যাপকদের মধ্যে থেকে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে পালাক্রমে তিন বছর মেয়াদে ভাইস-চ্যান্সেলর কর্তৃক বিভাগীয় প্রধান নিযুক্ত হবেন। জ্যেষ্ঠ অধ্যাপকদের কাছে এ ব্যাপারে কারণ জানতে চেয়ে এ প্রতিবেদক প্রশ্ন করলে তারা আইন জানেন না বলে এড়িয়ে যান। উপাচার্য কর্তৃক বৈষম্যের শিকার আরেকজন হলেন নকিবুল হাসান খান। গত বারের গুচ্ছ ভর্তি কমিটির ডিউটি রোস্টারে নাম থাকার পরও তিনি দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। এ ছাড়া পছন্দের মানুষ না হওয়ায় পদোন্নতি আটকে রয়েছে অনেক শিক্ষকের। অভিযোগ রয়েছে, উপাচার্যের রোষানলে পড়ার ভয়ে এসব বিষয়ে তারা কথা বলতে চান না। এ প্রতিবেদক এমন কয়েকজন শিক্ষককে ফোন দিলে তারা বিষয়টিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ উল্লেখ করেন। এ ছাড়া উপাচার্যের অনৈতিক উদ্দেশ্যের পথে প্রতিবন্ধক মনে করায় এ রকম ১৫ জনের অধিক কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর থেকে কম গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে বদলি করার অভিযোগ রয়েছে। 

শিক্ষক সমিতিতে অনুগতদের বসাতে ফন্দিফিকির : গত এক বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীল দলের কমিটি নেই। মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির সভাপতি উজ্জল কুমার প্রধান ও সেলিম আল মামুনের মাধ্যমে দলটির নির্বাচন বন্ধ রেখেছেন। অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষক সমিতির নির্বাচনকে প্রভাবিত করার জন্যই এ নির্বাচন বন্ধ রেখেছেন তিনি। এ ছাড়া শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও সেক্রেটারি পদে তার পছন্দের প্রার্থীদের বসানোর জন্য শিক্ষকদের নানাভাবে প্ররোচিত করেন তিনি। গত বছর রিয়াদ হাসান ও জান্নাতুল ফেরদৌসকে সভাপতি ও সেক্রেটারি করার জন্য সরাসরি শিক্ষকদের থ্রেট দেন। এ বছরও শিক্ষক সমিতির নির্বাচন ২৫ ফেব্রুয়ারি। এ নির্বাচনকে প্রভাবিত করার জন্য শিক্ষকদের দুটি গ্রুপ নিয়ে ময়মনসিংহ শহরের অবন্তি অ্যারোমা রেস্টুরেন্টে ডিনার করিয়েছেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে আমার সংবাদকে বলেন, উনি আসার পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়কে ধ্বংস করেছেন। সহজ ভাষায় বললে, কবি নজরুল একটি লঙ্কা। আর এ লঙ্কার রাবণ সৌমিত্র শেখর। যাকে ইচ্ছা পদোন্নতি দিচ্ছেন, আর পছন্দ না হলে অন্যত্র বদলি করছেন। ওনার পছন্দের মাপকাঠি হচ্ছে তেলবাজি ও ওনার ধর্মীয় সম্প্রদায়। উনি কট্টর সাম্প্রদায়িক লোক। 

ছাত্র সংগঠনেও উপাচার্যের প্রভাব : সরকারপন্থি ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, জাককানইবি শাখার কমিটি গঠন ও ভেঙে দেয়ার  পেছনে উপাচার্যের হাত থাকার ব্যাপারে অভিযোগ করেছেন বর্তমান ও সাবেক নেতাকর্মীরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছাত্রলীগের নেতা আমার সংবাদের এ প্রতিবেদককে বলেন, গত কোরবানির ঈদের কয়েক দিন পর আমাদের কমিটি ভেঙেছে। কমিটি ভাঙার কয়েক দিন পর কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সেক্রেটারির সঙ্গে উপাচার্য ও প্রক্টর রাজধানীর হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালে বসেন। কমিটি ভাঙার এক মাসের মাথায় উপাচার্য শেরেবাঙলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে তড়িগড়ি করে হল সুপার, কম্পিউটার অপারেটর ও বাবুর্চি নিয়োগ দিয়েছেন। এ কমিটি ভাঙার পেছনে ও এখনো পর্যন্ত নতুন করে কমিটি না হওয়ার পেছনে আমাদের ভিসি স্যারের হাত রয়েছে। তিনি কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগকে প্রভাবিত করে এ ধরনের কাজ করেন। মূলত তার উদ্দেশ্য ক্যাম্পাসের সব কাজ একক হাতে নিয়ন্ত্রণ করা। 

বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ : উপাচার্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আর্থিক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের টাকা থাকে সোনালী ব্যাংকের বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখায়। সেখান থেকে ২৫ কোটি টাকা সরিয়ে ময়মনসিংহের রূপালী ব্যাংকের শাখায় রেখেছেন তিনি। এ কারণে কোটিতে তিনি ২০ হাজার টাকা পাচ্ছেন। গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষা থেকে আয় করা অর্থের বণ্টনেও শিক্ষকদের ক্ষোভ রয়েছে। ভর্তি পরীক্ষায় তিনি একাই নিয়েছেন আট লাখ টাকা। যেখানে অন্য শিক্ষকরা পেয়েছেন ৭০ হাজার টাকা করে। গত বছরের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় ত্রিশালে ব্যবসা শিক্ষা বিভাগের কো-অর্ডিনেটর করা হয় প্রহ্লাদ চন্দ্র দাসকে। তার সিনিয়র আছেন ১৫ জন। তাদের বাদ দিয়ে তাকে কো-অডিনেটর করেছেন তিনি।

গাছের নিরাপত্তায় নির্মিত ইটের বেষ্টনীতে চুন দেয়া ও ভাঙা বেষ্টনী মেরামত বাবদ মালামাল ক্রয়ের বিলের তালিকা থেকে দেখা যায়,  ১৩ বস্তা চুন ও ১০ বস্তা সিমেন্ট ক্রয়ে খরচ হয় মোট ২৫ হাজার টাকা। ২৫ হাজার টাকার সরঞ্জামের কাজে শ্রমিকের মজুরি দেখানো হয়েছে এক লাখ ৩০ হাজার টাকা। এর আগে এই বেষ্টনী বানাতে খরচ করা হয়েছিল ছয় লক্ষাধিক টাকা। যেখানে ব্যবহার করা হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ে থাকা পুরাতন ইট। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যাক্ষ ড. আতাউর রহমান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকের শাখাসহ আরো কয়েকটি শাখায় আছে। বড় ধরনের অর্থগুলো ভিসি স্যার দেখে থাকেন। কোন কোন ব্যাংকে আছে সেটি আমার মুখস্থ নেই।

জাককানইবির ভিসি অধ্যাপক ড. সৌমিত্র শেখরকে কল দিয়ে পাওয়া যায়নি। যদিও প্রতিবেদক প্রথম পর্বে উপাচার্যের বিরুদ্ধে এত সব অভিযোগের কারণ জানতে চেয়েছেন। অভিযোগের বিষয়ে সার্বিকভাবে প্রশ্ন করা হলে তিনি কতিপয় মানুষ তার প্রতি ক্ষুব্ধ হচ্ছে জানিয়ে বলেন, তাদেরকে তিনি জোর করে কাজে নামাচ্ছেন। তারা বসে বসে থেকে উন্নতি করত। বসে থেকে প্রমোশন পেত। তাদের প্রমোশন না দেয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে বলেও জানান তিনি। এসব কারণ তাদের চিঠির মাধ্যমে জানিয়েছেন উল্লেখ করে বলেন, একটি শ্রেণি আমাদের বিব্রত করার জন্য এসব করছে। আমরা যখন শিক্ষা, গবেষণা, উন্নয়ন নিয়ে কাজ করছি, তখন একটি শ্রেণি এগুলো উসকাচ্ছে।