জাবীর হুসনাইন সানীব। জন্ম কিশোরগঞ্জ জেলায় হলেও বেড়ে ওঠা রাজধানী ঢাকায়। ঢাকার এ কে উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ থেকে এসএসসি এবং ঢাকা কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে এইচএসসি সম্পন্ন করেন তিনি। এরপর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন। ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছে ছিল দেশের বাইরে চলে যাওয়া।
কিন্তু বাবা মারা যাওয়ার পর পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নেয়ার তাড়না থেকেই বিসিএস দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন সানীব? পরে ঠিক করেন পুলিশ হয়ে পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং দেশের হয়ে কাজ করবেন। বর্তমানে তিনি সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে প্রশিক্ষণরত আছেন। সম্প্রতি তিনি কথা বলেছেন আমার সংবাদের সঙ্গে, উন্মোচন করেছেন জীবনের বাঁকে বাঁকে ঘটে যাওয়া বিচিত্র অধ্যায়।
তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আমার সংবাদের নিজস্ব প্রতিবেদক রাকিবুল ইসলাম।
আমার সংবাদ : ৪০তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডার পেয়ে অনুভূতি কেমন?
জাবীর হুসনাইন সানীব : রেজাল্ট প্রকাশের সময় আমি এনএসআই এর সহকারী পরিচালক হিসেবে বিশেষ কাজে পার্বত্য একটি জেলা থেকে ঢাকায় এসে দায়িত্বরত ছিলাম। রেজাল্ট দিয়েছে শুনে প্রথমে ভয়ে চেক করতে চাইনি। কলিগের জোরাজুরিতে রেজাল্ট চেক করে প্রথম পছন্দ পুলিশ পেয়ে বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। এত বছরের পরিশ্রম, এত স্যাক্রিফাইস, বছরের পর বছর রেজাল্টের জন্য অপেক্ষা অবশেষে বিসিএসে আমার প্রথম পছন্দ পুলিশ ক্যাডার পেয়ে মন একদিকে যেমন খুশিতে ভরে গিয়েছিল আবার আব্বুর কথা মনে করে কষ্ট পাচ্ছিলাম যে বাবা বেঁচে থাকলে ভীষণ খুশি হতেন।
আমার সংবাদ : বিসিএসের স্বপ্ন দেখেছিলেন কখন থেকে?
জাবীর হুসনাইন সানীব : বিসিএস এর স্বপ্ন শুরুতে আমার ছিল না। স্কুলের গণ্ডি পেরোনোর পর থেকেই আমার দেশের বাইরে চলে যাওয়ার ইচ্ছা ছিলো। কিন্তু বাবা মারা যাওয়ার পর জীবনে বাস্তবতার নানা রং দেখে পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নেয়ার তাড়না থেকেই মূলত বিসিএস দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া? এরপর পুলিশ ক্যাডার হওয়ার মাধ্যমে পারিবারিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পড়াশোনা করবো বলে মন থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম।
আমার সংবাদ : বিসিএসের জন্য কিভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন?
জাবীর হুসনাইন সানীব : বিসিএস পরীক্ষার পড়া সহজ হলেও সিলেবাস বিশাল। কোচিং এ যাওয়াটা আমার মোটেও লাভজনক মনে হতো না। আমার বিসিএস প্রস্তুতি ছিল একদমই সাদামাটা। আমি প্রিলি, রিটেন, ভাইবার জন্য নির্দিষ্ট একটি সিরিজের এক সেট করে বই কিনে নিয়েছিলাম। তাই বারবার পড়তাম। তবে ভুলে যাওয়ার মতো পড়াগুলো আমি নিজের মতো করে নোট করতাম, ছড়া/সূত্র বানাতাম, যেন পরীক্ষার আগে স্বল্প সময়ে দ্রুত রিভাইস দিতে সহজ হয়।
আমার সংবাদ : সফলতার পিছনে কারো অনুপ্রেরণা ছিল?
জাবীর হুসনাইন সানীব : আমার মায়ের দোয়া ছাড়া আমার পক্ষে সত্যি এখানে আসা সম্ভব ছিল না। এখনো পুলিশ একাডেমিতে ট্রেনিংয়ের সামান্য মাসিক পরীক্ষার সময়ও মা বরাবরের মতো জায়নামাজে বসে থেকে দোয়া করতে থাকেন। আমার স্ত্রী সার্বক্ষণিক চেষ্টা করতেন যেন আমার পড়াশোনায় কোন ব্যাঘাত না ঘটে এবং বিসিএস এর লম্বা পথে আমি হতাশ হয়ে গেলে আমাকে সবসময় উৎসাহ দিতেন। আমার পরিবারের প্রতিটি সদস্যই আমার বিসিএস যাত্রার অনুপ্রেরণা।
আমার সংবাদ : নতুনরা বিসিএসের জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নিবে?
জাবীর হুসনাইন সানীব : কোনো বই পড়ার সময় প্রথমে গুরুত্বপূর্ণ ও ভুলে যাওয়ার মতো অংশ দাগ দিয়ে পরবর্তীতে প্রতিবার রিভাইস দেয়ার সময় মার্কার দিয়ে দাগিয়ে বইয়ের কঠিন অংশগুলো পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনলে পরীক্ষার সময় রিভাইস দিতে খুব অল্প সময় লাগবে। বিভিন্ন অনলাইন বিসিএসের বিভিন্ন স্ট্যাডি গ্রুপের নির্দিষ্ট ২ থেকে ৩ টি পেজের আপডেট দেওয়া পড়ার বিষয়গুলো নিয়মিত দেখা উচিত। নতুনদের অনেকেই ভাবেন প্রথম বিসিএসটা দেখবেন, পরেরটা ভালোভাবে দেবেন। কেউ কেউ অন্য চাকরি করার সঙ্গে বয়স ৩০ হওয়া পর্যন্ত বিসিএস দেবেন এমন চিন্তাও করেন। দয়া করে শুরুতেই এমন চিন্তাভাবনা পরিহার করুন।
আমার সংবাদ : পুলিশ ক্যাডারে নিজেকে কোথায় দেখতে চান?
জাবীর হুসনাইন সানীব : পুলিশ সার্ভিসে আমার দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকায় সাধারণ মানুষের মন থেকে থানাভীতি হ্রাস করে অপরাধীদের মনে থানাভীতি বৃদ্ধি করাই আমার প্রধান লক্ষ্য থাকবে। পুলিশ ও থানা নিয়ে জনমনে এখনো যে অস্বস্তি কাজ করে তা দূর করে আমার নিজস্ব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রফেশনাল পুলিশ সেবা প্রদানে প্রত্যয়ী থাকবো ও আমার অধীনস্ত পুলিশ সদস্যদের প্রত্যয়ী রাখবো।
আমার সংবাদ : সর্বশেষ প্রশ্ন আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
জাবীর হুসনাইন সানীব : আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা একটাই, মানুষের নিকট হতে দোয়া ও সম্মান অর্জন করা। মানুষ খুব বিপদে না পড়লে সাধারণত ডাক্তার ও পুলিশের কাছে যায় না। মানুষের বিপদগ্রস্ত অবস্থায় তাদের সহায়তা করতে পারলে অন্যরকম আত্মতুষ্টি পাওয়া যায়। নিয়মনীতির বেড়াজাল দেখিয়ে সাহায্য প্রত্যাশিত মানুষকে অযথা হয়রানি করবো না এবং কাউকে করতে দিবোও না।