দেশের জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর

তানজিদ সরওয়ার প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৮, ২০২৬, ১১:৫৫ পিএম

একটি সুস্থ ও সবল জাতি গঠনের প্রধান পূর্বশর্ত হলো নিরাপদ পানি এবং উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অধীনে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর এই মহান দায়িত্বটি পালন করে আসছে। 

মূলত ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহী ওয়াসার আওতাভুক্ত এলাকার বাইরে সমগ্র বাংলাদেশের নিরাপদ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য রক্ষায় এই অধিদপ্তর কাজ করে।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কাজের পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত। গ্রামীণ জনপদ থেকে শুরু করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের পৌরসভাগুলোতে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। দেশের প্রতিটি নাগরিকের কাছে বিশুদ্ধ পানি পৌঁছে দেয়া ডিপিএইচই-এর প্রধান কাজ। 

গ্রামীণ ও শহর এলাকায় নিরাপদ পানির উৎস হিসেবে গভীর ও অগভীর নলকূপ স্থাপন, রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং এবং বিভিন্ন পানি শোধনাগার নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা দূরীকরণ এবং পার্বত্য এলাকায় রিং-ওয়েল বা গ্র্যাভিটি ফ্লো সিস্টেমের মাধ্যমে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হচ্ছে।

স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন মানে কেবল ল্যাট্রিন স্থাপন নয়, বরং সামগ্রিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। ডিপিএইচই সেনেটারি লেট্রিন স্থাপনে প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি কঠিন ও তরল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে যাতে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকে। বাংলাদেশের ভূগর্ভস্থ পানির একটি বড় সমস্যা হলো আর্সেনিক। 

ডিপিএইচই নিয়মিতভাবে নলকূপের পানির গুণগত মান পরীক্ষা করে এবং আর্সেনিক আক্রান্ত এলাকায় বিকল্প পানির উৎস (যেমন- পুকুরের বালু ফিল্টার বা পিএসএফ) তৈরি করে। এটি পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধে এক বিশাল মাইলফলক। বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা যে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ডিপিএইচই সম্মুখ সারির যোদ্ধা হিসেবে কাজ করে। মোবাইল ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের মাধ্যমে দুর্গত এলাকায় তাৎক্ষণিক বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ এবং অস্থায়ী স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কার্যক্রম অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হয়। বর্তমানে অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী (রুটিন দায়িত্ব) মো. আবদুল আউয়াল প্রধান কার্যালয় থেকে সমগ্র দেশের পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা তদারকি করছেন। অধিদপ্তরের সাংগঠনিক কাঠামোতে বিভিন্ন বিশেষায়িত বিভাগ রয়েছে— পরিকল্পনা সার্কেল: নতুন নতুন প্রকল্প গ্রহণ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তৈরি। গ্রাউন্ড ওয়াটার সার্কেল: ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা। ভাণ্ডার সার্কেল: মালামাল সংগ্রহ ও বণ্টন নিশ্চিত করা। ফিজিবিলিটি স্টাডি এন্ড ডিজাইন: যে কোনো বড় প্রকল্পের আগে এর সম্ভাব্যতা যাচাই ও নকশা প্রণয়ন। প্রকিউরমেন্ট ম্যানেজমেন্ট: স্বচ্ছতার সাথে সরঞ্জাম ও সেবা ক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা। তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং নির্বাহী প্রকৌশলীরা সরাসরি প্রধান প্রকৌশলীর দিক-নির্দেশনায় এসব কাজ পরিচালনা করেন। মাঠপর্যায়ে উপজেলা সহকারী প্রকৌশলী এবং মেকানিকরা সাধারণ মানুষের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত থেকে সেবা নিশ্চিত করেন।

ডিপিএইচই কেবল অবকাঠামো নির্মাণই করে না, বরং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে (যেমন- ইউনিয়ন পরিষদ) কারিগরি সহায়তা প্রদান করে। প্রতিটি ইউনিয়নে WATSAN (Water & Sanitation) কমিটির মাধ্যমে পানি ও স্যানিটেশন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বাস্তবায়নে ডিপিএইচই দিক-নির্দেশক হিসেবে কাজ করে। 

এছাড়া উপজেলা পর্যায়ে কর্মরত মেকানিকরা সাধারণ জনগণের অকেজো নলকূপ মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে সরাসরি কারিগরি পরামর্শ দিয়ে থাকেন। নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে ডিপিএইচই-এর রয়েছে আধুনিক ল্যাবরেটরি নেটওয়ার্ক। এখানে পানির আর্সেনিক ঘনত্ব, আয়রন, ক্লোরাইড এবং ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়। এটি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা হিসেবে কাজ করে। অবকাঠামো থাকলেও মানুষের সচেতনতা ছাড়া জনস্বাস্থ্য রক্ষা সম্ভব নয়। ডিপিএইচই ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য পরিচর্যা, সঠিক পদ্ধতিতে হাত ধোয়া এবং খোলা পায়খানা বর্জনের বিষয়ে ব্যাপক সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালায়। তারা সাধারণ মানুষকে শিক্ষা দেয় যে, কীভাবে বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করে কলেরা, টাইফয়েড ও ডায়রিয়ার মতো পানিবাহিত রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। 

অধিদপ্তরটি কেবল মাঠ পর্যায়ের কাজই করে না, বরং জাতীয় পর্যায়ে নীতি নির্ধারণে সরকারকে সহায়তা করে। বিশ্বব্যাংক, ইউনিসেফ এবং জাইকার মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে সমন্বয় করে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে সরকারের উচ্চ মহলে রিপোর্ট পেশ করা ডিপিএইচই-এর একটি নিয়মিত ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

পরিশেষে বলা যায়, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর বাংলাদেশের গ্রামীণ ও নগর জীবনের এক নীরব বিপ্লবকারী। আর্সেনিক মুক্ত পানি সরবরাহ থেকে শুরু করে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপে প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের অবদান অপরিসীম। 

প্রধান প্রকৌশলীর সুদক্ষ নেতৃত্বে এবং মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিরলস শ্রমে বাংলাদেশ আজ স্যানিটেশন ও নিরাপদ পানি সরবরাহে অনেক দেশের চেয়ে এগিয়ে। ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অর্থাৎ সবার জন্য নিরাপদ পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ডিপিএইচই-এর ভূমিকা আগামী দিনে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।