বিআরটিএ’র আধুনিকায়নে ভোগান্তি কমে বাড়ছে শৃঙ্খলা

ইয়ামিনুল হাসান আলিফ প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৫, ১২:০৬ এএম
  • অনলাইনে সেবা পাওয়ায় কমেছে ভোগান্তি
  • লাইসেন্স-নিবন্ধন-মালিকানা পরিবর্তনে দূর হচ্ছে দালালদের দৌরাত্ম্য
  • সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে নিয়মিত অভিযান
  • মোবাইল অ্যাপে গাড়ির তথ্য যাচাই সহজেই, কমছে প্রতারণা

দেশের অর্থনীতির অন্যতম মূল চালিকাশক্তি সড়ক পরিবহন খাত। প্রতিদিন কোটি মানুষ ও বিপুল পরিমাণ পণ্য সড়কপথে পরিবাহিত হয়। এই বিশাল খাতকে নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়নের দায়িত্ব পালন করছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। 

এক সময় অনিয়ম, দুর্নীতি আর দালালদের দাপটে সেবাগ্রহিতাদের যেমন ভোগান্তি ছিল চরমে, তেমনি দেশের সড়ক ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খল পরিবেশ ছিল পরিবহন খাতের উন্নতিকরণের অন্তরায়। তবে প্রতিষ্ঠানটির আধুনিকায়নে এখন সে পরিবেশ আর নেই। অনলাইনে বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ায় দালালদের দৌরাত্ম্যও আর আগের মতো নেই। 

ভোগান্তি কমে এখন সড়কে বাড়ছে শৃঙ্খলা। সড়ক পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা রক্ষা, নিরাপদ যানবাহন নিশ্চিতকরণ এবং আধুনিক সেবা প্রদানের মাধ্যমে বিআরটিএ দেশের অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) দেশের সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাকে সুশৃঙ্খল, নিরাপদ ও কার্যকর করার লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। শুরু থেকেই প্রতিষ্ঠানটি যানবাহন নিবন্ধন, ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান, যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা, ভাড়ার হার নির্ধারণসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসছে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের ক্ষেত্রেও অভিযান পরিচালনা করে বিআরটিএ। 

বিআরটিএ’র অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো মোটরযান নিবন্ধন ও ফিটনেস সনদ প্রদান। দেশে নতুন যানবাহন নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পাশাপাশি পুরনো যানবাহনের জন্য নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষা করা হয়। ফিটনেস সনদ নবায়নের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয় যে সড়কে চলাচলকারী যানবাহনগুলো যান্ত্রিকভাবে নিরাপদ এবং পরিবেশবান্ধব। ফিটনেসবিহীন গাড়ি সড়কে চলাচলেও কঠোর বিআরটিএ। 

সড়কে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করার পাশাপাশি আইন অমান্যকারী ব্যক্তি ও ফিটনেসবিহীন গাড়ির মালিকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে বিআরটিএ। ফিটনেসবিহীন যানবাহন সড়ক থেকে সরিয়ে সড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমানো হচ্ছে। শিক্ষার্থী ও চালকদের জন্য সচেতনতামূলক কার্যক্রমও পরিচালনা করে যাচ্ছে বিআরটিএ। গাড়ি চালকদের লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ, সড়কে চালকদের নিরাপত্তা ও দক্ষতাকে প্রাধান্য দিয়ে যাচ্ছে বিআরটিএ। 

এছাড়া বিআরটিএ প্রশিক্ষক লাইসেন্স প্রদান করে, যা ড্রাইভিং স্কুল ও প্রশিক্ষকদের জন্য বাধ্যতামূলক। এর ফলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও দক্ষ চালক তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে এবং সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে আসে। 

যাত্রীবাহী বাস, মিনিবাসসহ বিভিন্ন যানবাহনের ভাড়া নির্ধারণের দায়িত্বও পালন করে আসছে বিআরটিএ। জ্বালানির দাম পরিবর্তন, সড়ক টোল বা অন্যান্য খরচ বাড়লে বিআরটিএ ভাড়া সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে যাত্রীদের জন্য ন্যায্য ভাড়া যেমন নিশ্চিত হয় তেমনি পরিবহন খাতে অস্থিরতা কমে আসে।

দুর্ঘটনারোধে চালকদের হেলমেট ব্যবহার, সিটবেল্ট ব্যবহার, অতিরিক্ত যাত্রী বহন না করা, গতিসীমা মেনে চলা এ ধরনের নিয়ম প্রয়োগে বিআরটিএ নিয়মিতই অভিযান ও পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। সম্প্রতি বিআরটিএ তাদের সেবা পদ্ধতিতে আধুনিকায়ন ও ডিজিটাল রূপান্তরের মাধ্যমে জনগণের কাছে আরও সহজে ও দ্রুতগতিতে সেবা পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছে। লাইসেন্স ও নিবন্ধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সময় ও ভোগান্তি উভয়ই এখন কমেছে। লাইসেন্স পরীক্ষায় স্বচ্ছতা আনতে বায়োমেট্রিক পদ্ধতি চালু করা হয়েছে, যা অনিয়ম কমাতে কার্যকর হয়েছে। 

এছাড়াও অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট এবং এসএমএস সেবা চালু হওয়ায় গ্রাহকরা এখন ঘরে বসেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে পারছেন। এখন গ্রাহকরা অনলাইনে ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদন, নবায়ন, যানবাহনের নিবন্ধন ফি পরিশোধ, ট্যাক্স টোকেন, ফিটনেস ফি ইত্যাদি দিতে পারছেন। এর ফলে দুর্নীতি কমেছে এবং সাধারণ মানুষের সময় ও খরচ দুটোই সাশ্রয় হচ্ছে।

মোবাইল অ্যাপ ও অনলাইন সার্ভিস পোর্টাল ব্যবহার করে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে মানুষ তাদের প্রয়োজনীয় সেবা গ্রহণ করতে পারছে, যা সড়ক পরিবহন খাতকে আরও স্বচ্ছ ও আধুনিক করে তুলেছে। আগে চোরাই যানবাহন বিশেষ করে মোটরসাইকেল ক্রয় বিক্রয় ছিল ওপেন সিক্রেট। তথ্যের অভাবে প্রতারিত হতে হতো অনেককে। তবে মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে এখন খুব সহজেই গাড়ির মালিকানার তথ্য বের করা সম্ভব। ফলে যে কেউ চাইলেই তথ্য গোপন রেখে প্রতারণা করার সুযোগ পাচ্ছে না।

সার্বিকভাবে বিআরটিএ’র বর্তমান কার্যক্রম দেশে একটি নিরাপদ, শৃঙ্খলিত এবং আধুনিক সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। ভবিষ্যতে এই ধারা অব্যাহত থাকলে দেশের সড়ক পরিবহন খাতে আরও উন্নয়ন সম্ভব হবে বলে আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা। 

সম্প্রতি গণমাধ্যমে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ-বিআরটিএ চেয়ারম্যান মমতাজ সাদ উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, দেশের যেকোনো স্থানে সড়ক দুর্ঘটনার সংবাদ পাওয়া মাত্রই বিআরটিএ কর্মকর্তারা সেখানে উপস্থিত হবেন। ফিটনেসবিহীন গাড়ি সড়কে চলাচল বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। শিগগিরই ফিটনেসবিহীন গাড়ির বিরুদ্ধে আরও জোরালো অভিযান চালানো হবে।

বিআরটিএ শুধু আইন প্রয়োগ নয়, জনগণকে সচেতন করতেও কাজ করছে। নিয়মিত সড়ক নিরাপত্তা প্রচারণা চালাতে পোস্টার, ব্যানার, টিভি বিজ্ঞাপন এবং কর্মশালার মাধ্যমে মানুষকে ট্রাফিক আইন মেনে চলতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এর ফলে সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস এবং নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে।