দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর শুধু একটি যাত্রী পরিবহনের কেন্দ্র নয় এটি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির প্রতীক। সম্প্রতি টার্মিনাল ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা যদিও দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে, তবুও এটি দেশের বিমান নিরাপত্তা ব্যবস্থার সক্ষমতা এবং সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের নিজস্ব ফায়ার ইউনিটের প্রস্তুতি, সরঞ্জাম ও প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতাকে নতুন করে সামনে এনেছে।
যদিও সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে, ঘটনাটি দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলবে না। তবুও বিশেষজ্ঞরা এটিকে সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন। কারণ বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ও জরুরি প্রতিক্রিয়ার সক্ষমতা এখন আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
গত শনিবার দুপুর সোয়া ২টার দিকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো সেকশনে আগুন লাগার খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। একে একে ৩৭টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। যোগ দেয় সেনা, নৌবাহিনী ও বিজিবি।
এ সময় ফায়ার সার্ভিসের ৩৭টি ইউনিট ঘটনাস্থলে কাজ করে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। সাত ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর শনিবার রাত ৯টা থেকে বিমানবন্দরের সব ধরনের ফ্লাইট কার্যক্রম পুনরায় চালু করা হয়।
প্রায় ৭ ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নেভানো গেলেও ভেতরের গুদামঘর, রপ্তানির জন্য প্রস্তুত পোশাক, ইলেকট্রনিক পণ্য ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে।
কার্গো ভিলেজ মূলত রপ্তানি ও আমদানির পণ্য পরিবহনের প্রধান কেন্দ্র। প্রতিদিন এখান দিয়ে প্রায় ৮০০ থেকে ১,০০০ টন কার্গো পণ্য প্রক্রিয়াজাত ও প্রেরণ করা হয়। ফলে আগুনের ঘটনায় কেবল স্থানীয় ক্ষতিই নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চেইনেও বড় প্রভাব পড়বে। সৌভাগ্যবশত এ অগ্নিকাণ্ডে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
ঘটনার পরপরই সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানায়, বিমানবন্দরের জরুরি প্রতিক্রিয়া ইউনিট দ্রুত সাড়া দিয়েছে। পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। এই ঘটনায় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি বা ফ্লাইট নিরাপত্তায় কোনো প্রভাব পড়বে না।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব ফায়ার ইউনিট অত্যন্ত দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে আমরা বুঝতে পেরেছি সক্ষমতা আরও বাড়ানো দরকার। আধুনিক যন্ত্রপাতি, প্রশিক্ষণ ও দ্রুত সমন্বয়ের মাধ্যমে এই সক্ষমতা উন্নত করা হবে।’
বেবিচক জানিয়েছে, কার্গো ভিলেজের একটি কুরিয়ার শেড থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়, যে আগুন ২৬ ঘণ্টা পরে সম্পূর্ণভাবে নেভানো সম্ভব হয়। বিমানবন্দর সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা গেছে, এতে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
বিমান নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা একটি ‘ওয়েক-আপ কল’। যদিও আগুন দ্রুত নেভানো হয়েছে, তবে এটি দেখিয়ে দিয়েছে জরুরি প্রতিক্রিয়ার অবকাঠামো কতটা প্রস্তুত, কর্মীরা পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত কি না এবং প্রযুক্তিগত সমন্বয় কতটা কার্যকর।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুব আরিফ বলেন, বিমানবন্দরের মতো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে আগুন মানে শুধু ভৌত ক্ষতি নয়, এটি রাষ্ট্রের সক্ষমতা যাচাইয়ের মাপকাঠি। তাই এখনই নিজস্ব ফায়ার স্টেশনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও জনবল বাড়াতে হবে।
আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রতিটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে থাকতে হবে ২৪ ঘণ্টা প্রস্তুত ফায়ার স্টেশন, তিন স্তরের জরুরি প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা, বিশেষ এয়ারক্রাফট রেসকিউ ইউনিট এবং মাসিক মহড়া ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম।
বাংলাদেশে শাহজালাল, শাহ আমানত ও ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিজস্ব ফায়ার ইউনিট থাকলেও সেগুলোর অনেক সরঞ্জাম পুরোনো বা অপর্যাপ্ত।
সিভিল এভিয়েশন সূত্রে জানা যায়, শাহজালালে বর্তমানে মাত্র দুটি ফায়ার টেন্ডার ও ৪০ জন সদস্যের ইউনিট আছে, যেখানে আইসিএওর মানদণ্ডে প্রয়োজন অন্তত ৭০ জন সদস্য ও তিনটি আধুনিক ফায়ার টেন্ডার।
সিভিল এভিয়েশন এখন শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় ফায়ার স্টেশনের সম্প্রসারণে কাজ করছে।
নতুন পরিকল্পনায়, উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন ফোম টেন্ডার, রেসকিউ ভ্যান ও ফায়ার রোবট সংযোজনের পরিকল্পনা রয়েছ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও লাগেজ এলাকায় অটোমেটিক সেন্সর ও স্মার্ট অ্যালার্ম সিস্টেম স্থাপন করা হবে এবং বিমানবন্দরের কর্মীদের জন্য মাসিক ফায়ার ট্রেনিং বাধ্যতামূলক করা হবে।
প্রকল্পটির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা চাই, ২০২৬ সালের মধ্যে শাহজালাল বিমানবন্দরের ফায়ার ইউনিট দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আধুনিক ইউনিট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হোক।’
প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, আগুনের সূত্রপাত হয়েছে ইলেকট্রিক শর্ট সার্কিট থেকে। বিমানবন্দরের লাগেজ সিস্টেমে ব্যবহৃত একটি পুরোনো তার থেকে স্পার্ক ছড়িয়ে পড়ে।
তবে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ তদন্তে তিন সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করেছে যারা সাত কর্মদিবসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দেবে।
ফায়ার সার্ভিসের এক সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, ‘বিমানবন্দরের মতো স্থানে বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা সর্বোচ্চ মানে থাকতে হবে। এখানে প্রতিটি ইউনিটে আলাদা সার্কিট ব্রেকার ও ফায়ার সেন্সর থাকা বাধ্যতামূলক করা উচিত। ‘
শাহজালাল বিমানবন্দরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলোর কেউ এখনো আনুষ্ঠানিক উদ্বেগ প্রকাশ করেনি। তবে বেশ কয়েকটি দূতাবাস বাংলাদেশ সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে লিখিত নিরাপত্তা রিপোর্ট চেয়েছে।
বিমানবন্দর ব্যবহারকারী যাত্রীদের মধ্যেও ছিল সাময়িক উদ্বেগ। তবে ফ্লাইট চলাচল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হওয়ায় আস্থা কিছুটা ফিরেছে।
সিঙ্গাপুর থেকে আগত এক যাত্রী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আগুনের খবর শুনে ভয় পেয়েছিলাম, কিন্তু বিমানবন্দরের কর্মীদের আচরণ ও দ্রুত ব্যবস্থা দেখে স্বস্তি পেয়েছি। তবে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে তাদের আরও প্রস্তুত থাকতে হবে।‘
বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপগামী ট্রানজিট ফ্লাইটের জন্য। এমন প্রেক্ষাপটে প্রতিটি নিরাপত্তা ত্রুটি শুধু অভ্যন্তরীণ নয়, আন্তর্জাতিক আস্থার সঙ্গেও জড়িত।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, একটি ঘটনার প্রভাব মুছতে মাস লাগে, কিন্তু প্রস্তুতি থাকলে সেই প্রভাব তৈরি হয় না। তাই এখন প্রয়োজন নিয়মিত নিরাপত্তা মহড়া, ফায়ার ইউনিটের জন্য আধুনিক সরঞ্জাম, জরুরি প্রতিক্রিয়ায় ত্রিপক্ষীয় সমন্বয় এবং বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের অগ্নিকাণ্ড বড় কোনো ক্ষতি ঘটায়নি, তবে এটি একটি সতর্কবার্তা। প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী, কোটি টাকার কার্গো এবং দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির লেনদেন ঘটে এমন স্থানে সামান্য ত্রুটিও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
তাই এখনই সময় নিজস্ব ফায়ার স্টেশনের সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুনর্মূল্যায়ন করার। একটি প্রস্তুত বিমানবন্দর শুধু ফ্লাইট নিরাপদ রাখে না বরং পুরো জাতির নিরাপত্তা বিশ্বাসের প্রতীক হয় ওঠে।
ইএইচ