কার্যকর ভূমিকায় নেই আইডিআরএ

ধ্বংসের পথে বিমা খাত

মো. ইমরান খান প্রকাশিত: জুন ১২, ২০২৪, ১২:৩৪ এএম
  • খোদ চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধেই আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ
  • বিমা কোম্পানিগুলোতে অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা দেখেও দেখছে না সংস্থাটি
  • পরিবারতন্ত্রে পরিচালিত হচ্ছে একাধিক বিমা কোম্পানি  
  • খোয়া যাওয়া অর্থ উদ্ধারেও নেই আইডিআরএর কোনো তৎপরতা

বিমা খাতকে প্রতিষ্ঠিত করতে এবং জনগণের আস্থা ফেরাতে আরও ফলপ্রসূ চিন্তাভাবনা করছে আইডিআরএ
—জাহাঙ্গির আলম, মুখপাত্র  বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)

যথাসময়ে বিমা দাবি পরিশোধ না করলে বিমা খাতকে বাঁচানো সম্ভব নয়। বিমা খাত অনেক সমস্যায় জর্জরিত দু-একদিনে এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। এজন্য সময়ের প্রয়োজন

—ড. হাসিনা শেখ, চেয়ারম্যান, ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগ, ঢাবি

বিমা কোম্পানির উন্নয়ন, কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ এবং সার্বিক দেখভালের জন্যই গঠিত হয় বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। অথচ  আইডিআরএ বিমা খাতকে রক্ষায় কার্যকর তেমন কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না। ফলে দিন যত যাচ্ছে, ক্রমেই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছাচ্ছে বিমা খাত। সংস্থাটির প্রশ্নবিদ্ধ ভূমিকায় চরম আস্থাহীনতায় ভুগছে দেশের আর্থিক এই খাত-সংশ্লিষ্টরা। বেশকিছু অকার্যকর পদক্ষেপে প্রশ্নবানে জর্জরিত আইডিআরএর সার্বিক কার্যক্রম। খোদ সংস্থাটির চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধেই রয়েছে আর্থিক অনিয়মের বিস্তর অভিযোগ। অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন কোম্পানির অনিয়ম ঢেকে রাখা এবং মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে অযোগ্য লোককে কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী হিসেবে নিয়োগের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। 

সংস্থাটির চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অর্থ মন্ত্রণালয়ে এসব অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীদেও কেউ কেউ। আইডিআরএর চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ইতোমধ্যে নির্দেশও দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। খবর নিয়ে জানা গেছে, গ্রাহকস্বার্থ রক্ষায় সর্বদাই নীরব সংস্থাটি। রক্ষকের ভূমিকায় থাকার জন্য প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি ক্রমেই রূপ নিচ্ছে ভক্ষকের। গ্রাহকের টাকা নিয়ে ছিনিমিনি খেলা বিভিন্ন বিমা কোম্পানির বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না সংস্থাটি। তথ্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বিমা গ্রাহকদের বেশিরভাগই প্রান্তিক পর্যায়ের। হাড়ভাঙা পরিশ্রমে উপার্জিত অর্থ নিরাপত্তার আশায় জমা করেছেন বিমায়। কেউ আবার রান্নার চাল জমিয়ে, শখের গরু বিক্রি করে, কেউবা হাঁস-মুরগি বিক্রি করে তিলে তিলে জমানো টাকা দিয়ে বিমা পলিসি করেছেন। এসব করেছেন আর্থিক নিরাপত্তার আশায়। কারো কারো স্বপ্ন বিমায় জমানো অর্থ দিয়ে দেবেন মেয়ের বিয়ে। আবার বেশিরভাগ মানুষই বিমা করেছেন সন্তানের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে। অথচ বিমা কোম্পানিগুলোর লাগামহীন দুর্নীতি আর স্বেচ্ছাচারিতার কারণে এখন সেই আশায় যেন গুড়েবালি। পলিসি পরিপক্ব হয়ে বছরের পর বছর পার হলেও দ্বারে দ্বারে ঘুরে বিমার টাকা পাচ্ছেন না গ্রাহক। সংশ্লিষ্ট কোম্পানির কাছ থেকে আস্থা হারিয়ে অনেকে দরখাস্ত করেছেন আইডিআরএতে; কিন্তু তাতেও মিলছে না সুরাহা।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার স্বেচ্ছাচারিতায় বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের এ খাতটি পরিণত হচ্ছে সাধারণ মানুষের অনাস্থায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও বিমায় চাকরি করেছেন। এক সমাবেশে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আমি বিমা পরিবারের লোক। বিমাকে ভালোবেসে প্রধানমন্ত্রী পয়লা মার্চকে জাতীয় বিমা দিবস হিসেবেও ঘোষণা করেন। 

জানা গেছে, প্রায় দুই ডজনেরও বেশি কোম্পানি পরিশোধ করছে না গ্রাহকদের বিমা দাবি। এক ডজনেরও বেশি কোমপানি ভুগছে তারল্য সংকটে। এসব কোম্পানির খোয়া যাওয়া অর্থ উদ্ধারেও নেই আইডিআরএর কোনো তৎপরতা। শুধু তদন্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ সংস্থাটির কার্যক্রম। সবচেয়ে দুরবস্থায় যেসব কোম্পানি রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, সানফ্লাওয়ার, বায়রা লাইফ ইন্স্যুরেন্স, পদ্মা এবং গোল্ডেন লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি। 

বিমা আইন-২০১০ অনুসারে পলিসির মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানের কাছে সব কাগজপত্র জমা দেয়ার ৯০ দিনের মধ্যে বিমা দাবি নিষ্পত্তি করতে হবে। কিন্তু বিমা আইনকে তোয়াক্কা করছে না কোনো কোম্পানিই। মেয়াদ শেষ হওয়ার দু-তিন বছর পরও বিমা দাবি পরিশোধ করছে না অধিকাংশ কোম্পানি। শুধু ফারইস্ট থেকেই এক হাজার ২৭০ কোটি টাকা পাবেন গ্রাহক। অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো আইডিআরএর প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ও বায়রা লাইফ ছাড়া গ্রাহকদের মোট দাবির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১১ হাজার ৬২৯ কোটি ৭০ লাখ এক হাজার পাঁচ টাকা। এর মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি বিমা কোম্পানি বিদায়ী বছরে ছয় হাজার ৭৫৭ কোটি ৬১ লাখ ৯৭ হাজার ১৬৬ টাকার বিমা দাবি ও ম্যাচিউরিটির অর্থ গ্রাহকদের পরিশোধ করেছে। কিন্তু এ সময়ে চার হাজার ৮৭২ কোটি ৮ লাখ ৩ হাজার ৮৩৯ টাকা পরিশোধ করেনি ৮০টি কোম্পানি। পরিশোধ না হওয়া অর্থের মধ্যে এক শতাংশ অর্থ হচ্ছে মৃত্যু বিমা দাবি আর ৯৯ শতাংশই মেয়াদপূর্তির।

কুমিল্লার ভুক্তভোগী জামাল হোসেন জানান, ছয় বছর আগে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে পাঁচ বছর মেয়াদি বিমা পলিসি করেন তিনি। এরপর প্রায় দেড় বছর আগে তার পলিসি পরিপক্ব হয়। এখন আমানতের তিন লাখ ২০ হাজার টাকা ফেরত পেতে নিয়মিত কোম্পানির স্থানীয় অফিসে যান। কিন্তু কর্তৃপক্ষ টাকা ফেরত দিচ্ছে না। টাকা দেয়ার কথা বলে বারবার তারিখ দেয়া হয় জামাল হোসেনকে। নির্ধারিত তারিখে গিয়েও পান না টাকা। আবার দেয়া হয় নতুন তারিখ। চতুর্থবারও টাকা না পেয়ে তিনি অভিযোগ জানাতে সরাসরি চলে যান আইডিআরএ। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষে অভিযোগ করে ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও কোনো সুফল মেলেনি। আজাদ হোসাইন নামে ফারইস্টের আরেক বিমা দাবিদার জানান, প্রায় ১৫ বছর আগে ১০ বছর মেয়াদি বিমা করেন তিনি। প্রায় চার বছর আগে তার পলিসির মেয়াদ পূর্ণ হলেও বারবার সংশ্লিষ্ট শাখায় যোগাযোগ করেও টাকা পাচ্ছেন না তিনি। এই দুরবস্থার মধ্যেও গাড়ি এবং মোবাইল বিলসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আপেল মাহমুদ বেতন নিচ্ছেন ছয় লাখ টাকা, যা মহামান্য রাষ্ট্রপতির বেতনের চেয়ে পাঁচগুণ বেশি। গ্রাহকের শতকোটি টাকার বিমা দাবি পরিশোধ না করে অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীকে উচ্চহারে সুবিধা দিচ্ছে কোম্পানিটি। অন্য কোম্পানিগুলোও বিমা দাবি পরিশোধ না করে কর্মকর্তাদের নিজস্ব সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

এদিকে নয়-ছয় করা অনেক কোম্পানির প্রতি আস্থা হারিয়ে অনেক গ্রাহক এখন দ্বারস্থ হচ্ছেন গণমাধ্যমের। 
অপরদিকে নানা দেনদরবারের পর কিছু কোম্পানি মেয়াদপূর্তির টাকা দেয় গ্রাহকদের। কিন্তু শর্ত জুড়ে দেয়, নতুন করে কোম্পানিতে পলিসি করতে হবে। এ পলিসির নামে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ আবারও কেটে নিজেদের কাছে রেখে দেয় কোম্পানিগুলো, যা বিমা আইনের সম্পূর্ণ পরিপন্থি। এদিকে অনেক ঘোরাঘুরির পর গ্রাহকরা চেক পেলেও ব্যাংকে গিয়ে দেখা যায় অ্যাকাউন্টে সমপরিমাণ টাকা নেই। অর্থাৎ চেক ডিজ-অনার হয়। এসব বিষয় জানার পরও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না আইডিআরএ। গ্রাহকের বিমা দাবি পরিশোধ করতে কোম্পানির সম্পদ বিক্রির নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও অনেক কোম্পানি সম্পদ বহাল রেখে গ্রাহকের বিমা দাবি পরিশোধ করছে না। এক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ নখ-দন্তহীন বাঘের ভূমিকায় থাকে। 

আস্থা হারাচ্ছে সাধারণ মানুষ : বিমায় আস্থা হারাচ্ছে সাধারণ মানুষ। বিমার প্রধান চালিকাশক্তি গ্রাহক; তবে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাসে পরিণত হয়েছে দেশের এ আর্থিক খাতটি। নাসরিন সুলতানা নামে এক গৃহিণী আমার সংবাদকে বলেন, বিমাকে এখন আর বিশ্বাস করতে পারি না। ভালো ভালো কথা বলে টাকা নিয়ে আর দেয়ার খবর থাকে না। বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত মনির হোসেন জানান, এর আগে তিনি এক কোম্পানিতে বিমা করে প্রতারিত হয়েছেন। এজন্য তিনি বিমায় আস্থা রাখতে পারছেন না। বিমায় প্রতারিত হয়ে আস্থা হারিয়েছেন— এমন অর্ধশতাধিক ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা হয় আমার সংবাদের। এসব গ্রাহক ও বিমা-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিমা খাত নিয়ে এমন আস্থার সংকটের জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আইডিআরএই দায়ী। ভুক্তভোগীরা বলছেন, আইডিআরএ কার্যকর কোনো ভূমিকা নিচ্ছে না; প্রকৃত অপরাধীদের ব্যাপারে কোনো অ্যাকশন না নেয়ার কারণেই সাধারণ মানুষ এ খাতটিতে আস্থা হারাচ্ছে।

আডিআরএর বিরুদ্ধেওু অভিযোগের যেন অন্ত নেই। ভুয়া অভিজ্ঞতা সনদ এবং শিক্ষা সনদে অনেকে চাকরি করছেন কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে। কাগজপত্র যাচাই-বাছাই শেষে এসব জানা সত্ত্বেও অনুমোদন দুেয় আইডিআরএ। বিমা আইন অনুযায়ী যেখানে এক পরিবার থেকে দুজনের বেশি বিমা কোম্পানির পরিচালক হিসেবে থাকতে পারেন না, সেখানে অর্ধডজনেরও বেশি কোম্পানিতে চলছে পরিবারতন্ত্র। এসব জেনেও অদৃশ্য কারবারে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না আইডিআরএ।

এসব বিষয়ে জানতে আইডিআরএর চেয়ারম্যান জয়নুল বারীকে মুঠোফোনে বারবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। আইডিআরএর মুখপাত্র জাহাঙ্গির আলম আমার সংবাদকে বলেন, বিমা দাবি পরিশোধের ব্যাপারে নিয়ন্ত্রক সংস্থা তার রেগুলেটরি ভূমিকা রাখতে পারে; কিন্তু কারো টাকার চেক তৈরি করে দেয়ার ভূমিকা রাখতে পারে না। যে অভিযোগগুলো আইডিআরএতে আসে, সেগুলো আমরা দুদিন আগেই প্রসেস করে কোম্পানিতে পাঠিয়ে দিই। অনেক কোম্পানিই আর্থিক সংকটে আছে, এর মধ্যে লাইফ ইন্স্যুরেন্সই বেশি। আইডিআরএ প্রতিনিয়ত কোম্পানিগুলোকে বিভিন্ন চাপ প্রয়োগ করছে। তিনি এও বলেন, গত দুবছরে আইডিআরএ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। বিমা খাতকে প্রতিষ্ঠিত করতে এবং জনগণের আস্থা ফেরাতে আরও ফলপ্রসূ চিন্তাভাবনা করছে সংস্থাটি। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ইন্স্যুরেন্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের চেয়ারম্যান ড. হাসিনা শেখ আমার সংবাদকে বলেন, যথাসময়ে বিমা দাবি পরিশোধ না করলে বিমা খাতকে বাঁচানো সম্ভব নয়। বিমা খাত অনেক সমস্যায় জর্জরিত; দু’একদিনে এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।