বিএসএমএমইউর নার্স লাইজুর আত্মহত্যার নেপথ্যে লিফটম্যান ও তার স্ত্রী এবং স্বামী!
২০২১ সালের জানুয়ারি মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালের একটি ভবনের বাথরুমে গলায় ওড়না পেচিয়ে আত্মহত্যা করেন লাইজু আক্তার। পরে তদন্তে বের হয়, এর পেছনে অন্যান্য আসামিদের সঙ্গে তার স্বামীরও প্ররোচনা রয়েছে। লাইজুকে উত্ত্যক্ত করত বখাটে তানভীর, আর সেই তানভীরের সঙ্গে স্ত্রী লাইজুর সম্পর্ক থাকতে পারে এমন সন্দেহ করতেন স্বামী সুজন পারভেজ। যে কারণে লাইজু মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে মনের কষ্টে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেন।
প্রথমে আত্মহত্যায় মৃতের স্বামী সুজন পারভেজই বাদী হয়ে লিখিত অভিযোগ দেন শাহবাগ থানায়।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, তার স্ত্রীকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত (নার্স) থাকা অবস্থায় সেখানকার লিফটম্যান তানভীর ওরফে খালেক বিভিন্ন সময়ে উত্ত্যক্ত করত। এর জন্যই সে রাগে আত্মহত্যা করে। কিন্তু তদন্ত পরবর্তীতে দেখা যায়, সুইসাইড নোটে উল্লেখ রয়েছে ‘আমি কোনো অপরাধ করিনি, লতা (তানভীরের স্ত্রী) আর সুজন (স্বামী) মিলে আমার জীবনটাকে শেষ করে ফেলেছে। যেখানে মানসম্মান নাই সেখানে বেঁচে থাকা আর মরে যাওয়া সমান কথা। মানুষ যে নিজের স্বার্থের জন্য এতটা নিচে নামতে পারে আগে বুঝতে পারিনি’।
এ সুইসাইড নোট প্রকাশের পর থেকে মৃতের স্বামীও পলাতক রয়েছে। সুইসাইড নোটটি সিআইডি কর্তৃক পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এটা তারই লেখা। যদিও মামলার তদনন্তকারী কর্মকর্তা প্রথমে এ নোটের বিষয়ে তদন্তের পক্ষে কোনো কিছু উল্লেখ করেননি। পরবর্তীতে তদন্তে বের হয়ে আসে থলের বিড়াল। সুইসাইড নোট অনুযায়ী আত্মহত্যায় সুজন ও লতার প্ররোচনার তথ্য মিলেছে। এরপর থেকে মামলার অন্য দুই আসামির মতো লাইজুর স্বামীও পলাতক রয়েছে। পলাতক আসামিদের ব্যাপারে এ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা শাহবাগ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) এসএম এলিস মাহমুদ আমার সংবাদকে বলেন, আমি তিন আসামির বিরুদ্ধে তদন্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছি এবং তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসতে ওয়ারেন্ট ইস্যুর আবেদন করেছি।
মামলার তদন্তে জানা যায়, সুজন পারভেজ ও মৃত লাইজু আক্তারের বাড়ি একই থানায়। সেখান থেকে তারা সম্পর্ক করে একপর্যায়ে বিয়ে করে। পেশায় একজন নার্স আরেকজন ইঞ্জিনিয়ার। লাইজু আক্তার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে নিয়োগ পাওয়ার পর ধানমন্ডিতে স্বামীসহ একটি সাবলেট বাসায় বসবাস করা শুরু করেন। এরপর করোনাকালীন সময়ে বাসার দূরত্বের কারণে বাসায় যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলে স্বামী সন্তানকে গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইল পাঠিয়ে দেন। এরপর কলেজের নার্সিং হোস্টেলের একটি সিট নিয়ে সেখানে থাকা শুরু করেন লাইজু। তখন তার স্বামী সুজন একদিন তার ফোনে উত্ত্যক্তকারী তানভীর ওরফে খালেকের ছবি দেখতে পান। পরে জিজ্ঞেস করলে তিনি তাকে উত্ত্যক্ত ও কুপ্রস্তাব দেয়ার কথা জানান। এটা শুনে তার স্বামী সুজন তানভীরকে উত্ত্যক্ত না করার জন্য শাসান। পরে লাইজু ১০ দিনের ছুটিতে গ্রামের বাড়ি গেলে ফোন বন্ধ করে রাখায় তানভীর বিভিন্নভাবে খোঁজ নিয়ে সেখানে যায় দেখা করতে। সেখানে লাইজু আক্তারের সাথে কথা বলা অবস্থায় সুজন দেখে ফেললে তানভীর ঘরের পেছনের দরজা দিয়ে পালাতে গেলে ধরে ফেলে সুজন। পরে তানভীরকে জিজ্ঞাসা করলে, সে পিজি হাসপাতালে অস্থায়ী লিফটম্যান হিসেবে কর্মরত আছেন বলে জানায় এবং সেখানে লাইজুকে উত্ত্যক্ত করার কথা স্বীকার করে। আর কোনো দিন এমন করবে না বলে লিখিত দেয় এবং ক্ষমা চায়।
মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে আরও জানা যায়, তানভীর মুচলেকা দেয়ার পরও মৃত লাইজুর স্বামী সুজন তার চলাফেরায় বিভিন্নভাবে সন্দেহ করতে থাকে। এর সঙ্গে তানভীরের স্ত্রী লতাও তাকে বিভিন্নভাবে দোষারোপ করতে থাকে। এর মাধ্যমেই সে ধীরে ধীরে হতাশাগ্রস্ত হয়ে সুইসাইডের সিদ্ধান্ত নেয়। এ জন্যই লাইজু তার নোটে স্বামী সুজন ও উত্ত্যক্তকারীর স্ত্রী লতার কথা উল্লেখ করে গেছেন। ভুক্তভোগীর লেখা যেকোনো নোটের বর্ণনার আলোকে তাদের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন আইনের ধারায় মামলা হয়।
উল্লেখ্য, এ মামলার মোট তিন আসামি এখনো পলাতক রয়েছে। তাদের মধ্যে মৃত লাইজু আক্তারের স্বামী সুজন ও তানভীরের স্ত্রী লতা এজাহার অনুযায়ী আসামি এবং তাকে উত্ত্যক্তকারী তানভীরকে তদন্তের পর আসামি করা হয়েছে। এছাড়াও এ মামলার মোট এগারো জন সাক্ষী রয়েছে। যাদের প্রতি সমন জারি করার জন্যও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে আবেদন করেছেন।