বিবর্তন, সংকট ও টেকসই নগর ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ

মেগাসিটির জীবনরেখা ‘ঢাকা ওয়াসা’

তানজিদ সরওয়ার  প্রকাশিত: জানুয়ারি ১১, ২০২৬, ০২:১৬ পিএম

ঢাকা পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ, যা সর্বমহলে ‘ঢাকা ওয়াসা’ নামে পরিচিত, রাজধানী ঢাকার কোটি কোটি মানুষের কাছে এক অবিচ্ছেদ্য নাম। ১৯৬৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি স্বায়ত্তশাসিত বাণিজ্যিক সংস্থা হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে।

১৮৭৪ সালে নবাব খাজা আব্দুল গণির হাত ধরে চাঁদনীঘাটে যে পানি শোধনাগারের মাধ্যমে এই যাত্রার ভ্রূণ রোপিত হয়েছিল, তা আজ একটি বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় বিশাল অংশে সেবা প্রদান করছে এই সংস্থা।

ঢাকা ওয়াসার মূল চালিকাশক্তি হলো এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), যার দিকনির্দেশনায় কয়েক হাজার কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। প্রতিষ্ঠানটি কেবল একটি সেবামূলক সংস্থাই নয়, বরং ১৯৯৬ সালের ঢাকা ওয়াসা অ্যাক্টের মাধ্যমে এটিকে একটি ব্যবসায়িক মডেলে রূপান্তর করা হয়েছে। এর লক্ষ্য ছিল ভর্তুকি কমিয়ে স্বাবলম্বী হওয়া এবং সেবার মান আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। বর্তমানে পুরো ঢাকা ১০টি ‘সেবা জোনে’ ভাগ করে এর কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়, যাতে স্থানীয় সমস্যাগুলো দ্রুত সমাধান করা সম্ভব হয়।

বর্তমানে ঢাকার জনসংখ্যা তিন কোটি ছাড়িয়েছে। প্রতিদিনের পানির বিশাল চাহিদা মেটাতে ওয়াসা মূলত তিনটি উৎসের ওপর নির্ভর করে ক. ভূগর্ভস্থ পানি (৭০%) : কয়েকশ গভীর নলকূপের মাধ্যমে মাটির নিচ থেকে পানি তোলা হচ্ছে। খ. ভূপৃষ্ঠের পানি বা সারফেস ওয়াটার (৩০%) : মেঘনা ও শীতলক্ষ্যার পানি শোধন করে সরবরাহ করা। গ. বৃষ্টির পানি : যদিও এটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে, তবে আগামীর জন্য বড় পরিকল্পনা রয়েছে।

রিপোর্টে দেখা গেছে, ঢাকা ওয়াসা দীর্ঘকাল ধরে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতি-নির্ভরশীল। ফলে প্রতি বছর ঢাকার পানির স্তর ২ থেকে ৩ মিটার করে নিচে নামছে। বর্তমানে অনেক এলাকায় পানির জন্য ৩০০ মিটারেরও বেশি গভীরতা পর্যন্ত যেতে হচ্ছে। পরিবেশবাদীদের মতে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ঢাকা ভবিষ্যতে বড় ধরনের ভূমিকম্প বা ভূমিধসের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এই সংকট মোকাবিলায় ওয়াসা এখন ‘সারফেস ওয়াটার’ বা নদী থেকে পানি আনার মেগা প্রকল্পগুলোতে জোর দিচ্ছে।

ঢাকার পানি ব্যবস্থাপনার উজ্জ্বল দিকটির উল্টো পিঠে রয়েছে পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার করুণ চিত্র। শহরের মাত্র  ২০% থেকে ২৫% এলাকা সুয়ারেজ নেটওয়ার্কের আওতায় আছে। বাকি বিশাল এলাকার গৃহস্থালি বর্জ্য সরাসরি নদী বা নালায় পড়ছে।

পাগলা শোধন কেন্দ্র : এটিই ঢাকার একমাত্র বড় পয়ঃশোধনাগার, তবে এর ক্ষমতা চাহিদার তুলনায় নগণ্য।

বর্জ্য ও ড্রেনেজ : বৃষ্টির পানি দ্রুত অপসারণ বা ড্রেনেজ ব্যবস্থার দায়িত্বও ওয়াসার ওপর অর্পিত ছিল। তবে সমন্বয়ের অভাব এবং খাল দখলের কারণে জলাবদ্ধতা ঢাকার চিরচেনা দুঃখ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে খালগুলোর দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনের কাছে হস্তান্তরের ফলে নতুন এক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে।

ই-বিলিং ও ডিজিটাল পেমেন্ট : লাইনে দাঁড়িয়ে বিল দেয়ার ভোগান্তি দূর হয়েছে। সিস্টেম লস কমানো : এক সময়ের ৫০% সিস্টেম লস এখন অনেক জোনে ১০-১২% এ নেমে এসেছে।

চ্যালেঞ্জ ও বিতর্ক : নিম্নমানের পানি ও পুরোনো পাইপলাইন সাফল্যের পাশাপাশি ঢাকা ওয়াসার সেবার মান নিয়ে জনমনে ক্ষোভও কম নয়। গ্রীষ্মকালে অনেক এলাকায় তীব্র পানি সংকট দেখা দেয়। আবার সরবরাহ লাইনে লিকেজ বা পুরনো জং ধরা পাইপের কারণে কলের পানিতে দুর্গন্ধ ও ময়লা আসার অভিযোগ পাওয়া যায় নিয়মিত।

সংস্থাটির দাবি অনুযায়ী পানি পানের উপযুক্ত হলেও নিরাপদ থাকার তাগিদে রাজধানীর ৯৫% মানুষ পানি ফুটিয়ে বা দামি ফিল্টার ব্যবহার করে পান করে। এতে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ জ্বালানি গ্যাস ও অর্থের অপচয় হয়।

আগামীর পরিকল্পনা : ঢাকার চারপাশে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও শীতলক্ষ্যা নদী থাকলেও এগুলোর পানি এতটাই দূষিত যে তা শোধন করা প্রায় অসম্ভব। তাই ঢাকা ওয়াসা বর্তমানে বহুদূর থেকে পানি আনার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।

পদ্মা-যশলদিয়া প্রকল্প : মুন্সীগঞ্জের লৌহজং থেকে পদ্মা নদীর পানি এনে শোধন করে ঢাকায় সরবরাহ করা।

সায়েদাবাদ ফেজ-৩ ও গন্ধবপুর প্রকল্প : মেঘনা নদী থেকে পানি এনে বিশুদ্ধ করা। এটির   লক্ষ্য হলো ২০৩০ সালের মধ্যে ৭০% পানি নদী থেকে সরবরাহ করা, যাতে মাটির নিচের পানির ওপর চাপ কমে।

ব্যবস্থাপনা ও জনবল : ঢাকা ওয়াসার প্রতিটি জোনে প্রকৌশলী, লাইনম্যান এবং টেকনিশিয়ানদের সমন্বয়ে একটি টিম কাজ করে। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কঠোর তত্ত্বাবধানে প্রতিষ্ঠানটিকে একটি দক্ষ বাণিজ্যিক সংস্থা হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।

টেকসই নগরীর স্বপ্ন : একটি আধুনিক মেগাসিটির স্থায়িত্ব নির্ভর করে তার পানি ব্যবস্থাপনার ওপর। ঢাকা ওয়াসা কেবল পানি বিক্রি করার একটি সংস্থা নয়, এটি কোটি মানুষের জীবন বাঁচিয়ে রাখার একটি আস্থার প্রতীক। যদিও দুর্নীতি ও সেবার মান নিয়ে সমালোচনা রয়েছে, তবুও তাদের ভবিষ্যৎমুখী পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন হলে ঢাকা আগামীতে একটি জলাবদ্ধতামুক্ত এবং বিশুদ্ধ পানির প্রাচুর্যময় শহর হবে। নদীগুলোকে দূষণমুক্ত রাখা এবং নাগরিকদের সচেতন হওয়া এই দুইয়ের মেলবন্ধন ছাড়া ওয়াসার একার পক্ষে এই পাহাড়সম কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব নয়।