খাদ্যনিরাপত্তায় বাড়ছে ঝুঁকি

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: জানুয়ারি ৬, ২০২৬, ১১:১৯ পিএম
  • অর্থনৈতিক মন্দা ও দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির ফলে মানুষের আয় কমেছে, বেড়েছে খাদ্য ক্রয়ের চাপ
  • বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও লবণাক্ততা কৃষি উৎপাদন ব্যাহত করছে। পাশাপাশি খাদ্যবৈচিত্র্যের অভাব পুষ্টিহীনতা বাড়াচ্ছে

বাংলাদেশে খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আর ভবিষ্যতের শঙ্কা নয়, এটি এখন চলমান বাস্তব সংকট। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, দেশের প্রায় এক কোটি ৫৫ লাখ মানুষ বর্তমানে খাদ্যসংকটে ভুগছে, যা বিশ্লেষিত জনসংখ্যার প্রায় ১৬ শতাংশ। একই সঙ্গে প্রায় ১৬ লাখ শিশু মারাত্মক অপুষ্টির ঝুঁকিতে রয়েছে। এই পরিস্থিতি কেবল মানবিক সংকটই নয়, বরং দেশের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার জন্যও গুরুতর হুমকি হয়ে উঠছে।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে উপকূলীয় ও পাহাড়ি অঞ্চলগুলো। পাশাপাশি কক্সবাজার ও ভাসানচরে বসবাসরত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। কক্সবাজার জেলায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রায় ৩০ শতাংশ এবং রোহিঙ্গাদের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ খাদ্যসংকটে রয়েছে। বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হলো রোহিঙ্গা শিবিরে প্রায় তিন লাখ ৬০ হাজার মানুষ জরুরি খাদ্যসংকটের মধ্যে রয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোর জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিট (এফপিএমইউ) এবং জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), ইউনিসেফ ও বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) যৌথভাবে প্রকাশিত ‘ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি)’ প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে দেশের ৩৬ জেলার ৯ কোটি ৬৬ লাখের বেশি মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টি পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময় খাদ্যসংকটে থাকা মানুষের সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকলেও মে থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে পরিস্থিতি আবারও অবনতির দিকে গেছে। 

বরগুনা, ভোলা, পটুয়াখালী, বান্দরবান, রাঙামাটি, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, সুনামগঞ্জ ও কক্সবাজারে খাদ্যসংকট সবচেয়ে তীব্র আকার ধারণ করেছে। অন্যদিকে নোয়াখালী, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সিলেট কিছুটা উন্নতি করে আইপিসির ধাপ-২ বা ‘চাপের অবস্থা’তে নেমে এসেছে। তবে বাগেরহাট জেলার অবস্থা অবনতি হয়ে ধাপ-৩ অর্থাৎ খাদ্যসংকটে প্রবেশ করেছে, যা বাড়তি উদ্বেগের কারণ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংকটের পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। অর্থনৈতিক মন্দা ও দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির ফলে মানুষের আয় কমেছে, বেড়েছে খাদ্য ক্রয়ের চাপ। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন ও লবণাক্ততা কৃষি উৎপাদন ব্যাহত করছে। পাশাপাশি খাদ্যবৈচিত্র্যের অভাব পুষ্টিহীনতা বাড়াচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তহবিল সংকট, দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন সুবিধা, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

খাদ্য ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যনিরাপত্তা এখন আর কেবল উন্নয়ন আলোচনার বিষয় নয়; এটি একটি জরুরি রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার। তারা জোর দিয়ে বলছেন, খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি শক্তিশালী করার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে পুষ্টিকর খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। দুর্যোগপ্রবণ এলাকাগুলোর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই খাদ্য পরিকল্পনা। একই সঙ্গে জলবায়ু সহনশীল কৃষি ও মৎস্য ব্যবস্থার উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি।

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও আন্তর্জাতিক সহায়তা ও মানবিক তহবিল অব্যাহত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা সতর্ক করে বলছেন, এখনই কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে বছরের শেষ নাগাদ দেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী চরম খাদ্যসংকটে পড়তে পারে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্যে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আইপিসির মতো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিশ্লেষণ কাঠামো ব্যবহার করে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী চিহ্নিত করা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে। সরকার ইতোমধ্যে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে, তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আরও দ্রুত, সমন্বিত ও স্থানীয় বাস্তবতায় উপযোগী পদক্ষেপ প্রয়োজন। 

এই সংকট মোকাবিলায় এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো- কেউ যেন পিছিয়ে না পড়ে। খাদ্য, পুষ্টি ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার, উন্নয়ন সংস্থা, স্থানীয় প্রশাসন এবং নাগরিক সমাজকে একযোগে কাজ করতে হবে। কারণ ক্ষুধার্ত জনগোষ্ঠী শুধু মানবিক বিপর্যয় নয়, এটি দেশের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় হুমকি।