‘বিতর্কিত’ গণমাধ্যম কমিশন গঠনের পথে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৯, ২০২৬, ০১:২৭ পিএম

গণমাধ্যম সংস্কারের অঙ্গীকার নিয়ে গঠিত কমিশনের মূল প্রস্তাবনাগুলোকে কার্যত পাশ কাটিয়ে নতুন এক পথে হাঁটছে অন্তর্বর্তী সরকার। গত বছর মার্চ মাসে জমা দেওয়া সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে একটি স্বাধীন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ ‘বাংলাদেশ গণমাধ্যম কমিশন’ গঠনের কথা বলা হলেও, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এখন সংবাদপত্র ও সম্প্রচারমাধ্যমের জন্য আলাদা দুটি কমিশন গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে।

১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বর্তমান সরকারের হাতে সময় আছে আর মাত্র কয়েক দিন। এই সংকীর্ণ সময়ে সাংবাদিকদের মতামতের জন্য মাত্র ৭২ ঘণ্টা সময় দিয়ে খসড়া প্রকাশ করায় প্রশ্ন উঠেছে এটি কি সত্যিই সংস্কার নাকি মেয়াদের শেষে কেবল আইনি দায়বদ্ধতা পূরণ?

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক কামাল আহমেদের নেতৃত্বে গঠিত গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন একটি ‘আমব্রেলা অর্গানাইজেশন’ বা সমন্বিত স্বাধীন সংস্থার প্রস্তাব করেছিল। তাদের পরিকল্পনা ছিল বিদ্যমান প্রেস কাউন্সিল এবং প্রস্তাবিত সম্প্রচার কমিশনকে একীভূত করে একটি শক্তিশালী ‘বাংলাদেশ গণমাধ্যম কমিশন’ গঠন করা, যা হবে সম্পূর্ণ সরকারি নিয়ন্ত্রণমুক্ত।

বিপরীতে, তথ্য মন্ত্রণালয় ‘জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন’ এবং ‘সম্প্রচার কমিশন’ নামে পৃথক দুটি সংস্থা করতে চাচ্ছে। সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ স্পষ্টভাবেই জানিয়েছেন, এই ‘জোড়াতালি’র উদ্যোগে কমিশনের মূল লক্ষ্য অর্জন নিয়ে তিনি সন্দিহান। তাঁর মতে, প্রেস কাউন্সিলকে বহাল রেখে নতুন কমিশন গঠন করলে এখতিয়ার নিয়ে দ্বন্দ্ব বাড়বে এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আরও প্রকট হবে।

তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান অবশ্য মনে করেন না যে আলাদা দুটি কমিশন করলে সমস্যা বাড়বে। তাঁর মতে, আপাতত প্রেস কাউন্সিলকে একীভূত করা না গেলেও জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন সাংবাদিকদের সুরক্ষা ও নৈতিকতার বিষয়টি দেখবে। আর লাইসেন্স প্রদানসহ অন্যান্য কারিগরি বিষয় দেখবে সম্প্রচার কমিশন। সরকারের বাকি মেয়াদের মধ্যেই এই অধ্যাদেশ দুটি পাস করে যাওয়ার ব্যাপারে তিনি আশাবাদী, যদিও বাস্তবসম্মতভাবেই তিনি স্বীকার করেছেন যে বর্তমান মেয়াদে কমিশন গঠন হয়তো সম্ভব হবে না।

বুধবার মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে খসড়া প্রকাশ করে ৩১ জানুয়ারির মধ্যে মতামত চাওয়া হয়েছে। অর্থাৎ দেশের হাজার হাজার সাংবাদিক ও অংশীজনদের একটি জাতীয় পর্যায়ের স্পর্শকাতর আইন পর্যালোচনার জন্য সময় দেওয়া হয়েছে মাত্র তিন দিন। নির্বাচনের মাত্র দুই সপ্তাহ আগে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ চূড়ান্ত করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। কামাল আহমেদের ভাষায়, অন্তর্বর্তী সরকার মেয়াদের শেষ প্রান্তে এসে যেভাবে তড়িঘড়ি করছে, তাতে এই কমিশনের স্বায়ত্তশাসন কতটুকু নিশ্চিত হবে তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে।

গঠন: একজন চেয়ারম্যান ও আটজন সদস্য নিয়ে মোট ৯ সদস্যের কমিশন হবে।

নিয়োগ প্রক্রিয়া: আপিল বিভাগের একজন বিচারপতির নেতৃত্বে ৫ সদস্যের বাছাই কমিটি প্রার্থীদের নাম রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করবে।

যোগ্যতা: সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে কমপক্ষে ২০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।

প্রতিনিধিত্ব: সদস্যদের মধ্যে অন্তত একজন নারী এবং একজন ক্ষুদ্র জাতিসত্তার প্রতিনিধি থাকা বাধ্যতামূলক।

অধ্যাদেশের খসড়ায় সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ (বাক-স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা) সমুন্নত রাখার কথা বলা হয়েছে। কমিশনের কাজ হবে:

আচরণবিধি প্রণয়ন: সাংবাদিকদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের নৈতিকতা ও জবাবদিহির মানদণ্ড তৈরি করা।

সুরক্ষা: সাংবাদিকদের তথ্যসূত্র গোপন রাখার অধিকার, কর্মক্ষেত্রে ন্যায়বিচার এবং শারীরিক ও মানসিক চাপমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা।

পারিশ্রমিক: সাংবাদিকদের সম্মানী ও বেতন কাঠামো বিষয়ে সরকারকে সুপারিশ করা।

বিরোধ নিষ্পত্তি: গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগের বিচার করা এবং প্রয়োজনে ক্ষতিপূরণ বা সংশোধনমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া।

গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের মতে, আলাদাভাবে দুটি কমিশন গঠন করলে সরকারের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা সহজ হয়। সম্প্রচার কমিশন যদি সরাসরি মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকে, তবে লাইসেন্স দেওয়া বা বাতিলের ক্ষমতাটি রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ থেকে যাবে। সংস্কার কমিশনের মূল চাওয়া ছিল গণমাধ্যমকে আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ থেকে বের করে আনা, কিন্তু বর্তমান খসড়া সেই স্বপ্নকে কতটা বাস্তবে রূপ দেবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

গণমাধ্যম সংস্কারের যে প্রত্যাশা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার কাজ শুরু করেছিল, মেয়াদের শেষে এসে সেই প্রক্রিয়ায় এক ধরণের ‘শর্টকাট’ গ্রহণের প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যদি সুপারিশগুলো হুবহু বাস্তবায়ন না করে কেবল নামকাওয়াস্তে দুটি কমিশন গঠন করা হয়, তবে তা হিতে বিপরীত হতে পারে। আগামী ৩১ জানুয়ারির মধ্যে যে মতামতগুলো আসবে, সরকার কি সত্যিই সেগুলো বিবেচনা করার সময় পাবে, নাকি কেবল আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে অধ্যাদেশ জারি করা হবে—সেটিই এখন দেখার বিষয়।

এএন