নতুন করে কৃত্তিম সংকট সৃষ্টি করে নির্ধারিত মূল্যের প্রায় দ্বিগুণে বিক্রি করা হচ্ছে এলপিজি গ্যাস। ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে দেশজুড়ে তীব্র সংকটে পড়েছে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি)। বাসাবাড়ির রান্না থেকে শুরু করে পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসা- সবখানেই এলপিজির ওপর নির্ভরশীল মানুষেরা পড়েছেন চরম ভোগান্তিতে।
সরকারি নির্ধারিত মূল্য ১ হাজার ৩০০ টাকার একটি এলপিজি সিলিন্ডার কিনতে গ্রাহকদের গুনতে হচ্ছে ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত। কোথাও কোথাও আরও বেশি দামও দাবি করা হচ্ছে। ডিসেম্বরে চাহিদার বিপরীতে প্রায় ৪০ শতাংশ কম আমদানি হওয়ায় এই সংকটের মূল উৎস।
গত ৮ জানুয়ারি বিভিন্ন দাবি তুলে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড সারা দেশে এলপিজি সরবরাহ ও বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দেয়। এতে হঠাৎ করেই বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। ওই দিনই সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠকের পর সংগঠনটি তাদের কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়।
তবে বাস্তবে তার কোনো ইতিবাচক প্রভাব বাজারে পড়েনি। সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার কথা থাকলেও সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। অনেক এলাকায় দোকানে দোকানে ঘুরেও সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ একই দোকান থেকে কয়েক ঘণ্টা পর ফোন করলে প্রায় দ্বিগুণ দামে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে গ্যাস। বাস্তবে বাজারে যেন সিলিন্ডার গ্যাস ‘চোরাই পণ্য’-তে পরিণত হয়েছে।
প্রকাশ্যে দোকানে গ্যাস নেই বলা হলেও গোপনে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলেই অতিরিক্ত দামে ঠিকই পাওয়া যাচ্ছে এলপিজি সিলিন্ডার। এতে করে প্রশ্ন উঠছে, এই সংকট কি প্রকৃত, নাকি পরিকল্পিত?
সরেজমিন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ খুচরা দোকানে সারি সারি খালি সিলিন্ডার সাজানো রয়েছে। দোকানিরা বলছেন, “গ্যাস নেই”, “সাপ্লাই বন্ধ”, কিংবা “আজকে আসবে না”। কিন্তু একই দোকানে অন্য এক ক্রেতা ফোন করলে দামাদামি করে গ্যাস পাওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে।
মিরপুর ২ এ এক গৃহিণী বলেন, “দোকানে গেলে বলে গ্যাস নাই। কিন্তু বাসা থেকে ফোন করলে বলে ২ হাজার ২০০ টাকা দিলে দিয়ে যাবে। এই গ্যাস তাহলে আসে কোথা থেকে?”
অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, দোকানের সামনেই ভ্যানে করে বা অন্য কোনো অজ্ঞাত স্থান থেকে সিলিন্ডার এনে দেয়া হচ্ছে। এতে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, বাজারে গ্যাসের মজুত আছে, কিন্তু তা কৃত্রিমভাবে আড়াল করে রাখা হচ্ছে।
ঢাকার আগারগাও এর নতুন রাস্তায় চায়ের ফুডকার্ট চালান হৃদয়। তার সাথে কথা হয় আমার সংবাদ প্রতিবেদকের। হৃদয় জানান, তার প্রতি দুই দিন পর একটি করে সিলিন্ডার প্রয়োজন হয়। দোকানে গেলে পাওয়া যায় না। কিন্তু ৭০০-৮০০ টাকা বাড়িয়ে দিলে ঠিকই তখন সিলিন্ডার দেয়া হচ্ছে। ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি একটি সুস্পষ্ট কৃত্রিম সংকট। মূল উদ্দেশ্য অতিরিক্ত মুনাফা আদায়।
সংকট শুরুর পর এখন পর্যন্ত বাজার তদারকিতে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়েনি। কোথাও কোথাও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান হলেও তা পরিস্থিতি সামাল দিতে যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন ভোক্তারা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলপিজির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জ্বালানি পণ্যের ক্ষেত্রে কঠোর নজরদারি ও মজুত পরিস্থিতির স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ জরুরি। না হলে কৃত্রিম সংকট বারবার ফিরে আসবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ।
রান্নার বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়েই তারা অতিরিক্ত দাম দিয়ে গ্যাস কিনছেন। অনেকে আবার ধার করে বা বাকিতে সিলিন্ডার নিচ্ছেন। ভোক্তাদের প্রশ্ন সরকারি ঘোষণা আর বাস্তবতার এই ফারাক কেন? যদি সত্যিই সরবরাহ স্বাভাবিক থাকে, তাহলে বাজারে গ্যাস মিলছে না কেন? আর যদি সংকট থাকে, তবে তার দায় কে নেবে?
এলপিজি সংকটের এই চিত্র স্পষ্ট করে দিয়েছে, নিয়ন্ত্রণহীন বাজার ও দুর্বল তদারকির সুযোগে কীভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে। সংকট নিরসনে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভোগান্তি আরও বাড়বে এমন আশঙ্কাই করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে দেশে চলমান এলপিজি সংকট ও বাজার অস্থিরতা সামাল দিতে সরকারি পর্যায়ে সরাসরি গ্যাস আমদানির পথে হাঁটছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। সরকার থেকে সরকার (জিটুজি) ভিত্তিতে এলপিজি আনার অনুমতি চেয়ে গত ১০ জানুয়ারি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে সংস্থাটি।
বর্তমানে এলপিজি বাজার প্রায় পুরোপুরি বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকায় খুচরা দামের ওপর সরকারের কার্যকর নজরদারি নেই। এতে সরবরাহ ঘাটতি ও অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির অভিযোগ বাড়ছে। বিপিসি বলছে, বেসরকারি আমদানিতে জটিলতার সুযোগ নিয়ে কোথাও কোথাও কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে। সরকারি আমদানির মাধ্যমে বাজারে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা ও ভোক্তা সুরক্ষাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।