দুই হাজারেও  মিলছে না ১২ কেজির সিলিন্ডার

এলপি গ্যাসের তীব্র সংকট

ইলিয়াস হোসাইন রিফাত প্রকাশিত: জানুয়ারি ৩, ২০২৬, ০৮:৩৫ পিএম
  • লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধিতে দিশেহারা ভোক্তা
  • বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার প্রভাবে ভোগান্তিতে সাধারণ গ্রাহক

দেশের বাজারে তরলিকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সংকট এখন চরমে। গৃহস্থালিতে রান্নার কাজে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম গত দুই সপ্তাহে অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে।

সরকার নির্ধারিত দামের তোয়াক্কা না করে ১ হাজার ২০০ টাকার সিলিন্ডার বর্তমানে বাজারে ১ হাজার ৯০০ টাকা থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে- এমনকি অনেক এলাকায় এই চড়া দাম দিয়েও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত গ্যাস। ফলে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ গ্রাহকরা।

রাজধানীর লালবাগ, ধানমন্ডি, কামরাঙ্গীরচর, হাজারীবাগ এলাকার ভোক্তারা অভিযোগ করেছেন, গত এক সপ্তাহ ধরে ধারাবাহিকভাবে গ্যাসের দাম বাড়ছে, কিন্তু সরকারিভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না। অতি মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সাধারণ মানুষের পকেট কাটছেন।

রাজধানীর লালবাগ এলাকার গৃহিণী সুলতানা বেগম বলেন, “গ্যাসের দাম একদিনের ব্যবধানে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেড়ে যাচ্ছে। এখন ২ হাজার টাকা চাইলেও দোকানদার বলছে গ্যাস নেই। আমাদের মতো মধ্যবিত্তদের রান্নাই এখন দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।”

এ বিষয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ধানমন্ডির গৃহিণী রোমানা আফরোজা, ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী শামসুল আলম। তারা জানান, একদিকে বাজারে সবজির দাম চড়া, তার ওপর গ্যাসের এই মূল্যবৃদ্ধি তাদের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলেছে।

রফিকুল ইসলাম বলেন, “সারা দিন কাজ করে যা আয় করি, তার বড় অংশই যদি গ্যাস কিনতে শেষ হয়ে যায়, তবে পরিবার নিয়ে খাব কী?”

অপরদিকে খুচরা বিক্রেতারা এই সংকটের জন্য বড় কোম্পানিগুলোর সরবরাহ ঘাটতিকে দায়ী করছেন।

তাদের দাবি, শীতের মৌসুমে বিশ্ববাজারে এলপিজির চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় আমদানিতে প্রভাব পড়েছে। বর্তমানে দেশের বেশিরভাগ বড় কোম্পানি সরবরাহ প্রায় বন্ধ রেখেছে। হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানি যে সামান্য পরিমাণ সরবরাহ দিচ্ছে, সেগুলো অনেক বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। পাইকারি পর্যায়ে বেশি দামে কেনার কারণেই খুচরা বাজারে এর প্রভাব পড়ছে বলে জানান তারা।

২০২১ সালের এপ্রিল মাস থেকে প্রতি মাসে এলপিজির আন্তর্জাতিক মূল্যের সাথে সমন্বয় করে দেশীয় বাজারে দাম নির্ধারণ করে আসছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।

বর্তমান সংকট সম্পর্কে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানান, মূলত লজিস্টিক সমস্যা ও জাহাজ সংকটে গ্যাসের আমদানি গত মাসের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে। এর ফলে বাজারে একটি শূন্যতা তৈরি হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, “বাড়তি দামের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। আমরা মাঠ পর্যায়ে তদারকি জোরদার করার জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে নির্দেশনা দিয়েছি। যারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।”

জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল তদারকি নয়, এলপিজি আমদানিতে বেসরকারি খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমানো এবং সরকারি মজুত সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। অন্যথায় প্রতি বছর শীতের শুরুতে এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।

বর্তমানে রাজধানীর বাইরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও এই সংকটের প্রভাব পড়েছে। সাধারণ মানুষ দ্রুত এই সংকটের সমাধান এবং গ্যাসের দাম সরকারি নিয়ন্ত্রণে রাখার জোর দাবি জানিয়েছেন।