রপ্তানিতে বৈচিত্র্যের সংকট

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: আগস্ট ২৩, ২০২৫, ১২:০৬ এএম
  • ৫ দশকেও রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আসেনি
  • মোট আয়ের ৮২% তৈরি পোশাকনির্ভর
  • চামড়া, কৃষি ও পাট মিলেও শত কোটি ডলারের বেশি আয় নেই
  • ২০৩০ সালের মধ্যে চামড়ায় ১২ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য
  • অর্থনীতিবিদদের মতে পরিকল্পনা ছাড়া রপ্তানির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
  • ৭০% আয় আসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে

দেশের রপ্তানি আয়ের মূল ভরসা এখনো তৈরি পোশাক খাত। স্বাধীনতার পর থেকে গত পাঁচ দশক কেটে গেলেও রপ্তানিতে আসেনি কাঙ্ক্ষিত বৈচিত্র্য। 

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বারবার নীতি ঘোষণা হলেও সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা ও তার কার্যকর বাস্তবায়নের অভাবেই আজও পোশাককেন্দ্রিক রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশ।

 রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, গত অর্থবছরে বাংলাদেশ ৪ হাজার ৮২৮ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে মাত্র পোশাক খাত থেকেই এসেছে ৩ হাজার ৯৩৫ কোটি ডলার- যা মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮২ শতাংশ। 

অন্যদিকে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যে আয় হয়েছে ১১৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার, কৃষিজাত পণ্যে ৯৯ কোটি ডলার এবং পাট ও পাটজাত পণ্যে ৮৫ কোটি ডলার। অর্থাৎ পোশাক ছাড়া একমাত্র চামড়াই শত কোটি ডলারের ওপরে রপ্তানি আয় করতে সক্ষম হয়েছে। 

চামড়া শিল্পে ২০২৪ সালের মধ্যে ৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও তা অর্জিত হয়নি। সরকার এখন ২০৩০ সালের মধ্যে এ খাতকে ১২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছে। 

কিন্তু ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা ছাড়া এই লক্ষ্য বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। 

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান শাহীন আহমেদ বলেন, “স্বপ্নের রপ্তানি আমরা চামড়া শিল্পে পাচ্ছি না। বন্ডেড সুবিধা সবার কাছে পৌঁছায় না, কেমিকেল আমদানিতে বৈষম্য এখনো রয়ে গেছে। শিল্পবান্ধব নীতি না পেলে টার্গেট অর্জন কঠিন। পাশাপাশি ডিজাইন ও দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।” 

রপ্তানি বৈচিত্র্য আনতে সরকার ইতোমধ্যে ৩৫টি খাতকে উচ্চ সম্ভাবনাময় হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি দেশের সক্ষমতার তুলনায় অত্যধিক উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা। 

তাদের মতে, প্রথমে সর্বোচ্চ দুই-তিনটি খাতকে বেছে নিয়ে সার্বিক উন্নয়ন পরিকল্পনা ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। 

অর্থনীতিবিদ মাসরুর রিয়াজ বলেন, “বাংলাদেশে কখনই নির্দিষ্ট খাতের জন্য পূর্ণাঙ্গ ও সামগ্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়নি। রপ্তানিতে টেকসই বৈচিত্র্য আনতে হলে নির্দিষ্ট সেক্টরকে চিহ্নিত করে সেখানে সমন্বিত উন্নয়ন দরকার।” 

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর ভাইস চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন জানান, “বিদেশে থাকা বাংলাদেশি দূতাবাসগুলোর বাণিজ্য শাখাকে কাজে লাগিয়ে নতুন বাজার তৈরির চেষ্টা চলছে। প্রতিটি দেশ থেকে আমরা তিনটি সম্ভাবনাময় পণ্য শনাক্ত করতে বলেছি। সেসব পণ্যের মূল্য, প্যাকেজিং ও বাজার পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে রপ্তানির নতুন সুযোগ তৈরি হবে।” 

তবে এখনো দেশের বার্ষিক রপ্তানি আয়ের প্রায় ৭০ শতাংশই আসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজার থেকে। শীর্ষ ২০ দেশে রপ্তানি হয় মোট আয়ের প্রায় ৯৬ শতাংশ। অর্থাৎ বাজার বৈচিত্র্যও অত্যন্ত সীমিত। 

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রপ্তানি কাঠামোতে বৈচিত্র্য না আনতে পারলে একক খাত ও নির্দিষ্ট বাজার নির্ভরতা দেশের অর্থনীতিকে বড় ঝুঁকিতে ফেলবে। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।