একটি উন্নত, সমৃদ্ধ এবং বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার প্রধান অন্তরায় হলো দুর্নীতি। এ সামাজিক ব্যাধি নির্মূল করে রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক।
‘দুর্নীতি করলে ছাড় নেই’, এ কঠোর বার্তাকে ধারণ করে কমিশনের বর্তমান চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুল মোমেনের নেতৃত্বে এক ঝাঁক সাহসী ও দেশপ্রেমিক কর্মকর্তা দুর্নীতির বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছেন। কমিশনের চৌকস অনুসন্ধান ও তদন্ত দল থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারক মহলের সমন্বিত প্রচেষ্টায় দেশের অপরাধ জগতে এখন বিরাজ করছে এক প্রবল আতঙ্ক।
দুর্নীতি দমন কমিশনের মূল চালিকাশক্তি হলো এর সুসংগঠিত প্রশাসনিক কাঠামো এবং সুযোগ্য নেতৃত্ব। বর্তমানে কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে এক শক্তিশালী দল কাজ করছে।
এ নেতৃত্বে রয়েছেন কমিশনার (তদন্ত) মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী, কমিশনার (অনুসন্ধান) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাফিজ আহ্সান ফরিদ এবং সচিব মোহাম্মদ খালেদ রহীম। কমিশনের প্রশাসনিক ও আইনি কার্যক্রমকে গতিশীল করতে একদল মহাপরিচালক দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন।
তাদের মধ্যে রয়েছেন, লিগ্যাল মহাপরিচালক শাহনাজ সুলতানা, মানি লন্ডারিং মহাপরিচালক মো. মোকাম্মেল হক, প্রশাসন মহাপরিচালক আবু হেনা মোস্তফা জামান, প্রতিরোধ মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন, বিশেষ তদন্ত মহাপরিচালক মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলী, অনুসন্ধান ও তদন্ত মহাপরিচালক মো. মোতাহার হোসেন ও মুহাম্মদ রেজাউল কবীর এবং প্রশিক্ষণ ও তথ্যপ্রযুক্তি মহাপরিচালক আবদুল্লাহ আল জাহিদ। এ শক্তিশালী নীতিনির্ধারক মহলের তত্ত্বাবধানেই পরিচালিত হচ্ছে দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযান।
দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান কাজ হলো সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলা। কমিশনের কাজের পরিধি প্রধানত তিনটি বিশেষ বিভাগে বিভক্ত। প্রথমত, অভিযোগ গ্রহণ ও প্রাথমিক যাচাই। দুদকের হটলাইন ১০৬ কিংবা সরাসরি চিঠির মাধ্যমে আসা হাজারো অভিযোগ থেকে প্রাথমিকভাবে তফসিলভুক্ত অপরাধগুলো বাছাই করা হয়।
কমিশনের দক্ষ কর্মকর্তারা অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে এ প্রাথমিক যাচাই বা স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। দ্বিতীয়ত, অনুসন্ধান ও প্রমাণ সংগ্রহ। যাচাই শেষে শুরু হয় আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান। একজন অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা সন্দেহভাজন ব্যক্তির স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের হিসাব, ব্যাংকিং ট্রানজ্যাকশন এবং অবৈধ আয়ের উৎস খুঁজে বের করেন। এ পর্যায়ে ডিজিটাল ফরেনসিক এবং তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়।
তৃতীয়ত, কঠোর তদন্ত ও চার্জশিট দাখিল। অনুসন্ধানে দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়। এরপর শুরু হয় বিস্তারিত তদন্ত। সাক্ষী গ্রহণ, স্থান পরিদর্শন এবং প্রামাণ্য দলিল সংগ্রহের পর অত্যন্ত নিখুঁতভাবে চার্জশিট প্রস্তুত করা হয় এবং আদালতে দাখিল করা হয়।
কমিশনের চেয়ারম্যানের নির্দেশে যারা মাঠ পর্যায়ে সরাসরি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অভিযান পরিচালনা করেন, তারা হলেন সহকারী পরিচালক, উপ-পরিচালক এবং অনুসন্ধান কর্মকর্তারা। তাদের সাহসিকতার ওপরই নির্ভর করে একটি সফল মামলা। তারা কেবল অফিসিয়াল কাজই করেন না, বরং তথ্যপ্রমাণ হাতে পাওয়া মাত্রই ছদ্মবেশে বা সরাসরি অভিযান পরিচালনা করে অপরাধীদের হাতেনাতে গ্রেপ্তার করেন। আদালতের আইনি জটিলতা মোকাবিলা করতে শক্তিশালী এবং নিখুঁত চার্জশিট প্রস্তুত করা তাদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
তদন্তের স্বার্থে সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তাদের জবানবন্দি গ্রহণ করা তদন্ত কর্মকর্তাদের নিয়মিত কাজের অংশ।
দুর্নীতি দমন কমিশন কেবল দমনেই বিশ্বাসী নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দুর্নীতিমুক্ত করার লক্ষ্যে প্রতিরোধমূলক কর্মকাণ্ডকে সমান গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রতিরোধ মহাপরিচালকের তত্ত্বাবধানে দেশজুড়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা হয়েছে।
দেশের হাজার হাজার স্কুল ও মাদ্রাসায় ‘সততা সংঘ’ গঠন করা হয়েছে। এছাড়া দোকানদারবিহীন ‘সততা স্টোর’ স্থাপনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সততা ও নৈতিকতার চর্চা করানো হচ্ছে। দুর্নীতিবিরোধী জনমত সৃষ্টিতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নিয়মিত বিতর্ক প্রতিযোগিতা, রচনা প্রতিযোগিতা এবং সচেতনতামূলক সেমিনার আয়োজন করা হয়। দুর্নীতির কুফল প্রচার করতে রেডিও, টেলিভিশন এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে দুদকের প্রচার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
দুদকের সফলতার পেছনে পর্দার আড়ালে কাজ করেন অন্যান্য পদের কর্মীরা, বিশেষ করে কনস্টেবল ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা। বড় ধরনের অভিযানের সময় অফিসারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অভিযুক্ত ব্যক্তিকে হেফাজতে রাখা এবং সাক্ষীদের যাতায়াতে সহায়তা করার মাধ্যমে তারা তদন্ত প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাদের কঠোর নজরদারির কারণেই অনেক দুর্ধর্ষ অপরাধী আইন-শৃঙ্খলার হাত থেকে পালানোর সুযোগ পায় না।
আধুনিক বিশ্বে দুর্নীতির অন্যতম বড় মাধ্যম হলো মানি লন্ডারিং বা অর্থ পাচার। দুদকের বিশেষায়িত মানি লন্ডারিং ইউনিট আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে এবং বিদেশে সম্পদ পাচারকারীদের শনাক্ত করতে কাজ করছে। মানি লন্ডারিং মহাপরিচালকের নেতৃত্বে এ ইউনিটটি বিদেশের বিভিন্ন সংস্থার সাথে সমন্বয় করে বড় বড় অর্থনৈতিক কেলেঙ্কারি উন্মোচন করছে।
বিগত বছরগুলোতে দুদকের কার্যক্রম এখন অনেকটাই ডিজিটাল বা পেপারলেস হওয়ার পথে। প্রশিক্ষণ ও তথ্যপ্রযুক্তি মহাপরিচালকের তত্ত্বাবধানে কর্মকর্তাদের আধুনিক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। ই-ফাইলিং সিস্টেমের মাধ্যমে অভিযোগের গতিপথ পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, ফলে কাজের স্বচ্ছতা এবং গতি বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন আজ কেবল একটি সংস্থা নয়, এটি সাধারণ মানুষের আস্থার প্রতীক।
চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুল মোমেনের সুযোগ্য দিকনির্দেশনায় এবং কমিশনারদের অভিজ্ঞতায় এ কমিশন একটি সুসংগঠিত শক্তিতে পরিণত হয়েছে। সহকারী পরিচালক থেকে শুরু করে কনস্টেবল পর্যন্ত প্রতিটি কর্মী আজ দুর্নীতিবিরোধী সম্মুখযোদ্ধা। জনগণের ট্যাক্সের টাকা আত্মসাৎকারী এবং অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়া লুটেরাদের বিরুদ্ধে দুদকের এ জয়যাত্রা অব্যাহত থাকবে।
তবে কেবল দুদকের একার পক্ষে দুর্নীতি নির্মূল করা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন সাধারণ মানুষের সহযোগিতা এবং সামাজিক প্রতিরোধ। দুদক কর্মকর্তাদের সাহসিকতা আর জনগণের সচেতনতা, এ দুইয়ের সমন্বয়েই গড়ে উঠবে আমাদের স্বপ্নের সুখী, সমৃদ্ধ ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ।
ইএইচ