শীতের প্রভাবে উত্তরাঞ্চলে মৃত্যুর মিছিল

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: জানুয়ারি ৭, ২০২৬, ১১:৩৫ পিএম

হিমেল হাওয়া, ঘন কুয়াশা ও মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দেশের উত্তরাঞ্চল। রংপুর বিভাগসহ উত্তরের আটটি জেলার ওপর দিয়ে শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাওয়ায় জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। তীব্র ঠাণ্ডা ও কুয়াশার কারণে প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়েও বেশি শীত অনুভূত হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষ, শিশু ও বয়স্করা।

গত তিন দিনে তীব্র শীত ও ঠাণ্ডাজনিত রোগের প্রকোপে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন আরও এক হাজার ৪২১ জন রোগী।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মেডিসিন ও শিশু ওয়ার্ডে রোগীর চাপ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া, জ্বর ও ঠাণ্ডাজনিত নানা উপসর্গ নিয়ে রোগীরা হাসপাতালে আসছেন। হাসপাতালের মেডিসিন এবং শিশু ওয়ার্ডে রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। 

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান এই তথ্য নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, ঠাণ্ডাজনিত রোগ যেমন নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট এবং ডায়রিয়ার ঘটনা দ্রুত বাড়ছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শিশু এবং বয়স্করা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, রংপুর বিভাগে ঠাণ্ডাজনিত মৃত্যুর হার দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি। এর মূল কারণ হিসেবে দারিদ্র্য এবং ভৌগোলিক অবস্থানের কারণ উল্লেখ করা হয়েছে।

২০০৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বিশ্লেষণে রংপুরে মৃত্যুর সংখ্যা অন্যান্য জেলার তুলনায় সর্বোচ্চ ছিল। হিমালয়ের কোল্ড ফ্রন্টের প্রভাবে ঘটে এসব মারাত্মক ঘটনা ঘটছে। 

শুধুমাত্র ২০২৩-২৪ সালের শীতে উত্তরাঞ্চলে অনুরূপ সংকটে ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছিলেন প্রায় আড়াই লাখ মানুষ। শৈত্যপ্রবাহের কারণে শ্রমজীবী মানুষের আয় কমে গেছে। ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত ঘন কুয়াশায় যান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা কাজ হারাচ্ছেন। 

অনেক এলাকায় খোলা আকাশের নিচে থাকা মানুষগুলো পর্যাপ্ত শীতবস্ত্রের অভাবে চরম কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। শিশু ও বয়স্কদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, উত্তরাঞ্চলে আরও কয়েকদিন শীতের প্রকোপ থাকতে পারে। এ পরিস্থিতিতে চিকিৎসকরা শিশু ও বয়স্কদের উষ্ণ রাখার পরামর্শ দিয়েছেন এবং ঠাণ্ডাজনিত উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে শীতার্ত মানুষের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণের উদ্যোগ নেয়া হলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা এখনও অপ্রতুল। 

চলমান শৈত্যপ্রবাহ উত্তরাঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।