বৃষ্টিতে ডেঙ্গু ভয়াবহতার আশঙ্কা

নিজস্ব প্রতিবেদক  প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৫, ১২:০৪ এএম
  • গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন আক্রান্ত ৬৪৭, মৃত্যু ৬
  • সেপ্টেম্বরে প্রথম ১৭ দিনে আক্রান্ত ৮,৩৩৮, মৃত্যু ৩৯
  • স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১২ দফা জরুরি নির্দেশনা
  • বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ২০১৯ সালের মতো পরিস্থিতি হতে পারে
  • অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা চলবে

চলতি সেপ্টেম্বর মাসেই ডেঙ্গুর প্রকোপ ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। জুলাই ও আগস্টের তুলনায় এ মাসের প্রথম ১৭ দিনেই আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘এই রোদ, এই বৃষ্টি’ ধরনের আবহাওয়া এডিস মশার বংশবৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে অনুকূল। ফলে এ সময় রোগীর সংখ্যা যেমন বাড়ছে, মৃত্যুর সংখ্যাও ততটা বৃদ্ধি পাচ্ছে। 

গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময় ৬৪৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। 

গতকাল বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। 

এতে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়াদের মধ্যে ঢাকা সিটি করপোরেশনের ২৪১ জন এবং বাকিরা ঢাকা সিটির বাইরের। 


স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে ১০ হাজার ৬৮৪ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন এবং মৃত্যু হয় ৪১ জনের। আগস্টে ভর্তি হন ১০ হাজার ৪৯৬ জন, মৃত্যু হয় ৩৯ জনের। কিন্তু সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৭ দিনেই ভর্তি হয়েছেন ৮ হাজার ৩৩৮ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ৩৯ জনের। 


বিশেষজ্ঞদের মতে, চলতি বছরের প্রকোপ ২০২৩ সালের মতো ভয়াবহ না হলেও ২০১৯ সালের মতো পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, ‘বৃষ্টির কারণে থেমে থেমে জমা পানিতে এডিস মশার প্রজনন বেড়েছে। অক্টোবর পর্যন্ত রোগী বাড়তে থাকবে।’ 

২০১৯ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন ১ লাখ ১ হাজার ৩৭৪ জন এবং মারা যান ১৬৪ জন। চলতি বছরের সাড়ে ৯ মাসে এখন পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন ৩৯ হাজার ৮৪১ জন, মারা গেছেন ১৬১ জন। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, আক্রান্ত যদি ২০১৯ সালের মতো হয়, তবে এবার মৃত্যুর সংখ্যা দ্বিগুণ বা তিনগুণ হতে পারে। 

জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘ডেঙ্গু মোকাবেলায় ছাত্রদের অংশগ্রহণে পরিচ্ছন্নতা আন্দোলন হলে পরিস্থিতির উন্নতি হতো। কিন্তু তা হচ্ছে না। বাসাবাড়িতে টব, ড্রেন, খোলা পলিথিনে যাতে পানি জমে না থাকে, সে দিকে সবার নজর দেওয়া জরুরি।’

ডেঙ্গুর চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনায় দেশের সব সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বিশেষায়িত হাসপাতাল ও জেলা সদর হাসপাতালের জন্য ১২ দফা নির্দেশনা দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। 


এসব নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে— ভর্তি রোগীদের জরুরি ভিত্তিতে এনএসওয়ান পরীক্ষা নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের প্রাপ্যতা বজায় রাখা, রোগীদের জন্য বিশেষ ওয়ার্ড নির্ধারণ, মেডিসিন, শিশু ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে বিশেষ চিকিৎসক দল গঠন, আইসিইউ সাপোর্টে অগ্রাধিকার দেয়া, মৃত রোগীর তথ্য দ্রুত পাঠানো, হাসপাতালের চারপাশে মশক নিধন কার্যক্রম চালাতে স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করা, এছাড়া প্রতি শনিবার ডেঙ্গু সমন্বয় সভা করার নির্দেশও দেয়া হয়েছে। 

গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে মারা গেছেন পাঁচজন। এর মধ্যে চারজন নারী ও একজন পুরুষ। নারীদের বয়স যথাক্রমে ২৭, ২৮, ৫৪ ও ৫৫ বছর এবং পুরুষের বয়স ৫৪ বছর। চারজন ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

একই সময়ে নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬৬২ জন। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা প্রতিবছর বাড়ছে-কমছে। ২০২০ সালে করোনার কারণে নজর না থাকায় আক্রান্ত কম হলেও সঠিক পরিসংখ্যান অজানা। ২০২১ সালে আক্রান্ত হন ২৮,৪২৯ জন, মৃত্যু ১০৫। ২০২২ সালে আক্রান্ত ৬২,৩৮২ জন, মৃত্যু ২৮১। ২০২৩ সালে ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখা দেয়: আক্রান্ত ৩,২১,১৭৯ জন, মৃত্যু ১,৭০৫। ২০২৪ সালে আক্রান্ত হন ১,০১,২১৪ জন, মৃত্যু ৫৭৫। 

অধ্যাপক কবিরুল বাশার ও জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, চলতি বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। বিশেষ করে শহরের আনাচে-কানাচে জমে থাকা পানিই এডিস মশার মূল প্রজনন ক্ষেত্র। যথাযথ পরিচ্ছন্নতা অভিযান না হলে অক্টোবর পর্যন্ত আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকবে। 

জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, এবার আক্রান্ত সংখ্যা হয়তো ২০১৯ সালের মতো নাও হতে পারে, তবে মৃত্যুহার বাড়বে- এমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না।