রাজধানীর সবচেয়ে ব্যস্ত সড়কগুলোর একটি প্রগতি সরণি থেকে রামপুরা ব্রিজ ও নতুনবাজার থেকে কাকলী পর্যন্ত অংশজুড়ে আজ থেকে শুরু হচ্ছে ওয়াসার পাইপলাইন সমপ্রসারণের কাজ। এই কাজের কারণে ওই এলাকায় যানজট ও জনভোগান্তির আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক ওয়াহিদুল ইসলাম মুরাদ স্বাক্ষরিত এক গণবিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ঢাকা এনভায়রনমেন্টালি সাসটেইনেবল ওয়াটার সাপ্লাই প্রকল্পের প্যাকেজ-৩.১ (ডিস্ট্রিবিউশন রিইনফোর্সমেন্ট পাইপলাইন) কাজের আওতায় প্রায় ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন স্থাপন করা হবে। এর ব্যাস ১৬০০ থেকে ৫৬০ মিলিমিটার পর্যন্ত।
বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হচ্ছে প্যাকেজ-৩.১-এর সেকশন-ডি (নতুনবাজার-রামপুরা ব্রিজ) এবং সেকশন-ই (নতুনবাজার-কাকলী) অংশের কাজ। সড়কের মিডিয়ান বরাবর পর্যায়ক্রমে ৪০০ মিটার দৈর্ঘ্যের পরপর দুই লেনে তিন মিটার করে যান চলাচল বন্ধ থাকবে।
ওয়াসা জানিয়েছে, কাজ চলাকালীন সার্বক্ষণিক যানচলাচল অব্যাহত থাকবে তবে বাস্তবে এই আশ্বাস কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন পরিবহন সংশ্লিষ্টরা।
রামপুরা ও নতুনবাজার এলাকায় প্রতিদিন হাজার হাজার অফিসগামী, স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী এবং কর্মজীবী মানুষ চলাচল করেন। বিশেষ করে সকাল ৮টা থেকে ১১টা এবং বিকেল ৫টা থেকে ৮টার মধ্যে এই সড়কগুলিতে যানবাহনের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
পরিবহন মালিক সমিতির এক নেতা জানান, ওই রুটে যেকোনো সামান্য বাধাও যানজটে রূপ নেয়। এখন যদি দীর্ঘমেয়াদি খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হয়, তাহলে রামপুরা, বনশ্রী, নতুনবাজার, মহাখালী, কাকলী সব জায়গাতেই যান চলাচল বিঘ্নিত হতে পারে।
ওয়াসা নাগরিকদের আহ্বান জানিয়েছে কাজ চলাকালীন বিকল্প সড়ক ব্যবহার এবং পর্যাপ্ত সময় হাতে নিয়ে বের হতে। তবে বিকল্প সড়কের বাস্তবতাও সীমিত। নতুনবাজার থেকে কাকলী বা রামপুরা পর্যন্ত সংযোগের বেশিরভাগ রাস্তাই সংকীর্ণ ও আগে থেকেই ব্যস্ত।
ট্রাফিক বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, আমরা বিকল্প রুট তৈরি করার চেষ্টা করছি। তবে অনেক এলাকায় এমন কোনো প্রশস্ত রাস্তা নেই যা দিয়ে নিয়মিত যান চলাচলকে ঘুরিয়ে দেয়া সম্ভব। তাই সময়ক্ষেপণ ও ভোগান্তি হতে পারে। ২৪ কিলোমিটার পাইপলাইন রাজধানীতে পানি সরবরাহে পরিবর্তন আনবে ওয়াসার এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো পানির সরবরাহ ব্যবস্থায় টেকসই পরিবর্তন আনা।
‘ঢাকা এনভায়রনমেন্টালি সাসটেইনেবল ওয়াটার সাপ্লাই প্রজেক্ট’ বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় পরিচালিত একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প, যার মাধ্যমে রাজধানীর পানি সরবরাহের চাপ কমানো এবং পুরানো পাইপলাইন প্রতিস্থাপন করা হবে।
ওয়াসার এক প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বর্তমান পাইপলাইনের অনেকগুলোই পুরানো ও লিকেজযুক্ত। এতে শুধু পানির অপচয় নয়, দূষণও ঘটে। নতুন পাইপলাইন বসানো হলে দীর্ঘমেয়াদে নাগরিকরা বিশুদ্ধ পানির সুবিধা পাবেন।
তবে নাগরিকরা বলছেন, প্রকল্পের উদ্দেশ্য ভালো হলেও বাস্তবায়নের সময় এবং ব্যবস্থাপনা নিয়ে গভীর অসন্তোষ রয়েছে।
অফিসগামী সালাউদ্দিন রশীদ বলেন, প্রগতি সরণি এমনিতেই যানজটপ্রবণ। এখন যদি সেখানে পাইপলাইন খোঁড়া শুরু হয়, তাহলে অফিসে পৌঁছানো কঠিন হবে।
রাইডশেয়ার চালক হাবিবুল ইসলাম বললেন, গতবার ওয়াসা রাস্তায় কাজ করেছিল তখন সপ্তাহজুড়ে জ্যাম লেগে ছিল। এবারও একই অবস্থা হবে বলে মনে হচ্ছে।
শহর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, ওয়াসার প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের সময় সমন্বয়ের অভাব এবং পরিকল্পনাহীন কাজের ধারা যানজটের প্রধান কারণ।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সাবেক প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদনান ইসলাম বলেন, ওয়াসা, ডিএনসিসি, ডিএসসিসি, ডিজিসিসি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস প্রতিটি সংস্থার কাজ আলাদাভাবে হয়। কেউ কারও সঙ্গে সমন্বয় করে না। ফলে এক জায়গায় রাস্তা খোঁড়া শেষ না হতেই অন্য সংস্থা আবার খোঁড়ে। এতে নাগরিক ভোগান্তি চরমে ওঠে। তিনি আরও বলেন, ওয়াসার উচিত ছিল কাজ শুরুর আগে বিকল্প ট্রাফিক পরিকল্পনা প্রকাশ করা এবং রাস্তায় সময়ভিত্তিক লেন খোলা রাখা।
নতুনবাজার ও রামপুরা ব্রিজের আশপাশের দোকানপাট ও রেস্টুরেন্টের ব্যবসায়ীরা বলছেন, কাজ শুরু হলে ক্রেতা কমে যাবে, বিক্রি হ্রাস পাবে। রামপুরার ব্যবসায়ী নজরুল হক জানান, যানজট হলে মানুষ দোকানে আসবে কম। গতবার এমন পরিস্থিতিতে বিক্রি অর্ধেক কমে গিয়েছিল। তারা ওয়াসার কাছে দাবি তুলেছেন, কাজ যেন দ্রুততম সময়ে, ধাপে ধাপে সম্পন্ন হয় এবং বিকল্প রাস্তা বা পারাপার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ওয়াসার উন্নয়ন প্রকল্প যেমন প্রয়োজনীয়, তেমনি যানবাহন চলাচল ও জনসাধারণের দৈনন্দিন জীবনকে সচল রাখতে বিশেষ পদক্ষেপ নিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কাজের সময়সূচি নির্ধারণ: রাতের বেলা বা কম যানবাহন চলাচলের সময়ে খোঁড়াখুঁড়ি কাজ করা। বিকল্প রুট নির্দিষ্টকরণ ও প্রচার: গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় বিকল্প পথের স্পষ্ট তথ্য দেয়া। ট্রাফিক পুলিশের সমন্বয়: প্রতিটি বন্ধ সেকশনে অতিরিক্ত ট্রাফিক সদস্য নিয়োগ। দ্রুত মেরামত ও ধাপে কাজ সম্পন্ন: যেন দীর্ঘমেয়াদে একই রাস্তায় পুনরায় কাজ না হয়। জনসচেতনতা ও তথ্যঘোষণা: নাগরিকদের আগে থেকেই জানানো হলে বিশৃঙ্খলা কমে যায়।
ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ওয়াহিদুল ইসলাম মুরাদ বলেন, কাজের কারণে সাময়িক ভোগান্তি হতে পারে, তবে প্রকল্প শেষ হলে রাজধানীর বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ অনেক বেশি উন্নত হবে। আমরা চেষ্টা করছি যেন যানচলাচলে কম প্রভাব পড়ে। নাগরিকদের সহযোগিতা কামনা করছি।
তিনি আরও জানান, কাজ পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন করা হবে, এবং প্রতিটি ধাপে সড়ক ব্যবহার আংশিক খোলা রাখা হবে যাতে জরুরি যানবাহন ও বাস সার্ভিস বন্ধ না হয়। ঢাকা ওয়াসার এই বৃহৎ পাইপলাইন প্রকল্প নিঃসন্দেহে রাজধানীর জল সরবরাহ ব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। কিন্তু উন্নয়নের এই কাজ যদি নাগরিক জীবনে স্থায়ী দুর্ভোগ ডেকে আনে, তবে তা সমাধানের বদলে নতুন সংকট তৈরি করবে। এই শহর ইতোমধ্যেই যানজটে জর্জরিত।
তাই প্রয়োজন সমন্বিত পরিকল্পনা, কার্যকর বাস্তবায়ন ও নাগরিক স্বচ্ছতা। ওয়াসা যদি সময়মতো ও দক্ষতার সঙ্গে এই প্রকল্প শেষ করতে পারে, তবে সাময়িক অসুবিধা সত্ত্বেও নাগরিকরা দীর্ঘমেয়াদে উপকৃত হবেন।