এ সরকারের মেয়াদেই বিচার সম্পন্ন করা হবে : স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা
ফয়সালকে পালাতে সহায়তাকারী দুই ভারতীয় গ্রেপ্তার : ডিএমপি
হাদি হত্যাকাণ্ডে ভারতে কেউ গ্রেপ্তার হয়নি : মেঘালয় পুলিশ
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদির হত্যার বিচারের দাবিতে ফের শাহবাগ মোড় অবরোধ করেছেন মঞ্চের নেতাকর্মীরা। এর ফলে সড়কটি দিয়ে যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। শুধুমাত্র অ্যাম্বুলেন্সকে যাতায়াতের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
গতকাল রোববার দুপুর থেকে শহরের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে জড়ো হতে শুরু করেন ছাত্র-জনতা। ধীরে ধীরে মানুষে পূর্ণ হয়ে ওঠে শাহবাগ এলাকা। সবাই স্লোগানে-স্লোগানে উত্তাল করে তুলছেন পুরোএলাকা।
এ সময় ‘এ লড়াইয়ে জিতবে কারা, হাদির সৈনিকেরা’, ‘নারায়ে তাকবীর, আল্লাহু আকবার’, ‘ইনকিলাব ইনকিলাব, জিন্দাবাদ-জিন্দাবাদ’, ‘শাহবাগ না ইনসাফ, ইনসাফ-ইনসাফ’, ‘তুমিও জানো, আমিও জানি, শাহবাগীরা হিন্দুস্তানি’ সহ নানা স্লোগান দেন।
এর আগে গতকাল রোববার দুপুর ২টা থেকে সারা দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে সর্বাত্মক অবরোধ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছিল ইনকিলাব মঞ্চ।
সংগঠনের সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল জাবের গত শনিবার রাতে শাহবাগের অবস্থান কর্মসূচি থেকে এ ঘোষণা দেন। পরে ইনকিলাব মঞ্চের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে জানানো হয়, ডিএমপি কমিশনারের সংবাদ সম্মেলন পর্যালোচনার পর গতকাল রোববার দুপুর ২টা থেকে ঢাকাসহ ৮ বিভাগে অবরোধ কর্মসূচি চলবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদেই হাদি হত্যার বিচার সম্পন্ন করা হবে : স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী গতকাল রোববার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত কোর কমিটির সভা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদেই শহীদ হাদি হত্যার বিচার সম্পন্ন করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। এ সময় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, হাদি হত্যা মামলা চলাকালীন এ যাবত ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তাররা হলেন- ঘটনার মূল হোতা ফয়সাল করিম মাসুদের বাবা হুমায়ুন কবির, মা হাসি বেগম, স্ত্রী শাহেদা পারভীন সামিয়া, শ্যালক ওয়াহিদ আহমেদ শিপু, গার্লফ্রেন্ড মারিয়া আক্তার লিমা, মো. কবির, নুরুজ্জামান নোমানী ওরফে উজ্জ্বল, সিবিয়ন দিও, সঞ্জয় চিসিম, মো. আমিনুল ইসলাম রাজু ও মো. আব্দুল হান্নান।
তিনি আরও বলেন, গ্রেপ্তারদের মধ্যে ৬ জন ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে এবং ৪ জন সাক্ষীও ১৬৪ ধারায় সাক্ষ্য প্রদান করেছে।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জব্দকৃত উল্লেখযোগ্য আলামতসমূহ হলো্ত হত্যাকাণ্ডে ব্যবহূত দুইটি বিদেশি পিস্তল, ৫২ রাউন্ড গুলি, ম্যাগাজিন ও ছোরা, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহূত মোটরসাইকেল ও ভুয়া নম্বর প্লেট, ঘটনাস্থল থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহূত গুলির খোসা, বুলেট, ভিডিওচিত্র সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্য আলামত এবং প্রায় ৫৩টি একাউন্টের মোট ২১৮ কোটি টাকার স্বাক্ষরিত চেক। তিনি আরও বলেন, এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে কারা জড়িত রয়েছে, তা উদঘাটনের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের জোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, গ্রেপ্তারদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য, সাক্ষীদের জবানবন্দি ও উদ্ধারকৃত আলামত পর্যালোচনা ও সার্বিক বিবেচনায় মামলাটির তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আগামী ১০ দিনের মধ্যে (৭ জানুয়ারি ২০২৬) এ মামলার চার্জশিট দেয়া সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ফয়সালকে পালাতে সহায়তাকারী দুই ভারতীয় গ্রেপ্তার : ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ ওসমান হাদির হত্যার ঘটনায় সরাসরি জড়িত দুই সহায়তাকারীকে ভারতের মেঘালয় পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।
এছাড়া ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের মামলার প্রধান অভিযুক্ত ফয়সাল দেশ ছেড়ে পালিয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম।
গতকাল রোববার সকালে রাজধানীর মিন্টু রোডে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য জানান।
সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) এস এন মো. নজরুল ইসলাম জানান, ঘটনার দিনই হাদিকে গুলি করা ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ ওরফে রাহুল এবং মোটরসাইকেলচালক আলমগীর শেখকে শনাক্ত করা হয়। তাদের গ্রেপ্তারে তাৎক্ষণিকভাবে সাভার, হেমায়েতপুর, আগারগাঁও ও নরসিংদীতে একাধিক অভিযান চালানো হয়।
ধারাবাহিক অভিযানের অংশ হিসেবে ডিএমপির একটি টিম ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্তবর্তী এলাকা পর্যন্ত অভিযান পরিচালনা করে।
ডিএমপির এই কর্মকর্তা বলেন, মামলার তদন্ত দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে এবং আগামী ৭ থেকে ৮ দিনের মধ্যে এ হত্যাকাণ্ডের মামলার অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হবে।
তিনি বলেন, তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পর ফয়সাল ও আলমগীর ঢাকা থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে আমিনবাজার যান। পরে সেখান থেকে মানিকগঞ্জের কালামপুর হয়ে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী একটি প্রাইভেটকারে করে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে পৌঁছান। আসামিদের আনুষ্ঠানিকভাবে চিহ্নিত করার আগেই তারা সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়।
নজরুল ইসলাম আরও জানান, হালুয়াঘাটের আগে মুন ফিলিং স্টেশনে ফিলিপ ও সঞ্জয় নামে দুই ব্যক্তি তাদের সীমান্ত পার করানোর জন্য অপেক্ষা করছিল। সীমান্ত পার হওয়ার পর ফিলিপ তাদের ভারতের মেঘালয় রাজ্যে ‘পুত্তি’ নামে এক ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করে। পরে পুত্তি ট্যাক্সিচালক ‘সামী’ এর মাধ্যমে তাদের মেঘালয়ের তুরা এলাকায় পৌঁছে দেয়।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, আমরা অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলে মেঘালয় পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানতে পেরেছি, তারা ইতোমধ্যে পুত্তি ও সামীকে গ্রেপ্তার করেছে। আমরা ধারণা করছি, আসামিরা অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করেছে।
এ পর্যন্ত এই ঘটনায় মোট ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানান তিনি। জব্দকৃত আলামতের মধ্যে রয়েছে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহূত দুটি বিদেশি পিস্তল, ৫২ রাউন্ড গুলি, ম্যাগাজিন, ছোরা, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহূত মোটরসাইকেল, ভুয়া নম্বরপ্লেট, হাদিকে বহনকারী অটোরিকশা এবং ৫৩টি অ্যাকাউন্টের বিপরীতে ২১৮ কোটি টাকার স্বাক্ষরিত চেক।
তিনি বলেন, গ্রেপ্তারদের মধ্যে ছয়জন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন এবং চারজন সাক্ষী ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
আগামী ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে চার্জশিট দাখিল করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। হাদির হত্যাকারীরা ভারতে পালিয়েছে এ বিষয়ে নজরুল ইসলাম বলেন, আমরা গ্রেপ্তারকৃতদের অভিযুক্তদের ছবি দেখিয়েছি। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, মূল অভিযুক্তরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে।
হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কারা রয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মূল আসামিকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হলে পুরো বিষয়টি আরও পরিষ্কার হতো। আমাদের কাছে কিছু তথ্য রয়েছে, তবে তদন্তের স্বার্থে এখনই নাম প্রকাশ করা যাচ্ছে না। আমাদের ধারণা, ৫ আগস্টের পর হাদি যেভাবে ভোকাল ছিল এবং একটি আদর্শকে ধারণ করেছিল, সেই আদর্শ বা ওই সময় ক্ষতিগ্রস্ত কোনো গোষ্ঠী এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে থাকতে পারে।
হত্যাকাণ্ডের মোটিভ সম্পর্কে জানতে চাইলে ডিবি প্রধান ও অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা কয়েকজনের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছি। এটি রাজনৈতিক কারণেও হতে পারে। তবে তদন্তের স্বার্থে আপাতত তাদের নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না।
আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে নজরুল ইসলাম বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বন্দি বিনিময় চুক্তি রয়েছে। আমরা আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক উভয়ভাবেই আসামিদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি।
হাদি হত্যাকাণ্ডে ভারতে কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি : বাংলাদেশে ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে ভারতে কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি বলে দাবি করেছে মেঘালয় পুলিশ। শুধু তা-ই নয়, ফয়সাল সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে ঢুকেছে, তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে দাবি করা হয়েছে। মেঘালয় পুলিশের বরাত দিয়ে এসব তথ্য জানিয়েছে হিন্দুস্তান টাইমস।
মেঘালয় পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিন্দুস্তান টাইমসকে বলেন, ‘বাংলাদেশ পুলিশের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগাযোগ করা হয়নি প্রতিবেদনে উল্লিখিত কোনো অভিযুক্তকে গারো পাহাড়ে খুঁজে পাওয়া যায়নি। গ্রেপ্তারও হয়নি।’
মেঘালয় পুলিশকে সমর্থন করে বিবৃতি দিয়েছে বিএসএফের (মেঘালয় ফ্রন্টিয়ার) প্রধান ওপি উপাধ্যায়। তিনি বলেন, ‘হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে সন্দেহভাজনদের মেঘালয়ে প্রবেশের কোনো প্রমাণ নেই।
বিএসএফ এ ধরনের কোনো ঘটনা সম্পর্কে অবগত নয়। এই দাবিগুলো ভিত্তিহীন এবং বিভ্রান্তিকর।’
এর আগে ইলকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদি হত্যার মূল সন্দেহভাজন ফয়সাল করিম ওরফে দাউদ খানের দুই সহযোগীকে ভারতে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে দাবি করেছে ডিএমপি। গতকাল রোববার সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিএমপি) এস এন মো. নজরুল ইসলাম জানান, ‘ইনফরমাল চ্যানেলের মাধ্যমে মেঘালয় পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে জানা যায়- পুত্তি এবং তার স্বামীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আজকের সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির নজরুল ইসলাম বলেন, ‘তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জবানবন্দি বিশ্লেষণে দেখা যায়- ফয়সাল ও আলমগীর ঘটনাস্থল থেকে ঢাকা থেকে সিএনজি করে আমিনবাজারে যান। পরে তারা মানিকগঞ্জের কালামপুরে পৌঁছান এবং সেখানে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী একটি প্রাইভেটকারে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে পৌঁছান।’
তিনি আরো জানান, হালুয়াঘাটে পৌঁছানোর আগে মুন ফিলিং স্টেশনে ফিলিপ এবং সঞ্জয় তাদের গ্রহণের জন্য অপেক্ষা করছিল। ফিলিপ তাদের সীমান্ত পার করে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের জনৈক পুত্তির কাছে পৌঁছে দেন। পুত্তি এরপর তাদের এক ট্যাক্সি ড্রাইভার সামির কাছে হস্তান্তর করেন। ওই ট্যাক্সি ড্রাইভার তাদের মেঘালয়ের পুরা নামক একটি শহরে পৌঁছে দেন।
অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার বলেন, ‘ইনফরমাল চ্যানেলের মাধ্যমে মেঘালয় পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে জানা যায়- পুত্তি এবং তার স্বামীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘পুলিশ সন্দেহ করছে আসামিরা অবৈধ পথে সীমান্ত পার হয়েছেন।’
তবে মেঘালয় পুলিশ এবং বিএসএফ জানিয়েছে, তারা সব সময় বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সহযোগিতা করতে উন্মুক্ত। পাশাপাশি জানানো হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতি বিচার করে সীমান্তে নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। যেকোনো রকমের অনুপ্রবেশ আটকানো হচ্ছে।
রাজশাহীতে ওসমান হাদি হত্যার বিচার দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ : শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার দাবিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) প্রধান ফটকের সামনে রাজশাহী-নাটোর মহাসড়ক অবরোধ করে অবস্থান কর্মসূচি ও বিক্ষোভ করেছেন ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মী ও শিক্ষার্থীরা।
গতাকল রোববার রাবির মেন গেট এলাকায় এ কর্মসূচি শুরু হয়। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারী মহাসড়কের ওপর অবস্থান নিয়ে টায়ারে আগুন জ্বালান। পরে তারা বিভিন্ন স্লোগান দেন এবং সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন।
বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করেন, শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখনো পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান প্রশাসনিক বা বিচারিক অগ্রগতি নেই। এতে বিচারহীনতার সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হচ্ছে বলে তারা মন্তব্য করেন। দ্রুত সময়ের মধ্যে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় না আনা হলে আন্দোলন আরও কঠোর করার হুঁশিয়ারিও দেন তারা।
অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীরা বলেন, ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত রাজপথের আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। প্রশাসনের নীরব ভূমিকার প্রতিবাদ জানিয়ে তারা অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার দাবি জানান। এসময় মহাসড়ক অবরোধের ফলে রাজশাহী-নাটোর সড়কে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এতে সড়কে চলাচলকারী সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তিতে পড়ে।
অন্যদিকে একই দাবিতে নগরীর তালাইমারী এলাকাতেও মহাসড়ক অবরোধ করে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন জুলাই যোদ্ধা ও এনসিপির নেতাকর্মীরা। আন্দোলনকারীরা জানান, ইনকিলাব মঞ্চের কেন্দ্রীয় ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত মহাসড়ক অবরোধ করে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাবেন তারা।
হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক অবরোধ : ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদি হত্যার বিচারের দাবিতে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক অবরোধ করেছে বরিশালের ছাত্র-জনতা।
গতকাল রোববার বিকাল ৩টায় বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে বরিশাল নগরীর নথুল্লাবাদ মোড়ে অবস্থান নেন তারা। এতে বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়।
মহাসড়ক অবরোধ কর্মসূচিতে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ইনকিলাব মঞ্চ, ব্রজমোহন কলেজ, সরকারি সৈয়দ হাতেম আলী কলেজ, বরিশাল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত বিকেল ৪টা ১৫ মিনিটেও মহাসড়কটি অবরুদ্ধ ছিল।
এ সময় বিক্ষোভকারীরা ‘নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার’, ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’, ‘এক হাদি লোকান্তরে, লক্ষ হাদি লড়াই করে’, ‘বিচার চাই, হাদি হত্যার বিচার চাই’, ‘লীগ ধর, জেলে ভর’, ‘আমার ভাই মরলো কেন, ইন্টেরিম জবাব দে’, ‘আপস না সংগ্রাম, সংগ্রাম সংগ্রাম’, ‘গোলামি না আজাদী, আজাদী আজাদী’সহ নানা স্লোগান দেন।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক আতিক আবদুল্লাহ বলেন, “হাদি বাংলার সাধারণ মানুষের মাঝে এক অনন্য সাধারণ ব্যক্তিত্ব। হাদি হত্যার বিচার নিশ্চিত করার জন্য আমাদের এই অবরোধ শুধু আজকের জন্য নয়। বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমরা লড়ে যাব। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে যতদূর যাওয়া প্রয়োজন, ততদূর যেতে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ইনকিলাব মঞ্চ ও বরিশালবাসী প্রস্তুত, ইনশাআল্লাহ।”
আন্দোলনকারী মহসিন উদ্দিন বলেন, আমাদের একটাই দাবি- অনতিবিলম্বে হত্যাকারী ও হত্যা ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। বিচার না পাওয়া পর্যন্ত আমাদের এই আন্দোলন চলবেই।”
গাজীপুরে বিচারের দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ : গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার মাওনা চৌরাস্তা এলাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে শহীদ শরীফ ওসমান হাদির হত্যার বিচার দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ ও মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
গতকাল রোববার দুপুর আড়াইটার দিকে শুরু হওয়া এ কর্মসূচি টানা প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী চলে। বিক্ষোভকারীরা মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ এ পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে ন্যায়বিচারের স্লোগানে মুখর করে তোলেন এলাকা। তাদের একটাই দাবি হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।
অবরোধের ফলে কিছু সময়ের জন্য ঢাকা ও ময়মনসিংহমুখী যান চলাচল স্থবির হয়ে পড়ে। সড়কের দুই পাশে তৈরি হয় দীর্ঘ যানজট। চরম ভোগান্তিতে পড়েন কর্মজীবী মানুষ, নারী ও শিশুসহ দূরপাল্লার যাত্রীরা।
বিক্ষোভকারীরা ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, শহীদ শরীফ ওসমান হাদি ছিলেন একজন নিরপরাধ মানুষ। তার নির্মম হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো সমাজকে নাড়া দিয়েছে। অথচ দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও বিচারে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। বাধ্য হয়েই তারা রাজপথে নেমেছেন।
সিলেটে সড়ক অবরোধ: ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদিকে হত্যার দ্রুত বিচারের দাবিতে সিলেটে দ্বিতীয় দিনের মতো সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করছে ইনকিলাব মঞ্চ।
গতকাল রাববার দুপুরে নগরীর চৌহাট্টায় সংগঠনটির সিলেট ও শাহজালাল বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যানারে এ বিক্ষোভ শুরু করা হয়। এর আগে শনিবারও একই স্থানে দুপুর থেকে রাত পর্যন্ত বিক্ষোভ করে ইনকিলাব মঞ্চ।
অবরোধ কর্মসূচিতে আসা শিক্ষার্থী মীর লুৎফুর বলেন, “শহীদ শরীফ ওসমান হাদি ভাই ছিলেন আধিপত্যবাদবিরোধী আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী। তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।”
সরকার এই হত্যার বিচারে টালবাহানা করছে বলে অভিযোগ তুলে বক্তারা বলেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হলে এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে।
আগামী তিন দিনের মধ্যে চার্জশিট ও ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার কাজ সম্পন্ন করতে হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন নেতাকর্মীরা। বিচারিক কার্যক্রম ত্বরান্বিত না হওয়ার আগ পর্যন্ত রাজপথে তাদের অবস্থান অব্যাহত থাকবে বলেও জানান বক্তারা।