রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দেশের আমদানি-রপ্তানি খাতে নেমে এসেছে বিপর্যয়। গত শনিবার দুপুরে শুরু হওয়া এই আগুনে পুড়ে গেছে গার্মেন্ট রপ্তানির চালান, ওষুধশিল্পের কাঁচামাল এবং আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের শত শত শিপমেন্ট। ফায়ার সার্ভিস জানায়, এটি কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতা।
বিপুল ক্ষতি, থমকে গেছে সরবরাহচক্র : আগুনের এই ঘটনায় ধ্বংস হয়েছে হাজার কোটি টাকার পণ্য। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এটি কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়- দেশের শিল্প, রপ্তানি আস্থা ও লজিস্টিক নেটওয়ার্কের ওপর বড় আঘাত। কার্গো ভিলেজে গার্মেন্ট, ফার্মাসিউটিক্যাল, ইলেকট্রনিকস ও আন্তর্জাতিক কুরিয়ারের পণ্য সংরক্ষণ করা হয়।
শনি ও শুক্রবার ছুটি থাকায় সেই দিনগুলোতে গুদামে বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক, ওষুধশিল্পের কাঁচামাল ও পোশাকপণ্য মজুত ছিল, যা আগুনে সম্পূর্ণ পুড়ে যায়।
দায়িত্বে কারা : উড়োজাহাজ থেকে কার্গো নামানো থেকে শুরু করে ব্যবসায়ীর হাতে পণ্য পৌঁছানো পর্যন্ত দায়িত্বে থাকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। তারা গ্রাউন্ড হ্যান্ডলার হিসেবে পণ্য আনলোড, স্ক্যানিং, ওজন, হ্যান্ডলিং, বিলিং ও ডকুমেন্টেশন- সব কাজই করে।
অন্যদিকে, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) পুরো বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনার মালিক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা। অবকাঠামো, নিরাপত্তা, পার্কিং ও স্ক্যানিংয়ের জন্য চার্জ নেয় তারাই। তবে বাস্তবতা হলো- দুই সংস্থাই নিয়মিত কোটি টাকার চার্জ নেয়, কিন্তু নিরাপত্তা নিশ্চিতে ব্যর্থ। বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাফা)
তথ্যে দেখা যায়, শাহজালালে প্রতি কেজি পণ্যের জন্য চার্জ ০.২৯ মার্কিন ডলার, যেখানে দিল্লি বিমানবন্দরে তা মাত্র ০.০৫ ডলার। কিন্তু এত টাকা নেয়া সত্ত্বেও নিরাপত্তা ও অগ্নিনির্বাপণে কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নেই। সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি খায়রুল আলম ভূঁইয়া মিঠু বলেন, আমাদের প্রতিটি চালানে চার্জ নেয়া হয় নিরাপত্তার নামে। কিন্তু সেই নিরাপত্তাই কোথায়? এখন আমাদের শত শত কোটি টাকার ক্ষতির দায় নেবে কে?
ফায়ার সার্ভিসের অভিযোগ : অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল শূন্য। গতকাল বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তাজুল ইসলাম চৌধুরী জানান, কার্গো ভিলেজে আগুন নেভানোর কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ব্যবস্থা ছিল না। স্থাপনাটি স্টিল ও ছোট কম্পার্টমেন্টে তৈরি হওয়ায় আগুন দ্রুত ছড়িয়েছে ও নেভাতে দেরি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কলামের ভেতরে ফাটল ধরেছে, স্থাপনাটি এখন ঝুঁকিপূর্ণ। চারটি ইউনিটকে সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। আগুনে পোড়া রাসায়নিক থেকে নতুন এক ধরনের ধোঁয়া তৈরি হয়েছে বলে জানায় ফায়ার সার্ভিস। এতে পরিবেশগত ক্ষতি সীমিত হলেও স্থাপনার কাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সময়মতো ঢুকতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস : একজন আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসকর্মী বলেন, বেলা ২টা ১৫ মিনিটে আগুন দেখা যায়। ফায়ার সার্ভিস আসে দ্রুত, কিন্তু ৮ নম্বর গেট দিয়ে প্রবেশ করতে না পারায় অন্তত ২০ মিনিট বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এই দেরিই আগুন ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ফায়ার সার্ভিসের ৩৭টি ইউনিট, সঙ্গে নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও আনসার সদস্যরা অংশ নেন আগুন নেভানোর কাজে। শনিবার রাত ৯টা ১৮ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে, কিন্তু পুরোপুরি নেভাতে লাগে ২৭ ঘণ্টা।
অব্যবস্থাপনার আগুনে পুড়ছে আস্থা : কার্গো ভিলেজে বর্তমানে ৪৫টি আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিস অপারেশন চালায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে তাদের মাধ্যমে আসে হাজার কোটি টাকার পণ্য। এই বিপর্যয়ের পর শুধু ব্যবসায়ীরাই নয়, আন্তর্জাতিক লজিস্টিক পার্টনাররাও বাংলাদেশের নিরাপত্তা সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। রপ্তানিকারকরা বলছেন, এমন দুর্ঘটনা বিদেশি ক্রেতাদের আস্থায় ধাক্কা দেবে।
জাতীয় দায়বদ্ধতার প্রশ্ন : ঘটনার পর বেবিচক ও বিমান উভয় সংস্থা তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে। কিন্তু ব্যবসায়ী মহল বলছে, তদন্ত নয়, প্রয়োজন দায়িত্ব নির্ধারণ ও ক্ষতিপূরণের নিশ্চয়তা। কার্গো ভিলেজের এই আগুন দেখিয়ে দিয়েছে রাষ্ট্রীয় স্থাপনাতেও অগ্নিনির্বাপণ নিরাপত্তা এখনো কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ।