দুই দশকের মধ্যে এবারের উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমান পরীক্ষায় সবচেয়ে কম পাসের হার রেকর্ড হয়েছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার ২০২৫ সালের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হলে ফলাফলের এই বিপর্যয় লক্ষ্য করা যায়।
এবার গড় পাসের হার ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ। মোট ৬৯ হাজার ৯৭ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ অর্জন করেছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ড একযোগে ফল প্রকাশ করে।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক খন্দোকার এহসানুল কবির আনুষ্ঠানিকভাবে ফলাফল ঘোষণা করেন। ২০০৫ সালের পর এ বছর ফলাফলে বড় ধরনের ধস নেমেছে।
দেশের নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ড মিলিয়ে এবার গড় পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫৮.৮৩ শতাংশ। গত বছরের তুলনায় পাসের হার ১৮.৯৫ শতাংশ কমেছে।
অন্যদিকে সাধারণ ৯টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবারের গড় পাসের হার মাত্র ৫৭ দশমিক ১২ শতাংশ, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ কম। অর্থাৎ প্রায় ৪৩ শতাংশ শিক্ষার্থী সাধারণ বোর্ডের অধীনে এবার পাস করতে ব্যর্থ হয়েছে।
পাসের হারের পাশাপাশি এবার কমেছে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও।
এবারের ফলাফলের তুলনামূলক চিত্রে দেখা গেছে, এবার মাদ্রাসা বোর্ডে পাসের হার আগের তুলনায় কমলেও এগারোটি বোর্ডের মধ্যে পাসের হার সর্বোচ্চ।
এবার আলিমে পাসের হার ৭৫ দশমিক ৬১ শতাংশ। যেখানে গত বছর ছিল ৯৩ দশমিক ৪০ শতাংশ।
অন্যদিকে নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে পাসের হারে এগিয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। আর ফলাফলে পিছিয়ে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে এ বছরের মোট পাসের হার ৬৪ দশমিক ৬২ শতাংশ। পাসের সবচেয়ে কম কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে। এ বোর্ডের পাসের হার ৪৮ দশমিক ৮৬ শতাংশ।
এছাড়া রাজশাহীতে ৫৯ শতাংশ ৪০, যশোর ৫০ দশমিক ২০ শতাংশ, চট্টগ্রামে ৫২ দশমিক ৫৭, বরিশালে ৬২ দশমিক ৫৭, সিলেটে ৫১ দশমিক ৮৬, দিনাজপুরে ৫৭ দশমিক ৪৯, ময়মনসিংহে ৫১ দশমিক ৫৪ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছেন। জিপিএ-৫ প্রাপ্তদের সংখ্যাও এ বছর কমেছে।
জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের সংখ্যায় ঢাকা বোর্ডে শীর্ষে, পিছিয়ে বরিশাল ও সিলেট বোর্ড। ফলাফলে দেখা গেছে, এবারে জিপিএ-৫ অর্জন করেছেন মোট ৬৯,০৯৭ জন শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে ঢাকা বোর্ডের শিক্ষার্থীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি- ২৬,০৬৩ জন। রাজশাহী বোর্ডে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ১০,১৩৭ জন, কুমিল্লায় ২,৭০৭ জন, যশোরে ৫,৯৯৫ জন, চট্টগ্রামে ৬,০৯৭ জন, বরিশালে ১,৬৭৪ জন, সিলেটে ১,৬০২ জন, দিনাজপুরে ৬,২৬০ জন, ময়মনসিংহে ২,৬৮৪ জন।
এছাড়া মাদ্রাসা বোর্ডে ৪,২৬৮ জন এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ১,৬১০ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন। এ বছর দেশের ২০২টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সবাই ফেল করেছে।
গত বছর শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠান ছিল ৬৫টি। করোনা মহামারির কারণে কয়েক বছর এইচএসসি পরীক্ষা পূর্ণাঙ্গভাবে নেয়া সম্ভব হয়নি। কখনো সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে, আবার কখনো চারটি বিষয়ের ওপর পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ২০২০ সালে করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে পরীক্ষা নেয়া সম্ভব হয়নি। ফলে সে বছর ফরম পূরণ করা সবাইকে ‘অটোপাস’ পাস করিয়ে দেয়া হয়।
২০২১ সালে মহামারির মাঝেই এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে পাসের হার ছিল ৯৫ দশমিক ২৬ শতাংশ। ২০২২ সালে তা নেমে আসে ৮৫ দশমিক ৯৫ শতাংশে, আর ২০২৩ সালে আরও কমে দাঁড়ায় ৭৮ দশমিক ৬৪ শতাংশে। ২০২৪ সালে অবশেষে পূর্ণ সিলেবাস, পূর্ণ নম্বর এবং নির্ধারিত সময় অনুযায়ী পরীক্ষা শুরু হয়।
তবে কয়েকটি পরীক্ষা শেষে কোটা সংস্কার আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে পরীক্ষার সূচি স্থগিত হয়ে যায়। ওই আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সরকার পতনের ঘটনা ঘটে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর পরীক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তুলে ধরে আন্দোলন শুরু করে, যাতে বাকি পরীক্ষা না নেওয়ার দাবি ওঠে। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বাকি বিষয়গুলোর পরীক্ষা বাতিল করে এবং সাবজেক্ট ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে এসএসসি ফলাফলের ভিত্তিতে চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করে। ওই বছরের পাসের হার ছিল ৭৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
পাঁচ বছর পর এবার এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা স্বাভাবিক ধারায় ফিরেছে। এজন্য ফলাফল নিম্নমুখী বলে মনে করছেন বোর্ড সংশ্লিষ্টরা।
ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মানবিক বিভাগে পাসের হার সবচেয়ে কম। বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে তুলনামূলক ভালো ফল হলেও মানবিকে পাস করেছেন অর্ধেক শিক্ষার্থী। এবারের এইচএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার ৭৮.৬৭ শতাংশ, মানবিক বিভাগে ৫০.৫৪ শতাংশ এবং ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ৫৫.৫২ শতাংশ।
এদিকে, ইংরেজি এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। এই দুটি বিষয়ে খারাপ ফলের কারণে সামগ্রিক পাসের হারে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়েছে। তবে সব বোর্ডেই ফলাফল প্রদানের সময় ফলাফলে এই ধসের বিষয়ে কথা বলেছেন দায়িত্বশীলরা।
ফলাফল প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক খন্দোকার এহসানুল কবির বলেন, ‘আমরা কাউকে কোনো ছক বেঁধে দিইনি বা নির্দিষ্ট করে দিইনি যে এইভাবে নম্বর ছাড় দেবেন অথবা ওভারমার্কিং (যা প্রাপ্য নয়, তার চেয়ে বেশি নম্বর দেয়া) করবেন, বেশি বেশি দিয়ে পাসের হার বাড়াতে হবে, এ রকম কোনো প্রশ্নই ওঠে না।’
যশোর শিক্ষা বোর্ডে ইংরেজি বিষয়ে ফল বিপর্যয়ের প্রভাব পড়েছে বোর্ডের গোটা পাসের হার ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তিতে। তবে যশোর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান মোসাম্মৎ আসমা বেগম এটাকে ফল বিপর্যয় বলতে চান না।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আমরা বিপর্যয় বলতে চাই না। এটাই অরিজিনাল ফলাফল। শিক্ষার্থীরা তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী ফল পেয়েছে। তবে আমরা এই ফলাফলে সন্তুষ্ট নই। ইংরেজি বিষয়ে তারা বেশি ভালো করতে পারেনি। যার প্রভাব পড়েছে বোর্ডের গোটা ফলাফলে।’
সিলেটেও ফলাফলে এবার ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটেছে। বিগত ১২ বছরের মধ্যে এবার পাসের হার সর্বনিম্ন। এবার সিলেট বিভাগে প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থীই এবার ফেল করেছে।
সিলেটে শিক্ষা বোর্ডের সম্মেলনকক্ষে আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশের সময় বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মো. আনোয়ার হোসেন চৌধুরী এই ফলাফল বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাস না করা ও ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্কের দূরত্বের কথা উল্লেখ করেছেন।
চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডেও এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলে পাসের হার ও জিপিএ-৫ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে ওভারমার্কিং বন্ধের কারণে এইচএসসির ফল বিপর্যয় বলে মনে করছে চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ড।
চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ড মিলনায়তনে এইচএসসি’র ফল ঘোষণার সময় বোর্ডের চেয়ারম্যান ইলিয়াছ উদ্দিন আহাম্মদ ও সচিব এ কে এম সামছু উদ্দিন আজাদ এর উপস্থিতিতে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী ওভারমার্কিং বন্ধ নিয়ে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। বরিশাল বোর্ডেও ভয়াবহ ফল বিপর্যয় হয়েছে।
তবে বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মো. ইউনুস আলী সিদ্দিকী মনে করছেন, বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের ফলাফল সন্তোষজনক।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, গত বছর পাসের হার বেশি থাকলেও এ বছর পাসের হার কম। তবে যারা নিয়মিত পড়াশুনা করেছে, তারাই কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন করেছে।
এদিকে ফলাফল বিপর্যয়ের শীর্ষে থাকা কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর রুনা নাসরিন জানান, কেন্দ্র ভ্যানু পরিবর্তন হওয়া, নকলমুক্ত পরিবেশে পরীক্ষা গ্রহণ, সঠিকভাবে উত্তরপত্র মূল্যায়ন এ সব কারণে ফলাফল নিম্নগামী।
এদিকে দেশের শিক্ষার তথ্য নিয়ে কাজ করা বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) এর তথ্যানুসারে, ২০০৫ সালে এইচএসসিতে পাসের হার ছিল ৫৯ শতাংশের বেশি। ২০০৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৬৪ শতাংশ, ২০০৭ সালে ৬৪ শতাংশের ওপরে, ২০০৮ সালে প্রায় ৭৫ শতাংশ হয়। কিন্তু ২০০৯ সালে তা কমে যায় ৭০ দশমিক ৪৩ শতাংশে।
এর পরবর্তী বছরগুলোয় পাসের হার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করেছে। তবে ২০১৫, ২০১৭ ও ২০১৮ সালে ৭০ শতাংশের নিচে নেমেছিল পাসের হার।