প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে মৌখিকভাবে দুই ছাত্র প্রতিনিধি উপদেষ্টাকে সামঞ্জস্য রক্ষার স্বার্থে পদত্যাগের পরামর্শ দেওয়া হয় তবে তারা সময় চেয়েছেন বলে সরকারের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, মূলত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও আগাম নির্বাচনের প্রস্তুতি ঘিরে সরকারের অভ্যন্তরে যে চাপ ও মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব পড়েছে উপদেষ্টা পরিষদেও।
এই দুই উপদেষ্টা হলেন তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলম এবং স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। দুজনই ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে আসা প্রতিনিধি। সরকার গঠনের সময় তাদের অন্তর্ভুক্তি ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের গণঅংশগ্রহণমূলক চেহারা প্রদর্শনের অংশ হিসেবে।
তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম এখন পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগ্রহ দেখাননি। তিনি সরকারের দায়িত্বে থেকেই নিজের অবস্থান পরিষ্কার করতে চান। অন্যদিকে স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ জানিয়েছেন, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে পদত্যাগ করার বিষয়ে তিনি ভাবছেন।
সূত্র বলছে, ছাত্র প্রতিনিধিদের কেউ না কেউ উপদেষ্টা পরিষদে শেষ পর্যন্ত থাকুক, এটা চান ছাত্র উপদেষ্টারা। তারা মনে করছেন, না থাকলে উপদেষ্টা পরিষদে কেউ কেউ তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে পারেন।
গত ১৪ আগস্ট সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আসিফ মাহমুদ বলেছিলেন, “তফসিল ঘোষণার আগেই আমি দায়িত্ব ছাড়ব। তখন আমার ভূমিকা নাগরিক উদ্যোগের পর্যায়ে থাকবে।”
অন্যদিকে মাহফুজ আলম ২৮ সেপ্টেম্বর এক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘দুই মাস ধরে আমি অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি, কখন নামব জানি না। পরিস্থিতি যেমন, তেমনি দেখি।’
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। বর্তমানে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য প্রধান উপদেষ্টাসহ ২৩ জন। তাদের মধ্যে দুজন ছাত্র প্রতিনিধি।
সরকার গঠনের সময় উপদেষ্টা পরিষদে ছিলেন ছাত্র প্রতিনিধি মো. নাহিদ ইসলাম। পরে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি তিনি পদত্যাগ করে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক হন। এনসিপি গঠন করেছেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণেরা।
মাহফুজ আলম শুরুতে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ছিলেন। নিয়োগ পান গত বছরের ২৮ আগস্ট। পরে ১০ নভেম্বর তিনি উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন। তবে সে সময় তাকে কোনো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। নাহিদ ইসলাম পদত্যাগ করার পর তাকে তথ্য উপদেষ্টার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
অন্যদিকে আসিফ মাহমুদ শুরুতে ছিলেন শ্রম মন্ত্রণালয় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। এ এফ হাসান আরিফকে (প্রয়াত) সরিয়ে আসিফ মাহমুদকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় গত বছরের নভেম্বরে। এখন তিনি স্থানীয় সরকার ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন।
সরকারের অভ্যন্তরে অনেকে মনে করেন, এমন ধারণা করতে অসুবিধা হয় না যে এই দুই ছাত্র প্রতিনিধি উপদেষ্টা এনসিপির ঘনিষ্ঠ। তারা দলটির পরামর্শকের ভূমিকায় থাকেন।
সর্বশেষ জুলাই জাতীয় সনদ স্বাক্ষর করা নিয়ে সংকটের মধ্যে ১৪ অক্টোবর রাতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন এনসিপির সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করে। বৈঠকে দলটির পক্ষে অন্য নেতাদের পাশাপাশি অংশ নেন একজন ছাত্র প্রতিনিধি উপদেষ্টাও।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে এমন বিতর্ক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের ভাবমূর্তির জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করছে।
তারা বলছেন, উপদেষ্টা পরিষদ নিয়ে যেসব বক্তব্য ও সন্দেহ তৈরি হচ্ছে, তা অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ করছে। প্রধান উপদেষ্টাকে এখানে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। যদি ছাত্র উপদেষ্টাদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থেকে যায়, তবে তাদের দায়িত্বে থাকা সরকারের ভাবমূর্তির জন্য ক্ষতিকর।
তারা আরও বলেন, দুই ছাত্র উপদেষ্টার উচিত স্পষ্ট ঘোষণা দেওয়া তারা নির্বাচনে অংশ নেবেন না এবং এনসিপির সঙ্গে তাদের কোনো প্রকাশ্য বা অপ্রকাশ্য সম্পর্ক নেই। অন্যথায় জনগণের আস্থা নষ্ট হবে।
তবে এনসিপি নেতারা মনে করেন, উপদেষ্টা পরিষদে যেহেতু বিভিন্ন দলের প্রস্তাবিত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, কেবল ছাত্র প্রতিনিধিদের অপসারণের পদক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়। তারা যুক্তি দিচ্ছেন, সব দলের অংশগ্রহণে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছিল তাহলে কেবল দুজন তরুণ উপদেষ্টাকে বাদ দেওয়া সমতা ও স্বচ্ছতার পরিপন্থী।
এ বিষয়ে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘উপদেষ্টাদের অনেকেই রাজনৈতিক দলের সঙ্গে লিয়াজোঁ করছেন। শুধু ছাত্র প্রতিনিধিদের টার্গেট করা অন্যায়। সরকারের উচিত সমান আচরণ করা।’
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের অভিযোগ করেছেন, কিছু উপদেষ্টা সরকারের ভেতর থেকেই ষড়যন্ত্র করছেন, যা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে।
আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে তফসিল ঘোষণার কথা ভাবা হচ্ছে। নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকারের ভেতরে মতপার্থক্য ও পদত্যাগের গুঞ্জন রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিএনপির পক্ষ থেকে উপদেষ্টা পরিষদে দলীয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অপসারণের দাবি তুলেছে।
দলটির নেতারা বলছেন, সরকারের নিরপেক্ষ ভাবমূর্তি ধরে রাখতে হলে রাজনৈতিক যোগাযোগে যুক্ত উপদেষ্টাদের অব্যাহতি দেওয়া জরুরি।
সূত্রগুলো জানায়, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস নিজে এই বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। বুধবার সন্ধ্যায় তার সঙ্গে এনসিপি নেতাদের বৈঠকে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করা হয়।
বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা ধরে রাখতে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে।’
তিনি কোনো নাম উল্লেখ না করলেও ইঙ্গিত দেন, উপদেষ্টা পরিষদের কাঠামো সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যালোচনা করা হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সূচনা হয়েছিল নিরপেক্ষতা ও পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে। কিন্তু এক বছরের ব্যবধানে উপদেষ্টা পরিষদের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন, ছাত্র প্রতিনিধি ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সেই ভাবমূর্তিতে দাগ ফেলেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জনআস্থা পুনরুদ্ধার। দুই ছাত্র উপদেষ্টার পদত্যাগ বা অবস্থান পরিষ্কার না হলে নির্বাচনের আগে সরকারকে কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়তে হতে পারে।
একজন সাবেক উপদেষ্টা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘যে সরকারের মূল লক্ষ্য ছিল আস্থা ফিরিয়ে আনা, তার অভ্যন্তরেই যদি আস্থার সংকট তৈরি হয়, তা সবার জন্যই বিপজ্জনক সংকেত।’
অন্তর্বর্তী সরকারের রাজনৈতিক বাস্তবতা এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যেখানে পদত্যাগ, পুনর্গঠন বা আস্থা পুনরুদ্ধার যে কোনো একটি সিদ্ধান্তই সরকারের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার দিক নির্ধারণ করতে পারে।
ইএইচ