হাসপাতালের জনবল ও অবকাঠামোগত সংকট নিরসনে আমরা কাজ করছি
সক্ষমতার পুরোটা দিয়েই সেবা দিচ্ছি
—মো. মিজানুর রহমান, তত্ত্বাবধায়ক, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল
রাজধানীর মহাখালী এলাকায় সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল। সাততলা ভবনের হাসপাতালটির কারণে ওই এলাকাটি ‘সাততলা এলাকা’ বলে বেশ পরিচিত। হাসপাতালটি চারপাশ বস্তি দিয়ে ঘেরা। প্রধান ফটক দিয়ে হাসপাতালে প্রবেশ করতেই দেখা যায় চারপাশে ময়লা-আবর্জনা আর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। হাসপাতালের এই নোংরা পরিবেশ থেকেই হতে পারে বিভিন্ন সংক্রামক রোগ। পানি নিষ্কাশনের জন্য নেই ড্রেনেজ ব্যবস্থা। ফলে একটু বৃষ্টি হলেই হাসপাতালের সামনে পানির সঙ্গে ময়লা-আবর্জনা মিশে একাকার হয়ে যায়।
হাসপাতালটিতে যে কয়েকটি রোগের চিকিৎসা হয়, তার মধ্যে কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত রোগীরাই অন্যতম। কিন্তু খোদ হাসপাতালটির আঙিনায় ঘুরছে বেওয়ারিশ কুকুরের দল। হাসপাতালটির সাততলা ভবনের ছয়তলা পর্যন্ত চিকিৎসা কার্যক্রম চলছে। সাততলায় থাকছেন হাসপাতালের কয়েকজন স্টাফ। নিচতলা বহির্বিভাগ হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। কুকুর-বিড়ালের আক্রমণের শিকার হওয়া রোগীরা জটলা বেঁধে আছেন টিকা রুমের সামনে। হাসপাতালটিতে বিভিন্ন সংক্রামক রোগে আক্রান্ত ৩২ রোগী ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন। চিকিৎসা নিতে আসা কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে সেবা নিতে বিভিন্ন ভোগান্তির কথা।
হাসপাতালটিতে কুকুরের আক্রমণের শিকার সেবা নিতে এসেছেন মিরপুরের বাসিন্দা আসলাম মিয়া। তার সঙ্গে কথা হয় আমার সংবাদের এ প্রতিবেদকের। তিনি বলেন, এখানে একটি হাসপাতাল আছে, সেটি কুকুরের আক্রমণের শিকার হয়ে টিকা নিতে না এলে জানাই হতো না। এখানের পরিবেশ কোনোভাবেই চিকিৎসা উপযোগী নয়। দীর্ঘক্ষণ লাইনে থেকে টিকা নিতে পেরে অবশ্য স্বস্তিও লাগছে। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে আগতদের মধ্যে কুকুর, বিড়াল ও শিয়ালের কামড় খাওয়া রোগীই বেশি। হাসপাতালটির সূত্র বলছে, এখানে প্রতিদিন শুধুমাত্র বহির্বিভাগে নতুন ও পুরোনো মিলিয়ে প্রায় এক হাজার রোগী আসেন টিকা নিতে।
এছাড়া জন্ডিস, ধনুষ্টংকার, জলবসন্ত, ডিপথেরিয়া, এনফেলোকাইটিস, ভাইরাল হেপাটাইটিস, এআরভি ভ্যাকসিনের প্রতিক্রিয়া ঘটা রোগীরাও এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। এইচআইভির (এইডস) মতো মারাত্মক রোগীসহ নিউমোনিয়া, টাইফয়েড, হাম, মামস-জাতীয় রোগের চিকিৎসা দেয়া হয় এখানে। হাসপাতালটিতে কর্তব্যরত একজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এখানে রোগী অনুযায়ী কোনো কিছুই পর্যাপ্ত নয়। এখানে বেশিরভাগ রোগীই বহির্বিভাগে টিকা নিতে আসেন। ফলে বাড়তি চাপ নিতে হয় চিকিৎসকদের। রোগী কম ভর্তির কারণ হিসাবে তিনি দায়ী করেন হাসপাতালের পরিবেশকে।
প্রস্তাবিত অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী হাসপাতালে চিকিৎসকসহ কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং অন্যান্য লোকবল প্রশাসনে ৯৪ জন, প্যাথলজি ল্যাবে সাতজন, নার্সিং বিভাগে ৮৩ জন, আন্তঃবিভাগে ২৭ জন, জরুরি ও বহির্বিভাগে ১৫ জনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের লোকবল প্রয়োজন। তবে বর্তমানে এখানে রয়েছেন ৬১ জন নার্স, তিন শিশু, প্যাথলজি ও মেডিসিন কনসালট্যান্টসহ আন্তঃবিভাগে সাতজন চিকিৎসক ও বহির্বিভাগে আটজন মেডিকেল অফিসার।
হাসপাতালটির চারপাশে বস্তিকে ঘিরে চলছে মাদকের ব্যবসা। বস্তির এক বাসিন্দা বলেন, এখানে রাত হলেই হাসপাতালের ভেতরে ও বাইরে বাড়ে মাদকসেবীদের আনাগোনা। হাসপাতালটিতে কয়েকবার চুরির ঘটনাও ঘটেছে। এদিকে দেশে প্রতি বছরই বাড়ছে সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগী। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তথ্য বলছে, কুকুর, বিড়াল, বেজি, বানর ও শিয়ালের আক্রমণের শিকার হয়ে গত বছর এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৯৪ হাজার ৩৮০ জন। এর আগের বছর ২০২২ সালে এ সংখ্যা ছিল ৮৯ হাজার ৯২৮। তাদের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশই কুকুরের আক্রমণের শিকার। এরপর আছেন বিড়ালের আক্রমণের শিকার। বেজি, বানর ও শিয়ালের আক্রমণের শিকার তুলনামূলক অনেক কম।
হাসপাতালটির বর্তমান অবস্থা নিয়ে আমার সংবাদের প্রতিবেদক কথা বলেন তত্ত্বাবধায়ক চিকিৎসক মিজানুর রহমানের সঙ্গে। তিনি হাসপাতালের জনবল সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, বর্তমানে বেওয়ারিশ কুকুর-বিড়ালসহ অন্যান্য প্রাণীর আক্রমণের শিকার হওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। আমাদের সক্ষমতা অনুযায়ী সেবা দিয়ে যাচ্ছি। হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে শয্যা বাড়েনি। এর সম্প্রসারণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। হাসপাতালটির অবকাঠামোগত সমস্যা ও পরিবেশ নিয়ে সংশ্লিষ্ট বিভাগে জানানো হয়েছে।