চরম ক্ষুব্ধ ক্রেতারা

ফলবাজারে সিন্ডিকেটের থাবা

জাহাঙ্গীর আলম আনসারী প্রকাশিত: মার্চ ১২, ২০২৪, ১২:৩৪ এএম
  • কেজিতে ৫০০ টাকা বেড়েছে ইসবগুলের ভুসি 
  • একই মানের খেজুর স্থানভেদে বিক্রি হচ্ছে ভিন্নদামে

ভোক্তা অধিকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে
—ক্যাব সভাপতি

আজ মঙ্গলবার থেকে শুরু হয়েছে রহমত, বরকত ও নাজাতের মাস পবিত্র রমজান। রোজাদার মুসলমানরা আজ প্রথম ইফতার করবেন। আর ইফতারের অন্যতম অনুষঙ্গগুলো হলো খেজুর, শরবত, আপেল, কমলা, আঙ্গুর, মাল্টা ও কলা। কিন্তু ইফতারে এসব ফল খাওয়া এবার কতজনের ভাগ্যে জুটবে? রোজার আগের দিন সোমবারও ফলের বাজারে ছিল আগুন! চড়া দামের কারণে অনেকেই চাহিদামতো ফল কিনতে পারেননি। মুসলমানরা সাধারণত খেজুর আর শরবত দিয়েই ইফতার শুরু করেন। কিন্তু এই খেজুর এ বছর কতজনের প্লেটে উঠবে, কতজন তাদের শরবতে ইসবগুলের ভুসি মেশাতে পারবেন? কারণ, রোজার আগের দিন খেজুরের দোকানেও আগুন জ্বলছিল। ইসবগুলের ভুসির দাম বেড়েছে কেজিতে ৫০০ টাকা। আর একই মানের খেজুর একেক দোকানে একেক দামে বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতারা সবকিছুর দামই ইচ্ছেমতো হাঁকাচ্ছেন। সবকিছুই ক্রেতাদের নাগালের বাইরে। খেজুরসহ অন্যান্য ফলের দাম শুনে ক্রেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। 

কেউ কেউ বলছেন, পুরো দেশই এখন সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। আমরা খুবই অসহায়। এবার ইফতারে আর ফল খাওয়া লাগবে না। গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে।
এ বিষয়ে কথা বললে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান দৈনিক আমার সংবাদকে বলেন, বাজারের এসব বিষয় দেখার দায়িত্ব ভোক্তা অধিকারের। যাদের বেশি টাকা আছে, তারা কিনতে পারছে আর যাদের টাকা কম, তারা কিনতে পারছে না। বাড়তি দামের কারণেই এটা হয়েছে। এগুলো নিয়ন্ত্রণে ভোক্তা অধিকারকে শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, রাজধানীর পুরানা পল্টনে আম্বার খেজুর বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ২০০০ টাকা দরে। আবার একই মানের খেজুর বায়তুল মোকাররমের সামনে বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ১৬০০ টাকা দরে। দামের ব্যবধানের বিষয়ে বিক্রেতাদের জিজ্ঞেস করলে তারা কোনো জবাব দেননি।

দেখা গেছে, পল্টন ও বায়তুল মোকাররমে ভালো মানের মরিয়ম খেজুর বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ১০০০ টাকা দরে। কিন্তু একই ধরনের মরিয়ম খেজুর মতিঝিলে বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ১৩০০ টাকা দরে। পল্টন থেকে মতিঝিলে প্রতি কেজির দাম ৩০০ টাকা বেশি হওয়ার কারণ জানতে চাইলে বিক্রেতা দৈনিক আমার সংবাদকে বলেন, ভালো জিনিস খেতে হলে দাম একটু বেশিই দিতে হবে। বেশি দামে কিনে কম দামে বিক্রি করব কীভাবে?

অপরদিকে, পল্টনে কালনী খেজুর বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ১১০০ টাকা দরে। আর একই মানের খেজুর বায়তুল মোকাররমের সামনে বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ১২০০ টাকা দরে। এছাড়া পল্টল, বায়তুল মোকাররম, বাড্ডা ও মতিঝিলে মাঝারি মানের কামরাঙ্গা মরিয়ম খেজুর কেজিপ্রতি ৫০০ টাকা, কাঁচা মরিয়ম কেজিপ্রতি ৮৫০, তিউনেশিয়ান খেজুর প্রতি কেজি ৬০০, আজোয়া (ছোট) খেজুর প্রতি কেজি ১২০০, মদিনার সুগাই খেজুর ১২০০ ও মেগজল আম্বার খেজুর প্রতি কেজি ১৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

খেজুরের বাড়তি দামের বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পল্টনের এক বিক্রেতা দৈনিক আমার সংবাদকে বলেন, বেশি দামে বিক্রি করা ছাড়া আমাদের কোনো উপায় নেই। আমাদের বেশি দামেই কিনতে হয়। খেজুরের সরবরাহ কম কি না— এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আড়তে যে পরিমাণ খেজুর আছে, মানুষ খেয়ে শেষ করতে পারবে না। সিন্ডিকেটচক্র ইচ্ছে করে বেশি দামে বিক্রি করছে। তারা কম দামে পণ্য না ছাড়লে তো আমাদের কিছুই করার নেই।

ঢাকার জুরাইন থেকে বায়তুল মোকাররমে খেজুর কিনতে এসেছিলেন মুজিবুর রহমান নামে এক ব্যক্তি। তিনি দৈনিক বলেন, গত বছরের চেয়ে এবার খেজুরের দাম অর্ধেক বেশি। গত বছর যে খেজুর প্রতি কেজি ৪০০ টাকায় কিনেছিলাম, সেটা এবার কিনতে হচ্ছে ৮০০ টাকা করে। আর আজকে তো ব্যবসায়ীরা চাঁদ রাতের মতো বেচাকেনা করছে। তারা খুশিমতো দাম নিচ্ছে। শুধু খেজুর নয়, সব ফলের দামই বেড়েছে। ঢাকা বিশ্বাবিদ্যালয় এলাকা থেকে খেজুর কিনতে এসেছিলেন শফিকুল ইসলাম। খেজুর ও ফলের দামের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, খেজুর ও অন্যান্য ফলের দাম শুনে অবাক হয়েছি। বর্তমান সরকার গঠনের পর তারা বলেছিল এবার রমজানে কোনো জিনিসের দাম বাড়বে না। অথচ খেজুরসহ অন্যান্য ফলের গায়ে যেন আগুন জ্বলছে। ৬০০ টাকা দামের খেজুর ১০০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। 

এদিকে খেজুরের মতো একই দৃশ্য বিরাজ করছে অন্যান্য ফলবাজারেও। ক্রাউন আপেল প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা। আর ফুজি প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ২৯০ থেকে ৩০০ টাকা। মিসরের মাল্টা প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ২৬০ থেকে ২৭০ টাকা। সাদা আঙুর ও কালো আঙুর প্রকারভেদে বিক্রি হচ্ছে ২৮০ থেকে ৩৫০ টাকা দরে। আর এক সপ্তাহের ব্যবধানে আনার ও আঙুর কেজিতে ১০-২০ টাকা বেড়েছে। মাঝারি আকারের আনারের কেজি ৩২০ থেকে ৩৪০, কালো আঙুরের কেজি ৩০০ থেকে ৩২০ এবং সাদা আঙুরের কেজি ২১০ থেকে ২২০ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। চায়না কমলা প্রকারভেদে বিক্রি হচ্ছে ২৮০ থেকে ৩০০ টাকা। সবুজ কমলা বিক্রি হচ্ছে ২৩০ থেকে ২৫০ টাকায়।

এছাড়া দেশি ফল পাকা কলার ডজন আট-দশ দিন আগেও কেনা গেছে ৫০ থেকে ৫৫ টাকায়; এখন ডজনে গুনতে হচ্ছে ৮০ থেকে ১২০ টাকা। চাপাকলা ডজনে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ টাকায়। সবরি কলা ডজনে ১০ থেকে ১৫ টাকার মতো বেড়ে ১১০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আর রোজার অন্যতম আরেকটি অনুষঙ্গ হলো শরবত। কিন্তু রোজার আগে এই শরবত তৈরির বিভিন্ন উপকরণের দামও বেড়ে গেছে। বিশেষ করে ইসবগুলের ভুসির দাম কেজিতে ৫০০ টাকা বেড়েছে।

দোকান ঘুরে দেখা গেছে, প্রতি কেজি ইসবগুলের ভুসি বিক্রি হচ্ছে ২০০০ থেকে ২১০০ টাকায়, যা তিন মাস আগে ছিল ১৫০০ থেকে ১৬০০ টাকার মধ্যে। এ ছাড়া প্রতি কেজি ট্যাং বিক্রি হচ্ছে ৮৫০ টাকায়, যা কিছুদিন আগেও ছিল ৮০০ টাকা। ছোট সাইজের  রুহ আফজা ৩০০ মিলিলিটারের দাম আগে ছিল ২১০ টাকা; এখন ২৮০ টাকা করা হয়েছে। বড় সাইজের রুহ আফজা আগে ছিল ৩৫০ টাকা। এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকায়। এছাড়া ইসপি, অরেঞ্জ, ম্যাংগো ফ্লেভারের বিভিন্ন শরবত পাউডারের দামও আগের চেয়ে বেড়েছে।