নতুন ছয় মাদকে তরুণ সমাজ

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: আগস্ট ৩১, ২০২৫, ০২:০৭ পিএম
  • গত ১১ বছরে প্রায় ৫০ কেজি কোকেন জব্দ হয়েছে, যার বাজারমূল্য ৭০০ কোটি টাকার বেশি
  • সম্প্র্রতি ধৃত ৮ কেজি ৬৬০ গ্রাম কোকেন ব্রাজিল থেকে নিউইয়র্ক, দোহা হয়ে ঢাকায় এসেছে 
  • কুরিয়ার সার্ভিস ও লাগেজের মাধ্যমে প্রশাসনের চোখ এড়িয়ে এসব মাদক পাচার চলছে

বর্তমানে শুধু কোকেন নয়, বিদেশ থেকে আরও ছয় ধরনের নতুন মাদক দেশে আসছে। এর মধ্যে রয়েছে— খাত, আইস পিল (এনপিএস), ক্রিস্টাল, এমডিএমএ ও অ্যামফিটামিন। এসব মাদক ভুয়া ঘোষণায় এনে পরে পাচার করা হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) সূত্রে এমনটা জানা যায়।

যদিও শাহজালাল বিমানবন্দরে মাদক শনাক্তকরণের জন্য চার বছর আগে স্ক্যানার বসানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, কিন্তু তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে কুরিয়ার সার্ভিস ও লাগেজের মাধ্যমে পাচারকারীরা প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারী চক্র দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশকে কোকেন পাচারের ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছে। 

এ চক্রের প্রধান নাইজেরিয়ান নাগরিক ডন ফ্রাংকি ওরফে জ্যাকব ফ্রাংকি, যিনি ৯ বছর ধরে বাংলাদেশে থেকে ব্যবসার আড়ালে কোকেন কারবার নিয়ন্ত্রণ করতেন। তার সহযোগিতায় বাংলাদেশি তরুণ মাদক মাফিয়া গড়ে উঠেছে। চক্রটির নিয়ন্ত্রণে বিদেশি ও দেশি মিলে অন্তত কয়েক ডজন সদস্য রয়েছে।

গত ১১ বছরে ৫০ কেজি কোকেন জব্দ হয়েছে, যার বাজারমূল্য ৭০০ কোটি টাকার বেশি। ডিএনসি জানায়, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অন্তত ১১টি চালানে কোকেন আটক করা হয়, যেখানে প্রতিবারই বিদেশি নাগরিক জড়িত ছিল। এসব চালান দক্ষিণ আমেরিকা থেকে একাধিক দেশ ঘুরে বাংলাদেশে এসেছে। গত সোমবার রাত ২টায় কাতার এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে ঢাকায় আসা গায়ানার নাগরিক এম এস ক্যারেন পেটুলা স্টাফলিকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আটক করে শুল্ক গোয়েন্দা। তার কাছ থেকে উদ্ধার হয় ৮ কেজি ৬৬০ গ্রাম কোকেন, বাজারমূল্য প্রায় ১৩০ কোটি টাকা।

ক্যারেন পেশায় একজন হেয়ারড্রেসার। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানান, তিনি ব্রাজিল থেকে কোকেন সংগ্রহ করে নিউইয়র্ক হয়ে দোহা হয়ে ঢাকায় এসেছেন। চালানটি ঢাকার একটি চক্রের কাছে পৌঁছে দেয়ার কথা ছিল। এর আগেও ২০১৮ সালে নিজ দেশে কোকেনসহ ধরা পড়েছিলেন তিনি এবং চার বছরের কারাদণ্ড হয়েছিল।

ডিএনসি সূত্র জানায়, কোকেন পাচারের প্রধান হোতা ডন ফ্রাংকি এবং তার ভাই ডন উইজলি। উইজলি এশিয়া অঞ্চলের পাচার তদারকি করেন। চক্রের সদস্যরা ধরা পড়া এড়াতে ধাপে ধাপে ভিন্ন মানুষ ব্যবহার করে; এক চালানের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি পরবর্তী চালানে থাকেন না। ফলে ধরা পড়লেও অন্যদের নাম প্রকাশ করতে পারেন না।

ডন ফ্রাংকি বাংলাদেশে নাইজেরিয়ান কমিউনিটির প্রেসিডেন্টও ছিলেন। তার সহযোগী রনি গ্রেপ্তার হলেও অন্তত ৪৫ জন সদস্য এখনো অধরা। এরা পাচারের বিনিময়ে মোটা অঙ্কের অর্থ পান। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভৌগোলিক কারণে বাংলাদেশ মাদকের ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করে ভারত, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকায় কোকেন পাচার করা হয়। দেশটি এশিয়ার তিনটি কুখ্যাত মাদক চোরাচালান অঞ্চলের মাঝামাঝি গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল, গোল্ডেন ক্রিসেন্ট ও গোল্ডেন ওয়েজে অবস্থিত হওয়ায় পাচারকারীরা এ সুযোগ নিচ্ছে।

বাংলাদেশ হয়ে আসা কোকেনের মূল গন্তব্য ইউরোপ-আমেরিকা। এসব মাদক আকাশপথে এনে পরে স্থলপথে পাচার করা হয়। 

অতীতের উল্লেখযোগ্য অভিযান, ২০১৩ সালে দেশে ১৩ কেজি কোকেন ধরা পড়ে। ২০১৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে সূর্যমুখী তেলের ড্রামে ভরা তরল কোকেন জব্দ হয়। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে শাহজালাল বিমানবন্দরে ৮ কেজি ৩০০ গ্রাম কোকেনসহ মালাউইয়ের নাগরিক আটক হন। একই বছরে মরক্কোর নারী ও পেরুর নাগরিকের কাছ থেকেও কোকেন জব্দ হয়। শ্রীলংকায় গত বছর ৫ কেজি ৩০০ গ্রাম কোকেনসহ দুই বাংলাদেশি ধরা পড়ে।