স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে হতাশা

চিকিৎসায় বিদেশই ভরসা

সাহিদুল ইসলাম ভূঁইয়া প্রকাশিত: মার্চ ৫, ২০২৪, ১২:০৭ এএম

বাংলাদেশ থেকে মানুষ বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া নতুন কোনো বিষয় নয়। দেশের চিকিৎসার প্রতি অনাস্থা, সময়ের সঙ্গে চিকিৎসাসেবা পর্যাপ্ত আধুনিকায়ন না হওয়া, নামমাত্র চিকিৎসায় সীমাহীন ব্যয়, ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যুর মতো ঘটনা দেশের মানুষকে চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী করছে। এক দশক আগেও কেবল সমাজের বিত্তশালীরাই উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যেতেন। কিন্তু এখন মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্তদের অনেকেই একই পথের যাত্রী হয়েছেন। চিকিৎসা বাবদ বাংলাদেশিরা বছরে দেশের বাইরে খরচ করছেন কয়েক হাজার কোটি টাকা। দেশের বাইরে চিকিৎসা নেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের পছন্দের শীর্ষে রয়েছে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের নাম। 

ইন্ডিয়ান চেম্বার অব কমার্সের হেলথ কমিটির তথ্যমতে, বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসার জন্য ভারতে যাওয়া মানুষের সংখ্যা বেড়েছে ৮৪ শতাংশ। বছরে প্রায় ২৪ লাখ মেডিকেল ট্যুরিস্ট বাংলাদেশ থেকে ভারতে যাচ্ছেন। এদের  মধ্যে বেশিরভাগ রোগীই ভারতের কয়েকটি রাজ্যে বেশি যাচ্ছেন। বড় একটি অংশ যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ,  তামিলনাড়ু, দিল্লি, মুম্বাই ও চেন্নাই। তাছাড়া ব্যাঙ্গালুরু ও হায়দ্রাবাদসহ অন্যান্য রাজ্যেও যাচ্ছেন কিছুসংখ্যক  রোগী। মেডিকেল ভিসা দেয়ার ক্ষেত্রেও দেশটি অন্যান্য ভিসার চেয়ে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। ভারতের পর বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি মানুষ চিকিৎসা নিতে যান সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, চীন, জাপান, সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যে। এসব দেশে বছরে প্রায় তিন লাখ বাংলাদেশি চিকিৎসাসেবা নিতে যাচ্ছেন। বাংলাদেশিদের বিদেশমুখী হওয়ার কারণ জানতে আমার সংবাদের এ প্রতিবেদক কথা বলেন চিকিৎসাসেবা নিতে বিদেশে যেতে ইচ্ছুক ও বিদেশ থেকে সেবা নিয়ে ফিরে আসা কয়েকজনের সঙ্গে। 

রাজধানীর ভারতীয় ভিসা সেন্টারের সামনে ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত আট বছর বয়সি ছেলেকে নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন আনিসুল আলম। গণমাধ্যমের পরিচয় দিয়ে চিকিৎসা নিতে বিদেশমুখী হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি ক্ষোভ জাড়লেন। তিনি বলেন, সুন্নতে খতনার মতো ছোট অপারেশন করাতে গিয়ে দেশে পরপর দুটি শিশুর মৃত্যু হলো। চিকিৎসাসেবা স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পেরিয়ে গেলেও কেমন উন্নতি হয়েছে— এমন ঘটনা থেকেই সেটা বোঝা যায়। 

তিনি আরও বলেন, এখানে চিকিৎসার নামে কোথাও কোথাও রোগীর জীবন নিয়ে ব্যবসা করা হয়। তার ছেলেকে গত ছয় মাস দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়েছেন। কিন্তু আশানুরূপ কোনো উন্নতি হয়নি। এদিকে ছেলের চিকিৎসা বাবদ দেশে যে অর্থ ব্যয় হয়েছে, একই অর্থ ব্যয় করে তার ছেলে ভারতে আরও ভালো চিকিৎসা পেত বলে তার ধারণা। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ছেলের চিকিৎসা তিনি চেন্নাইয়ের একটি হাসপাতালে করাবেন। শুধুমাত্র আনিসুল আলমই নন, ভারতীয় ভিসা সেন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এমন পাঁচ  মেডিকেল ভিসা প্রত্যাশীর সঙ্গে কথা বলে দেশের চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা ও অনাস্থা থেকেই তাদের বিদেশমুখী হওয়ার কথা শোনা যায়।

ভারতে চিকিৎসা ব্যয়ের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি অর্থ ব্যয়ে বাংলাদেশিদের অনেকে চিকিৎসা নিতে যান সিঙ্গাপুর। দেশটিতে চিকিৎসা নিতে যাওয়া বেশিরভাগই উচ্চবিত্ত শ্রেণির মানুষ। তেমনই একজন দেশের একটি বেসরকারি কোম্পানির পরিচালক ৪৫ বয়স বয়সি ইলিয়াস আহমেদ চৌধুরী। তিনি আমার সংবাদের এ প্রতিবেদককে জানান, উন্নত দেশটিতে তার চিকিৎসার অভিজ্ঞতা রয়েছে বেশ। 

তিনি বলেন, ২০২২ সালের দিকে এক সড়ক দুর্ঘটনায় তার ডান হাতের হাড় ভেঙে যায়। তিনি স্বাভাবিকভাবে কোনো কাজই করতে পারতেন না। দেশের ব্যয়বহুল সব হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। কিন্তু তিনি হাত দিয়ে স্বাভাবিক কোনো কাজই করতে পারছিলেন না। এক নিকটাত্মীয়র পরামর্শে সিঙ্গাপুরে হাড়ের উন্নত চিকিৎসা সম্পর্কে জানতে পারেন। তারপর গত দুবছরে তিনি পাঁচবার সিঙ্গাপুর গিয়ে হাতের চিকিৎসা করিয়ে এসেছেন। এখন তিনি ডান হাত দিয়ে স্বাভাবিক সব কাজই করতে পারছেন। তিনি আরও জানান, দেশে তার হাতের চিকিৎসা যেভাবে চলছিল, বিদেশে গিয়ে জানতে পারেন  দেশে চিকিৎসা এত জটিলভাবে না নিলে তিনি আরও দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠতেন। ঘটনার পর থেকে দেশের চিকিৎসার প্রতি তার আস্থা অনেকাংশে কমে গেছে।

সম্প্রতি দেশে প্রথমবারের মতো হয়ে যাওয়া প্ল্যানেটারি হেলথ একাডেমিয়া (পিএইচএ) আয়োজিত পিএইচএ গ্লোবাল সামিট-২০২৪-এর তথ্য অনুসারে, চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে বছরে ৫০০ কোটি ডলারের মতো দেশের বাইরে চলে যায়। পিএইচএ থেকে দেশের স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে কয়েকটি প্রস্তাবও করা হয়। প্রস্তাবগুলো হলো : অপচয় রোধ করা, টেকনোলজির উন্নয়ন করা, চিকিৎসকদের প্রশিক্ষিত করা, নতুন সার্ভিসলাইন শুরু করা। স্বাস্থ্যসেবার যে বিষয়গুলো দেশে হচ্ছে না, যেসব কারণে রোগীদের দেশের বাইরে যেতে হচ্ছে, সেগুলো যাতে দেশে করা যায়— সে বিষয়গুলোয় গুরুত্ব দেয়ার প্রস্তাব রাখা হয়।

রোগীদের বিদেশমুখী হওয়ার কারণ ও দেশি চিকিৎসার প্রতি অনাস্থার বিষয়ে ডাক্তারদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী আমার সংবাদের এ প্রতিবেদককে বলেন, দেশের মানুষ চিকিৎসা নিতে বিদেশ যাচ্ছে— এমন সংখ্যাটা কম নয়। এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। পৃথিবীর সব দেশেই তার পার্শ্ববর্তী দেশে চিকিৎসা করানোর জন্য রোগীরা গিয়ে থাকেন। আমাদের দেশে জনসংখ্যার অনুপাতে চিকিৎসকের সংখ্যার বিষয়টিও বিবেচনা করতে হবে। মানুষ বিদেশমুখী হচ্ছে চিকিৎসার জন্য, এ দায় শুধু চিকিৎসকদের নয়। দেশের চিকিৎসা অবকাঠামো থেকে শুরু করে সবকিছুর ঘাটতি রয়েছে। ভুল চিকিৎসার বিষয়ে তিনি বলেন, পৃথিবীর সব দেশেই ভুল চিকিৎসার অভিযোগ রয়েছে। এগুলো তদন্ত হওয়ার পর বলা যায় চিকিৎসা পদ্ধতি ভুল ছিল কি-না। আমাদের দেশে রোগী বা রোগীর স্বজনের কথাতেই ভুল চিকিৎসা বলে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে প্রচার শুরু হয়। এসব অভিযোগ তদন্তের জন্য প্রয়োজন চিকিৎসা সম্পর্কিত নির্দিষ্ট কাঠামো। তাহলেই কেবল বলা যাবে ভুল চিকিৎসা হয়েছে কি-না। এতে রোগীদের আস্থার সংকট কেটে যাবে।

চিকিৎসাসেবা নিতে বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা  আমাদের অর্থনীতির ওপর প্রভাব নিয়ে আমার সংবাদের এ প্রতিবেদক কথা বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদের সঙ্গে। তিনি বলেন, দেশের মানুষ চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী হওয়ার অন্যতম কারণ দেশের চিকিৎসাসেবা চাহিদা অনুসারে উন্নত হয়নি। স্বাস্থ্যসেবা গতানুগতিক ধারায় চলছে। দেশের বাইরে কেন মানুষ চিকিৎসা নিতে যাচ্ছে, এ বিষয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কোনো পদক্ষেপ নেই। স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে কোনো পদক্ষেপ না নিতে পারলে মানুষ চিকিৎসা নিতে বাইরে যেতেই থাকবে। এর ফলে  দেশের অর্থ বাইরে খরচ হচ্ছে আর দেশের অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। তাছাড়া আমাদের এখানে একটা শ্রেণি যখন বিদেশে চিকিৎসা নিতে যায়, তারা এমন ঘটা করে যায় যে, এতে অন্যরাও বিদেশে চিকিৎসা নিতে উৎসাহ পায়।