বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু নাম কেবল ব্যক্তিগত পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তারা হয়ে ওঠে সময়ের প্রতিচ্ছবি, ইতিহাসের ধারক এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনার প্রতীক। তারেক রহমান তেমনই একটি নাম, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের সামরিক শাসন-পরবর্তী গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা, দলীয় রাজনীতির উত্থান-পতন, নির্বাসনের দীর্ঘ অধ্যায় এবং প্রত্যাবর্তনের প্রতীক্ষা।
তিনি শুধু বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নন; তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রথম সন্তান; একটি রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহনকারী নাম, যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে আজও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
আগামীকাল তারেক রহমানের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন ঘিরে যে রাজনৈতিক উত্তাপ সৃষ্টি হয়েছে, তা নিছক একজন নেতার দেশে ফেরা নয়। এটি ১৭ বছরের নির্বাসিত রাজনৈতিক জীবনের এক প্রতীকী সমাপ্তি এবং একই সঙ্গে একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
শৈশব ও বেড়ে ওঠা : রাজনীতির আবহে একটি জীবন
১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর জন্ম নেয়া তারেক রহমান বেড়ে উঠেছেন এমন এক পরিবারে, যেখানে রাজনীতি ছিল দৈনন্দিন বাস্তবতা। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের টালমাটাল সময়, সামরিক অভ্যুত্থান, রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব এবং পরবর্তীতে নির্মম হত্যাকাণ্ড সবই তার শৈশব ও কৈশোরের স্মৃতিতে গভীর ছাপ ফেলেছে।
তার পিতা জিয়াউর রহমান ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক, একজন সেক্টর কমান্ডার এবং পরবর্তীতে রাষ্ট্রপতি, যিনি বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় সূচনা করেন। মাতা বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্যদিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন দেশের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা হিসেবে। এই রাজনৈতিক আবহেই তারেক রহমানের মানসিক ও রাজনৈতিক বেড়ে ওঠা। তবে তার রাজনৈতিক যাত্রা কেবল পারিবারিক পরিচয়ের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল না। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি সংগঠক হিসেবে সক্রিয় হন এবং ধীরে ধীরে বিএনপির রাজনীতিতে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেন।
বিএনপিতে উত্থান : সংগঠক থেকে নীতিনির্ধারক
নব্বইয়ের দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পর বিএনপি যখন একটি প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়, তখন তারেক রহমান দলীয় কাঠামোর ভেতরে সক্রিয় ভূমিকা নিতে শুরু করেন। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠন করলে তিনি দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠেন। তৃণমূল পর্যায়ে দলকে পুনর্গঠন, তরুণ নেতৃত্বকে সামনে আনা এবং জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানোর ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ- এমনটি বিএনপির অভ্যন্তরীণ মহলে স্বীকৃত। সমর্থকদের চোখে তিনি ছিলেন একজন আধুনিক সংগঠক, যিনি দলকে সময়োপযোগী করতে চেয়েছিলেন।
২০০৭ : রাজনৈতিক জীবনের মোড় পরিবর্তন
২০০৭ সালের ১/১১ রাজনৈতিক পটপরিবর্তন তারেক রহমানের জীবনে এক নাটকীয় বাঁক এনে দেয়। সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তিনি গ্রেপ্তার হন, বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হন এবং পরবর্তীতে বিদেশে অবস্থান নিতে বাধ্য হন। এই সময় থেকেই শুরু হয় তার দীর্ঘ নির্বাসনের অধ্যায়, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম দীর্ঘ নির্বাসিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের উদাহরণ। এই নির্বাসন তার রাজনৈতিক পরিচয়কে যেমন বিতর্কিত করেছে, তেমনি তাকে একটি ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
নির্বাসনের রাজনীতি : লন্ডন থেকে নেতৃত্ব
লন্ডনে অবস্থান করেও তারেক রহমান বিএনপির রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন থাকেননি। বরং আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তির মাধ্যমে তিনি দলীয় সিদ্ধান্ত, আন্দোলন ও কৌশল নির্ধারণে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। অনেকে একে ব্যঙ্গ করে ‘রিমোট কন্ট্রোল রাজনীতি’ বললেও, সমর্থকদের মতে এটি ছিল প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নেতৃত্ব ধরে রাখার কৌশল। এই সময় বিএনপি একাধিক রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে- নির্বাচন বর্জন, আন্দোলন ব্যর্থতা, দমন-পীড়ন এবং পুনর্গঠন। এই দীর্ঘ সময়জুড়ে তারেক রহমান দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে বিএনপির রাজনৈতিক লাইন নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
প্রত্যাবর্তন : প্রতীক, রাজনীতি ও বার্তা
২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমানের দেশে ফেরার সম্ভাবনা বিএনপির জন্য নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। দলীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে, তাকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নেতাকর্মীদের ঢল নামার সম্ভাবনা রয়েছে এবং একটি স্মরণীয় সংবর্ধনার প্রস্তুতিও নেয়া হচ্ছে। এই প্রত্যাবর্তন শুধু বিএনপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নয়, জাতীয় রাজনীতিতেও নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে। কারণ সামনে রয়েছে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ভোটার বিতর্ক : আইন ও রাজনীতির সংযোগস্থল
ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারেক রহমান বর্তমানে বাংলাদেশের ভোটার নন, এই বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিএনপির শীর্ষ নেতারা একে প্রশাসনিক জটিলতা হিসেবে দেখছেন এবং আশা প্রকাশ করছেন, দেশে ফেরার পর ২৭ ডিসেম্বরের মধ্যে আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তিনি ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হবেন। এই বিষয়টি নিছক একটি ভোটার তালিকার প্রশ্ন নয়; এটি রাজনৈতিক প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে। একজন রাজনৈতিক দলের প্রধান নেতার ভোটাধিকার নিশ্চিত হওয়া গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।
আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও তুলনা
তারেক রহমানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রবাসী বাংলাদেশি, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও কূটনৈতিক মহল তার প্রত্যাবর্তন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে নির্বাসন থেকে প্রত্যাবর্তনের নজির রয়েছে বেনজির ভুট্টো, শেখ হাসিনা, নওয়াজ শরিফ- এই নেতারা প্রত্যেকেই নির্বাসন কাটিয়ে ফিরে এসে নিজ নিজ দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তারেক রহমান সেই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় নতুন করে আলোচনায় আসছেন।
ব্যক্তি নন, একটি রাজনৈতিক অধ্যায়
তারেক রহমানকে বোঝা মানে কেবল একজন রাজনীতিবিদকে বোঝা নয়। তাকে বোঝা মানে বাংলাদেশের গত পাঁচ দশকের রাজনৈতিক ইতিহাস- স্বাধীনতা, সামরিক শাসন, গণতন্ত্রের লড়াই, নির্বাসন ও প্রত্যাবর্তনের ধারাবাহিকতাকে বোঝা।
২৫ ডিসেম্বরের প্রত্যাবর্তন যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তবে তা হবে এক দীর্ঘ রাজনৈতিক নির্বাসনের সমাপ্তি এবং নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা। এই অধ্যায় কতটা গণতান্ত্রিক, কতটা সংঘাতপূর্ণ কিংবা কতটা সমঝোতামূলক হবে- তা নির্ভর করবে তার নেতৃত্ব, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা এবং জনগণের প্রত্যাশার ওপর।
বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সেই সন্ধিক্ষণে তারেক রহমান কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি একটি সম্ভাবনা, একটি বিতর্ক এবং একটি প্রতীক্ষার নাম।
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে আবেগ ও উৎকণ্ঠা
দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগের নির্বাসন শেষে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে। একদিকে জনমনে তৈরি হয়েছে প্রবল আগ্রহ ও আবেগ, অন্যদিকে রাজনৈতিক অঙ্গনে দেখা যাচ্ছে উৎকণ্ঠা ও কৌশলগত হিসাব-নিকাশ। তারেক রহমানের ফিরে আসা শুধু একজন নেতার দেশে ফেরা নয়; বরং এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ সন্তান হিসেবে তারেক রহমান রাজনীতিতে প্রবেশের শুরু থেকেই আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন। বিএনপির সংগঠনকে তৃণমূল পর্যায়ে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে বরাবরই প্রশংসিত। বিশেষ করে ‘তারুণ্যের রাজনীতি’ ও আধুনিক রাজনৈতিক ভাবনার কারণে তিনি বিএনপির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রতীক হয়ে ওঠেন।
২০০৭ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তারেক রহমান বিদেশে চলে যেতে বাধ্য হন। দীর্ঘ সময় নির্বাসনে থাকলেও তিনি দলীয় রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন না। লন্ডন থেকেই তিনি দলের নীতিনির্ধারণ, আন্দোলন-সংগ্রাম এবং সাংগঠনিক কার্যক্রমে দিকনির্দেশনা দিয়ে আসছেন। এই দীর্ঘ অনুপস্থিতি তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তিকে একদিকে রহস্যময় করেছে, অন্যদিকে সমর্থকদের মধ্যে বাড়িয়েছে প্রত্যাশা।
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে এটি উৎসবের আবহ তৈরি করেছে। অনেকেই মনে করছেন, তার সরাসরি উপস্থিতি দলকে নতুন গতি দেবে এবং রাজনীতিতে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনবে। আবার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মধ্যে রয়েছে সতর্কতা ও উদ্বেগ কারণ তার প্রত্যাবর্তন রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তন আনতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, তারেক রহমানের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মূলত কৌশলী, সংগঠক এবং দূরদর্শী হিসেবে পরিচিত। তিনি আবেগের রাজনীতির পাশাপাশি বাস্তবতাভিত্তিক সিদ্ধান্তে বিশ্বাসী। দীর্ঘ নির্বাসন তাকে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে আরও সচেতন করেছে বলেও মনে করছেন অনেকে।
তবে তার সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, নির্বাচনব্যবস্থা, দলীয় ঐক্য এবং জনগণের প্রত্যাশা সবকিছু সামাল দিয়ে তাকে এগোতে হবে। তবুও সমর্থকদের বিশ্বাস, দীর্ঘ অপেক্ষার পর তাঁর প্রত্যাবর্তন বিএনপির জন্য যেমন নতুন আশার সঞ্চার করবে, তেমনি দেশের রাজনীতিতেও সৃষ্টি করবে নতুন গতিধারা।
সব মিলিয়ে, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন এখন শুধু একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এটি দেশের জনগণের আবেগ, প্রত্যাশা ও ভবিষ্যৎ রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত একটি অধ্যায় হয়ে উঠেছে।