ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উত্তরা পূর্ব থানায় দায়েরকৃত পিটিশন মামলা নাম্বার ৩৭/২০২৪ এবং পরবর্তীতে রেগুলার হওয়া মামলা নাম্বার ১১(১২)/২০২৪ ঘিরে এক চাঞ্চল্যকর জালিয়াতি ও প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। মামলাটি দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় হত্যা সহায়তার অভিযোগে দায়ের করা হলেও তদন্তে বেরিয়ে এসেছে— এটি ছিল একটি পরিকল্পিত মিথ্যা মামলা, যার মাধ্যমে কয়েকজন প্রতারক আইনজীবী ও ব্যক্তি মিলে চাঁদাবাজির জাল বিস্তার করেছিল।
বাদী হিসেবে মামলায় নাম আসে আল ইমরান, পিতা- আলতাব উদ্দিন মোল্লা, মাতা- মোসাম্মৎ শামসুন্নাহার, সাং- সংকোচখালী, পোস্ট- গোয়ালবাথান, থানা- মাগুরা সদর, জেলা- মাগুরা। বর্তমানে তিনি উত্তরা, সেক্টর ৪-এ বসবাস করেন বলে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু তদন্তে দেখা যায়, তার প্রদত্ত তথ্যের বেশিরভাগই মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর।
তদন্তে বেরিয়ে আসে মিথ্যার জাল : মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পূর্ব থানার উপ-পরিদর্শক (নিরস্ত্র) মো. ইব্রাহিম হোসেন (আইডি নং- বিপি ৮৩ ০৪ ০০ ২৯২৫) বলেন, ‘এই মামলাটি সম্পূর্ণ ভুয়া ও ভিত্তিহীন। বাদী আল ইমরান নিজেকে নিহত তারেকের খালাতো ভাই পরিচয় দিলেও তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে, তাদের মধ্যে কোনো আত্মীয়তার সম্পর্ক নেই। আরও আশ্চর্যের বিষয়, যিনি নিহত বলে দাবি করা হয়েছে, তার মৃত্যু উত্তরা পূর্ব থানার এলাকায় নয়, বরং যাত্রাবাড়ী থানা আওতাধীন এলাকায় ঘটে। ফলে এখানকার বিচারিক এখতিয়ারে ঘটনাটি পড়ে না।’
আইনজীবীর নামে জালিয়াতি : ঢাকা জজ কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. সাইফুল ইসলাম (সদস্য নং- ২২৫৫০) জানান, তার নাম, ছবি ও সিল জাল করে এই মামলাটি ফাইলিং করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমি এই মামলার পিটিশন বা ফাইলিং কোনোভাবেই করিনি। পরবর্তীতে জানতে পারি, অ্যাডভোকেট আব্দুল আউয়াল (সদস্য নং- ১৮৮৭৮) আমার নামে ওকালতনামা ক্রয় করে আমার স্বাক্ষর ও সিল জালিয়াতি করে মামলা দায়ের করেছে।’ অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম এ ব্যাপারে ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন ২০ মে ২০২৫ তারিখে।
তদন্তে তিনি উল্লেখ করেন, “অ্যাডভোকেট আব্দুল আউয়াল মামলায় আমার নাম ব্যবহার করে বাদীর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন এবং আসামিদের কাছ থেকে ‘মামলা নিষ্পত্তির’ নামে অর্থ দাবি করতেন।”
চাঁদাবাজি ও মামলা বাণিজ্যের অভিযোগে তোলপাড় : উত্তরা পূর্ব থানার তদন্ত কর্মকর্তা জানান, ‘বাদী আল ইমরান ও অ্যাডভোকেট আব্দুল আউয়াল একত্রে মামলা বাণিজ্যে চালাচ্ছিলেন। তারা সাংবাদিক, সম্পাদক, শিল্পপতি ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে টাকা আদায়ের চেষ্টা করতেন। আমার কাছে তাদের অনেক রেকর্ড আছে বিভিন্ন আসামিদের কাছে টাকা চাওয়ার। রেকর্ডগুলো প্রমাণসহ যাদের কাছে টাকা চেয়েছে তারা আমার কাছে পাঠিয়েছে, আরও অনেক প্রমাণ আমার কাছে আছে। এমনকি বিভিন্ন পত্রিকার সম্পাদকদেরও হুমকি দেয়া হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে বাদীকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি। কিন্তু তিনি থানায় আর আসছেন না। একাধিকবার ডাকা হলেও এড়িয়ে যাচ্ছেন।’
ঘটনার পেছনের উদ্দেশ্য : তদন্ত সূত্রে জানা যায়, মামলাটির মূল লক্ষ্য ছিল কিছু ব্যক্তিকে মিথ্যা হত্যার মামলায় জড়িয়ে আর্থিক ফায়দা তোলা। তদন্ত কর্মকর্তা ইব্রাহিম হোসেন বলেন, ‘এটি শুধু প্রতারণা নয়, বরং দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার প্রতি জনগণের আস্থা নষ্ট করার ষড়যন্ত্র। সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা এবং আদালত ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করার জন্য এমন জাল মামলা করা হয়েছে।’
সরকারি পদক্ষেপের আহ্বান : অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমি মাননীয় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও আইজিপি মহোদয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এমন ভুয়া মামলা শুধু নির্দোষ সাংবাদিক, সম্পাদক ও কলামিস্টদের মানহানি ঘটাচ্ছে না, বরং আইনজীবী সমাজের ভাবমূর্তিও নষ্ট করছে। আমি অনুরোধ করছি, যেন প্রমাণ ছাড়া কাউকে হয়রানি না করা হয় এবং এই ধরনের জাল মামলা রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হয়।’
সাংবাদিকদের ওপর মিথ্যা মামলার প্রভাব : আইন বিশ্লেষক ও মিডিয়া পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে সাংবাদিক ও সম্পাদকদের নামে ভিত্তিহীন মামলা দায়েরের প্রবণতা বেড়েছে। এই ধরনের মামলা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে বাধাগ্রস্ত করে, ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করে এবং সত্য প্রকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
তারা আরও বলেন, ‘যে মামলাগুলো প্রকৃত ঘটনায় নয়, বরং ব্যক্তিগত শত্রুতা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা আর্থিক স্বার্থে করা হয়, সেগুলো সমাজে আইনের প্রতি আস্থা কমিয়ে দেয়।’
তদন্তের স্বচ্ছতা নিশ্চিতের দাবি : সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, এই মামলাটি চাঁদাবাজি সিন্ডিকেটের একটি নমুনা মাত্র। আরও অনেক অনুরূপ মামলা দেশজুড়ে চলতে পারে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এমন মামলার পেছনের মূল হোতাদের শনাক্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ সাংবাদিক, সম্পাদক বা পেশাজীবীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে বাণিজ্যের সুযোগ না পায়।
উত্তরা পূর্ব থানার মামলা নাম্বার ১১(১২)/২০২৪-এর তদন্ত এখন চলমান। তবে তদন্ত কর্মকর্তার প্রাথমিক প্রতিবেদনে মামলাটি ‘ভিত্তিহীন, প্রতারণামূলক ও জাল কাগজে তৈরি’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশের আইনজীবী সমাজ, সাংবাদিক মহল এবং সচেতন নাগরিকরা একবাক্যে বলছেন সত্যের পক্ষে, ভুয়া মামলার বিরুদ্ধে সরকার ও আদালতকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী জেড আই খান পান্না আমার সংবাদকে বলেন, যদি এমন ঘটনা সত্য হয়, আদালতকে পিটিশনের মাধ্যমে জানানো যেতে পারে। আদালত পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিতে পারেন। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়— দেশে এখন আইনের শাসন কতটা কার্যকর আছে?