বাংলাদেশ থেকে ভারতে পণ্য রপ্তানির সহজ পথ দিন দিন সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। ভারতের একের পর এক বিধিনিষেধ এখন কার্যত বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
সর্বশেষ ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বৈদেশিক বাণিজ্য মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফটি) থেকে জারি করা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে চার ধরনের পাটজাত পণ্য আর কোনো স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে প্রবেশ করতে পারবে না। এসব পণ্য এখন কেবল মুম্বাইয়ের নাভা শেভা সমুদ্রবন্দর দিয়ে রপ্তানি করতে হবে।
এর আগে গত ২৭ জুন ভারত কাঁচা পাট, সুতা, রোল এবং বিশেষ ধরনের কাপড় স্থলপথে রপ্তানি নিষিদ্ধ করে। তারও আগে ১৭ মে পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, কাঠের আসবাব, প্লাস্টিক, ফল, পানীয়সহ বেশকিছু পণ্যের ওপর একই ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। এমনকি গত ৯ এপ্রিল কলকাতা বিমানবন্দর হয়ে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানির সুবিধাও বাতিল করে ভারত। ধারাবাহিকভাবে নেয়া এই সিদ্ধান্তগুলো বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নতুন বিধিনিষেধে যে পণ্যগুলো অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে পাট বা অন্যান্য তন্তুযুক্ত বস্ত্রজাত কাপড়, পাটের দড়ি ও রশি, সুতা এবং পাটের তৈরি বস্তা ও ব্যাগ। এ ধরনের পণ্যের প্রায় ৯৯ শতাংশই এত দিন স্থলপথে রপ্তানি হতো। মাত্র এক শতাংশ যেত সমুদ্রপথে। ফলে স্থলবন্দর বন্ধ হওয়ার অর্থ দাঁড়াচ্ছে সহজ রপ্তানির পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া। বাংলাদেশ থেকে ভারতে পণ্য রপ্তানির ওপর এ ধরনের বাধা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, ভারতের এই পদক্ষেপ শুধু বাণিজ্য ঘাটতি বাড়াবে না, একই সঙ্গে রপ্তানিকারকদের বিকল্প বাজার খোঁজার চাপও তৈরি করবে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ ভারতে ১৫৭ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। যা বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ। অন্যদিকে একই সময়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে আমদানি হয়েছে প্রায় ৯০০ কোটি ডলারের পণ্য। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ হলো তুলা, সুতা, খাদ্যশস্য, খনিজ ও জ্বালানি, বিদ্যুৎ এবং মধ্যবর্তী শিল্পপণ্য। বিশেষ করে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের জন্য ভারতে উৎপাদিত সুতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বেনাপোল বন্দর দিয়েই মূলত এসব সুতা আমদানি হতো। কিন্তু সম্প্রতি ভারত থেকে স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানিও সীমিত করা হয়েছে।
গত ১৫ এপ্রিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বেনাপোল, ভোমরা, সোনামসজিদ, বাংলাবান্ধা ও বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানির সুযোগ বন্ধ করে দেয়। এতে বাংলাদেশের টেক্সটাইল খাত চাপের মুখে পড়ে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক থাকলেও সামপ্রতিক সময়ে টানাপড়েন স্পষ্ট হচ্ছে। দুই দেশের ব্যবসায়ী মহল মনে করছে, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অস্থিরতা এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। ভারতের বাজারে সহজ প্রবেশাধিকার সীমিত হওয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা বিকল্প গন্তব্য খুঁজতে বাধ্য হচ্ছেন। তবে স্বল্প সময়ে নতুন বাজার খোঁজা সহজ নয়। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে এ বিষয়ে ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের অনুরোধ জানিয়েছে। কিন্তু এখনো ভারত সাড়া দেয়নি।
গত ১২ আগস্ট বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, “আমরা ভারতের কাছে আলোচনার প্রস্তাব পাঠিয়েছি। কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া পাইনি। বিষয়টি নিয়ে আমরা কূটনৈতিক চ্যানেল ব্যবহার করছি।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের রপ্তানি নির্ভরতা বহুমুখী করতে না পারলে এই ধরনের পরিস্থিতিতে বড় ধরনের সংকটে পড়তে হবে। বিশেষ করে পাট ও পাটজাত পণ্য, যা বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী রপ্তানি খাত, সেটির ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। তারা মনে করছেন, ইউরোপ, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে পাটজাত পণ্য রপ্তানির উদ্যোগ জোরদার করা উচিত। একইসঙ্গে আঞ্চলিক বাণিজ্যে বৈচিত্র্য আনতে হবে। নইলে ভারতের মতো বড় বাজারে বারবার বাধা আসলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত ভঙ্গুর হয়ে যাবে।