ঢাকার গুলশানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রধান কার্যালয়ের দিকে যাওয়ার পথে রিকশাচালক আনোয়ার পাগলা যখন মোড় নিলেন, তখন চারপাশ এক অন্যরকম উন্মাদনায় টালমাটাল। তার রিকশার হুডের একপাশে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা এবং অন্যপাশে বিএনপির দলীয় পতাকা। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এই বিজয় তাকে আবেগাপ্লুত করে তুলেছে।
‘লোকেরা আমাকে পাগল বলে কারণ আমি এই দলটিকে আমার জীবনের সবকিছু মনে করি। কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না। আমরা জিতেছি, এখন বাংলাদেশ আরও ভালো হবে,’ গণমাধ্যমকে বলছিলেন আনোয়ার।
আনোয়ারের এই বিশ্বাস কেবল ব্যক্তিগত নয়, বরং এটি সেই লক্ষ লক্ষ মানুষের কণ্ঠস্বর যারা দীর্ঘ দুই দশক পর বিএনপিকে পুনরায় ক্ষমতায় দেখতে চেয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের ভূমিধস বিজয় বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। গত শনিবার নির্বাচন কমিশন থেকে প্রকাশিত গেজেট অনুযায়ী, ৩০০টি আসনের মধ্যে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট ২১২টি আসনে জয়লাভ করেছে। অন্যদিকে, তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হওয়া জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৭৭টি আসন। তবে এই উল্লাসের আড়ালে বিশ্লেষকরা এক গভীর সতর্কবার্তা দিচ্ছেন। তাদের মতে, বিজয় কেবল শুরু; প্রকৃত চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে সামনের দিনগুলোতে।
গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন ও নেতৃত্বের অভিষেক
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের ১৮ মাস পর এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে দেশে ফেরা এবং দীর্ঘ দেড় দশক ধরে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা তারেক রহমান এখন বাংলাদেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে। গত শুক্রবার সমর্থকদের উদ্দেশ্যে দেয়া এক বার্তায় তিনি এই ভালোবাসার জন্য সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং প্রতিশ্রুতি দেন যে, তার সরকার নাগরিকের অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে। বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, ‘তারেক রহমান স্পষ্ট করে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার প্রথম কাজ হবে গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার করা এবং প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।’
জামায়াতের অবস্থান ও নির্বাচনি ফলাফল নিয়ে বিতর্ক
বৃহস্পতিবারের ভোটগ্রহণ মোটের ওপর শান্তিপূর্ণ হলেও জামায়াতে ইসলামী গণনায় ‘অসংগতি’র অভিযোগ তুলেছে। তবে বৃহত্তর স্বার্থে শনিবার তারা নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়েছে। জামায়াতের সমর্থকরা মগবাজার কার্যালয়ে কিছুটা বিষণ্ন থাকলেও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ৭৭টি আসন পাওয়া জামায়াতের জন্য একটি বড় অর্জন, যদিও তাদের প্রত্যাশা আরও বেশি ছিল। জামায়াতের পরাজয়কে দলের সাংগঠনিক দুর্বলতা হিসেবে দেখছেন অনেকে। জার্মানি-প্রবাসী জামায়াত সমর্থক মুয়াজ আবদুল্লাহর মতে, ‘অনেক আসনে জামায়াত সঠিক প্রচার চালাতে পারেনি এবং পোলিং এজেন্টদের উপস্থিতিও পর্যাপ্ত ছিল না।’
উত্তরাধিকার ও আকাঙ্ক্ষার সন্ধিক্ষণ : এবারের নির্বাচন বিএনপির জন্য ছিল শোক ও বিজয়ের এক মিশ্র মুহূর্ত। গত ৩০ ডিসেম্বর দলের দীর্ঘদিনের চেয়ারপারসন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণের পর এটিই ছিল প্রথম নির্বাচন। মা খালেদা জিয়ার উত্তরসূরি হিসেবে তারেক রহমান পুনরায় বিএনপিকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে এনেছেন, যা দলের তৃণমূল কর্মীদের কাছে এক বড় আবেগের বিষয়। গুলশান কার্যালয়ে দাঁড়িয়ে দলীয় কর্মী কামাল হোসেন বলেন, ‘গত ১৫ বছরে আমি ভেবেছিলাম শেখ হাসিনার শাসন কোনোদিন শেষ হবে না। কিন্তু মানুষ আমাদের ম্যান্ডেট দিয়েছে। আমরা আমাদের বাংলাদেশ ফিরে পেয়েছি। তবে আবেগ ছাপিয়ে কামাল হোসেনের কণ্ঠেও ছিল আগামীর দাবি- কর্মসংস্থান ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ।
সামনে যে পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ : বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পর ঢাকা অস্বাভাবিক শান্ত ছিল। এটি ছিল বিএনপির একটি কৌশলী সিদ্ধান্ত্ত- বিজয় মিছিল না করা। কিন্তু এই শান্ত পরিবেশ দীর্ঘস্থায়ী হবে কিনা, তা নির্ভর করছে নতুন সরকারের কর্মদক্ষতার ওপর। রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং ‘জবান’ ম্যাগাজিনের সম্পাদক রেজাউল করিম রনি মনে করেন, বিএনপির এই জয় দক্ষিণপন্থি বা উগ্রবাদী রাজনীতির ঝুঁকি থেকে দেশবাসীকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘আসল পরীক্ষা এখন শুরু হলো। সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা ‘অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র’ গড়ে তোলাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।’ আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ফেলো মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, বিএনপির ট্র্যাক রেকর্ড সবসময় নিষ্কলঙ্ক ছিল না। দুর্নীতি ও দমন-পীড়নের পুরনো অভিযোগগুলো এখনো মানুষের মনে আছে।
তিনি বলেন, ‘জেনারেশন জেড বা তরুণ প্রজন্ম যে সংস্কারের স্বপ্ন দেখেছে, বিএনপিকে তার বাইরে গিয়ে কাজ করতে হবে। যদি নতুন সরকার প্রতিশোধমূলক রাজনীতি বা দমন-পীড়নের পথে হাঁটে, তবে সংস্কারকামীরা হতাশ হবে এবং গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়বে।’
ভূ-রাজনীতি ও আঞ্চলিক সমীকরণ : বিএনপির এই বিজয় আঞ্চলিক রাজনীতির মেরুকরণকেও বদলে দিতে পারে। ভারতের জন্য জামায়াতে ইসলামীর চেয়ে বিএনপি সবসময় বেশি গ্রহণযোগ্য ছিল। কুগেলম্যানের মতে, পাকিস্তান হয়তো জামায়াতের জয় দেখতে চেয়েছিল, তবে বিএনপির সাথেও তাদের ঐতিহাসিক সুসম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে, চীনও বিএনপির সাথে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে। তারেক রহমানের জন্য অন্যতম বড় কাজ হবে ভারতের সাথে সম্পর্কের এক নতুন ভারসাম্য তৈরি করা, যাতে দেশের জাতীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ন না হয়।
নতুন ভোরের প্রত্যাশা : গুলশান কার্যালয়ে নিজের নাতি-নাতনিদের নিয়ে এসেছিলেন বিএনপি নেতা শামসুদ দোহা। তিনি বলছিলেন, ‘এই অনুভূতির কোনো তুলনা হয় না। স্বৈরাচারের অধীনে আমরা অনেক ভুগেছি। এখন সময় দেশ গড়ার।’
আনোয়ার পাগলা থেকে শুরু করে শামসুদ দোহা পর্যন্ত সবার চোখেই এখন আগামীর স্বপ্ন। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার কি পারবে দীর্ঘদিনের ক্ষতে প্রলেপ দিয়ে একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে? নাকি পুরনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিই আবার ফিরে আসবে? বাংলাদেশ এখন এক ঐতিহাসিক চৌরাস্তায় দাঁড়িয়ে, যার গন্তব্য নির্ধারিত হবে আগামী কয়েক মাসের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে। তথ্যসূত্র : আল-জাজিরা
জেএইচআর