একই সময়ে নতুন আতঙ্ক হিসেবে দেখা দিয়েছে চিকুনগুনিয়া
ঢাকার চারটি পরীক্ষাগারে শনাক্ত হয়েছে ৭৮৫ জন চিকুনগুনিয়া রোগী
বাংলাদেশে ডেঙ্গু এখন কেবল রাজধানীনির্ভর নয়। এটি পরিণত হয়েছে সারা দেশে মহামারি রূপে। শহরের আকাশচুম্বী ভবন থেকে শুরু করে গ্রামের টিনের চালা, কোথাও আর এডিস মশার হাত থেকে রক্ষা নেই। প্রতিদিনই সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে আক্রান্ত ও মৃত মানুষের খবর। সরকারি হিসাব বলছে, এ বছর আক্রান্তদের তিন-চতুর্থাংশই ঢাকার বাইরে, বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চল ও গ্রামীণ অঞ্চলগুলোতে।
রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন রোগীর ভিড় কয়েকগুণ বেড়ে গেলেও প্রকৃত সংকট লুকিয়ে আছে গ্রামাঞ্চলে। যেখানে পরীক্ষার সুযোগ নেই, শয্যা নেই, আর রয়েছে দীর্ঘস্থায়ী চিকিৎসকের ঘাটতি। স্বাস্থ্যখাতের এই দুরবস্থা যেন নাগরিক জীবনের ভঙ্গুর নিরাপত্তার প্রতিচ্ছবি।
চলতি বছর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
এ বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ, আর মৃত্যুর সংখ্যা শতকের ঘর পেরিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সেপ্টেম্বরের শেষে এ সংখ্যাটি আরও ভয়াবহ হতে পারে। একই সময়ে নতুন আতঙ্ক হিসেবে দেখা দিয়েছে চিকুনগুনিয়া। ঢাকার চারটি পরীক্ষাগারে শনাক্ত হয়েছে ৭৮৫ জন চিকুনগুনিয়া রোগী, চট্টগ্রামে প্রতিদিন বাড়ছে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা।
আগে ডেঙ্গুকে মূলত নগরকেন্দ্রিক মনে করা হতো। কিন্তু এ বছর প্রমাণিত হয়েছে, এ ভাইরাসের বিস্তার শুধু শহর নয়; গ্রামেও এটি মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, আক্রান্তদের প্রায় ৭৫ শতাংশই ঢাকার বাইরে। দক্ষিণাঞ্চলের অনেক গ্রামে প্রতিদিন নতুন রোগী বাড়ছে, অথচ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা। যার ফলে গ্রামের মানুষের অনেককে শেষ পর্যন্ত ঢাকায় ছুটতে হচ্ছে, এতে রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে চাপ বেড়ে যাচ্ছে বহুগুণ।
এ পরিস্থিতি হঠাৎ তৈরি হয়নি। গত এক দশকে শুধু ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনই মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যয় করেছে শতাধিক কোটি টাকা। নিয়মিত স্প্রে, পেস্টিসাইড ও সচেতনতামূলক কর্মসূচির ঘোষণা এসেছে বারবার। কিন্তু বাস্তবতা হলো, টাকা খরচ হয়েছে ঠিক, অথচ সংক্রমণ ঠেকাতে যথাযথ সফল হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ দায় শুধু প্রশাসনিক দুর্বলতা নয়, বরং সমন্বিত কৌশলের অভাবও এর জন্য সমানভাবে দায়ী।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকার ২০২৪-৩০ সময়কালের জন্য জাতীয় ডেঙ্গু প্রতিরোধ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। কাগজে-কলমে পরিকল্পনার লক্ষ্য মহৎ প্রতি হাজারে একজনের বেশি যেন আক্রান্ত না হয়, মৃত্যুহার নেমে আসুক ০.১ শতাংশে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম এখনো অপর্যাপ্ত। প্রতিটি জেলায় কন্ট্রোল রুম গঠন হলেও তা কার্যকরভাবে কাজ করছে না। প্রাথমিক চিকিৎসা ও দ্রুত শনাক্তকরণ না হওয়ায় রোগীরা শেষ পর্যন্ত গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন, ফলে মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে।
পরিবেশগত কারণও ডেঙ্গুর বিস্তারে বড় ভূমিকা রাখছে। দ্রুত নগরায়ন, খোলা নালা-নর্দমা, জমে থাকা পানি আর অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা মিলে এডিস মশার বিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া সংক্রমণকে আরও দ্রুত ছড়িয়ে দিচ্ছে।
অন্যান্য দেশে ডেঙ্গু প্রতিরোধে নেয়া পদক্ষেপ
বাংলাদেশের এই বিপর্যয়ের বিপরীতে এশিয়ারই কিছু দেশ সফলভাবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে উদাহরণ স্থাপন করেছে। সিঙ্গাপুরের উদাহরণ সবচেয়ে আলোচিত। দেশটির জাতীয় পরিবেশ সংস্থা (NEA) কয়েক বছর ধরে চালাচ্ছে “প্রজেক্ট Wolbachia।” এতে Wolbachia-সংক্রমিত পুরুষ মশা ছেড়ে দেয়া হয়, যা প্রজননের মাধ্যমে ভাইরাস বহনের ক্ষমতা হ্রাস করে। ফলাফল অত্যন্ত ইতিবাচক পরীক্ষামূলক এলাকাগুলোতে সংক্রমণ প্রায় ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।
ভিয়েতনামও একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেখিয়েছে, এটি কেবল বৈজ্ঞানিকভাবে নয়, অর্থনৈতিকভাবেও লাভজনক। দীর্ঘমেয়াদে চিকিৎসা ব্যয় ও উৎপাদনশীলতার ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। সবচেয়ে বড় সাফল্য এসেছে জনগণকে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে। স্থানীয় মানুষ নিজেরাই প্রতিরোধ কার্যক্রমের অংশ হয়েছেন, ফলে তা টেকসই রূপ পেয়েছে।
বাংলাদেশে এখন একটাই প্রশ্ন; আমরা কি এই মডেলগুলো থেকে শিক্ষা নেব? Wolbachia প্রযুক্তি পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করা যেতে পারে ঢাকার উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে। তার সঙ্গে সমন্বিত প্রচেষ্টা ও পরিবেশকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে রাখাটাও অতীব জরুরি।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এর বিপরীতে সচেতনতার অভাব ও বিশেষভাবে দায়ী। চিকিৎসকরা বলছেন, অনেকেই প্রাথমিক লক্ষণকে অবহেলা করে চিকিৎসা নিতে দেরি করেন। আবার বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখার বিষয়টিও এখনো নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়নি। অথচ ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে সহজ উপায় হলো ঘরবাড়ির চারপাশ থেকে জমে থাকা পানি সরিয়ে ফেলা।
ডেঙ্গু এখন আর মৌসুমি রোগ নয়, এটি পরিণত হয়েছে স্থায়ী জনস্বাস্থ্য সংকটে। প্রতি বছর একইচিত্র যদি পুনরাবৃত্ত হয়, তবে শুধু স্বাস্থ্যখাত নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই জরুরিভিত্তিতে সমন্বিত, কার্যকর এবং টেকসই পদক্ষেপ নেয়া ছাড়া সামনে কোনো বিকল্প নেই।