প্রশাসনে হতাশার স্রোত

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৮, ২০২৫, ০৩:০১ পিএম

পদোন্নতি-পদায়ন ঝুলে আছে

ডিসি নিয়োগে সমন্বয়হীনতা

এসএসবি বৈঠকেও সমাধান নেই

হতাশা-ক্ষোভ বাড়ছে কর্মকর্তাদের মধ্যে

নির্বাচন সামনে, মাঠ প্রশাসন অনিশ্চিত

প্রশাসনে পদোন্নতি ও পদায়ন নিয়ে দীর্ঘসূত্রতার কারণে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে কর্মকর্তাদের মধ্যে। উপসচিব থেকে যুগ্মসচিব এবং যুগ্মসচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতির আলোচনা হলেও তা কার্যকর হয়নি। একইভাবে নতুন জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগ নিয়েও অনিশ্চয়তা কাটছে না। 

জনপ্রশাসন সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব জটিলতায় প্রশাসনে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে, যা ভবিষ্যতে শাসন-ব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে। 
প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, গত ২০ মার্চ সরকার উপসচিব থেকে যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতি দেয়। 

এর আওতায় জেলা প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা ২১ জন উপসচিবও পদোন্নতি পান। তবে চার মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সরকার এখনো নতুন ডিসি নিয়োগ দিতে পারেনি। এর ফলে মাঠ প্রশাসনের একটি বড় শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে, সিনিয়র সহকারী সচিব থেকে উপসচিব এবং যুগ্মসচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতির বিষয়টি বহুদিন ধরেই আলোচনায় থাকলেও এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। সুপারিশকারী কর্তৃপক্ষ সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি) একাধিক বৈঠক করলেও কোনো পদোন্নতি কার্যকর হয়নি।
সরকারি সূত্রে জানা যায়, ডিসি নিয়োগে সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন উপদেষ্টা, জনপ্রশাসন সচিব, এসএসবি সদস্য এমনকি জনপ্রশাসন সংক্রান্ত কমিটিরও আলাদা আলাদা পছন্দের তালিকা রয়েছে। এসব তালিকা মিলিয়ে চূড়ান্ত করতে গিয়ে জটিলতা বাড়ছে।

গত বছর ডিসি নিয়োগ নিয়ে নানা অনিয়ম ও অভিযোগ ওঠায় এবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সতর্ক। তবে  দীর্ঘসূত্রতার কারণে কর্মকর্তাদের মাঝে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ডিসি নিয়োগ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, মাঠ প্রশাসনে যারা ডিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন, তারাই নির্বাচনের মূল দায়িত্বে থাকবেন। 

প্রশাসনের কাঠামোগত তথ্য বলছে, অতিরিক্ত সচিবের অনুমোদিত পদ ২১২, কিন্তু কর্মরত আছেন ৩৫৮ জন কর্মকর্তা। যুগ্মসচিবের অনুমোদিত পদ ৫০২ হলেও আছেন ১,০২৮ জন। সুপারনিউমারারি পদসহ উপসচিবের অনুমোদিত পদ ১,৪২০, আর বর্তমানে কর্মরত ১,৪০০ জন। এই ভারসাম্যহীন অবস্থায় নিয়মিত পদোন্নতি না হওয়ায় পদ-পদবি বণ্টন ও দায়িত্ব বণ্টন উভয় ক্ষেত্রেই অসঙ্গতি বাড়ছে। 

সূত্রমতে, শিগগিরই ৩০তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের সিনিয়র সহকারী সচিব থেকে উপসচিব পদে পদোন্নতি দেয়ার প্রস্তুতি রয়েছে। এরপর পর্যায়ক্রমে ২০তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত সচিব পদে উন্নীত করার প্রক্রিয়া শুরু হবে। সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সভাপতিত্বে এসএসবির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে, তবে এখনো কোনো কার্যকর ঘোষণা আসেনি। 

প্রশাসন সংশ্লিষ্টদের মতে, নিয়মিত পদোন্নতি না হলে হতাশা ও ক্ষোভ বেড়ে যায়। এতে কর্মক্ষেত্রে স্থবিরতা দেখা দেয়। অনেক কর্মকর্তা মনে করেন, পদোন্নতি ঝুলিয়ে রাখা ও পদায়নে গড়িমসি করা প্রশাসনের জন্য অশুভ সংকেত। এতে কর্মকর্তারা উদ্যম হারান এবং প্রশাসন দুর্বল হয়ে পড়ে। এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘যখন আমরা জানি পদোন্নতির সময় এসেছে, অথচ কোনো সিদ্ধান্ত আসছে না- তখন মনোবল ভেঙে যায়। কাজের প্রতি মনোযোগ কমে যায়। এতে প্রশাসনের সামগ্রিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়।’ 

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র বলছে, জাতীয় নির্বাচনের আগে নতুন ডিসি নিয়োগের সিদ্ধান্ত সরকার নেবে। কারণ নির্বাচনের মাঠ-পর্যায়ের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন কর্মকর্তাদের পাঠানো জরুরি। তবে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা সমাধান না হলে প্রশাসনে অস্থিরতা আরও বাড়বে বলে মনে করছেন অনেকেই।