রাজনীতির নয়া দিগন্তে বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০২৬, ১২:২৫ এএম

১৯ বছরের রাজনৈতিক নির্বাসন, আন্দোলন আর ত্যাগের পর এক নতুন সূর্যোদয়ের সাক্ষী হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আগামী মঙ্গলবার বঙ্গভবনের দরবার হলে দেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। 

এই শপথ গ্রহণ কেবল একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী এক ‘পরিবর্তিত বাংলাদেশের’ নতুন যাত্রার ঘোষণা। এই আগাম বার্তার তীব্রতা এতটাই বেশি যে, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একে আখ্যা দিচ্ছেন ‘তারেক ঝড়’ হিসেবে, যার প্রভাবে বিরোধী শিবির আজ পুরোপুরি লন্ডভন্ড এবং লক্ষ্যহীন।

মন্ত্রিসভার আধুনিকায়ন: আয়তনে ছোট, দক্ষতায় বিশাল
তারেক রহমানের এবারের সরকার গঠনের প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় চমক হচ্ছে মন্ত্রিসভার আকার। ২০০১ সালের ৬০ সদস্যের বিশাল ও ভারাক্রান্ত মন্ত্রিসভার তিক্ত স্মৃতি থেকে শিক্ষা নিয়ে তিনি এবার ‘স্মার্ট ক্যাবিনেট’ বা ছোট মন্ত্রিসভার মডেল অনুসরণ করছেন।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এবারের মন্ত্রিসভার সদস্য সংখ্যা হতে পারে মাত্র ৩৫ থেকে ৩৭ জন। এর মধ্যে পূর্ণ মন্ত্রী থাকবেন ২৬ থেকে ২৭ জন এবং প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে পারেন ৯ থেকে ১০ জন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মন্ত্রিসভার এই ছোট আকার কেবল প্রশাসনিক ব্যয়ই কমাবে না, বরং কাজের গতিশীলতা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে। যারা অতীতে বিশাল বহর নিয়ে চলতেন, তাদের জন্য এই ছোট মন্ত্রিসভা এক বড় ধরনের ‘সিগন্যালিং’। এটি প্রমাণ করছে যে, তারেক রহমান এবার আবেগ নয়, বরং যোগ্যতাকে প্রাধান্য দিচ্ছেন।

প্রবীণ-নবীনের মেলবন্ধন: তারেক রহমানের ‘মাস্টার প্ল্যান’
তারেক রহমান তার মন্ত্রিসভায় প্রবীণদের অভিজ্ঞতা এবং নবীনদের কর্মস্পৃহাকে এক সুতায় গাথার চেষ্টা করছেন। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং সালাহউদ্দিন আহমদের মতো ঝানু নেতাদের পাশাপাশি মন্ত্রিসভায় দেখা যেতে পারে একঝাঁক মেধাবী তরুণ মুখ এবং বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের।

দলীয় হাই-কমান্ডের একটি ঘনিষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, তারেক রহমান নিজে প্রতিটি নামের যোগ্যতা যাচাই করছেন। তাঁর এই নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় দলের স্থায়ী কমিটির একজন বর্ষীয়ান নেতা যুক্ত থাকলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসছে চেয়ারম্যানের কাছ থেকেই। এই কঠোর ও পেশাদার নির্বাচন প্রক্রিয়া বিরোধী শিবিরের জন্য এক বিরাট আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ তারা এবার গতানুগতিক ‘পলিটিক্যাল ম্যানেজমেন্ট’ দিয়ে সুবিধা করতে পারছে না।

অতীতের ছায়া বনাম বর্তমানের প্রতিশ্রুতি: ভুলের পুনরাবৃত্তি নয়
২০০১-০৬ মেয়াদে বিএনপির শাসনামলে বিদ্যুৎ খাতের ‘খাম্বা’ দুর্নীতি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতা এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো যে বিষয়গুলো সরকারকে বিব্রত করেছিল, তারেক রহমান এবার সেগুলোর পুনরাবৃত্তি রোধে মরিয়া। বিশেষ করে ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলা এবং ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার মতো কলঙ্কিত অধ্যায়গুলো যেন নতুন সরকারের ওপর কোনোভাবেই ছায়া ফেলতে না পারে, সে জন্য শেষ পৃষ্ঠার পর তিনি অত্যন্ত সজাগ। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, তারেক রহমানের এই ‘ইমেজ মেকওভার’ বা ভাবমূর্তি পরিবর্তনের প্রচেষ্টা প্রতিপক্ষের রাজনৈতিক মূল অস্ত্রগুলোকেই অকেজো করে দিয়েছে। অতীতে যারা দুর্নীতির ধুয়া তুলে বিএনপিকে কোণঠাসা করতে চাইত, আজ তারেক রহমানের ‘ক্লিন ইমেজ’ নীতির কাছে তারা দিশেহারা।

প্রতিহিংসাহীন রাজনীতি: একটি নতুন শিষ্টাচার
নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পরও তারেক রহমানের গলায় কোনো দম্ভ বা প্রতিশোধের সুর নেই। বরং তিনি জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছেন। গত কয়েকদিনে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বাসায় গিয়ে তার সৌজন্য সাক্ষাৎ বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অভাবনীয় ইতিবাচক ধারার সূচনা করেছে।

শনিবারের সংবাদ সম্মেলনে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ‘মত ও পথ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু দেশের স্বার্থে আমরা এক।’ তার এই ‘সবাইকে নিয়ে চলার’ নীতি বিরোধীদের বিভাজনের রাজনীতিকে কার্যত ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। যখন বিরোধী শিবির কোনো উসকানি বা সহিংসতার অপেক্ষায় ছিল, তখন তারেক রহমানের শান্ত ও ধীরস্থির অবস্থান তাদের রাজনৈতিক কৌশলকে লন্ডভন্ড করে দিয়েছে।

অর্থনৈতিক সংস্কার ও হোসেন জিল্লুর রহমানের দৃষ্টিভঙ্গি
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান সঠিকভাবেই চিহ্নিত করেছেন যে, নতুন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার। তারেক রহমানের মন্ত্রিসভা গঠনে এই অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠছে। বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের মন্ত্রিসভায় বা গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা পদে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে তিনি বিশ্ববাজার এবং দাতা সংস্থাগুলোকে একটি শক্তিশালী ‘সিগন্যালিং’ দিতে চাইছেন।

বিগত সরকারের আমলের লুটপাট এবং পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা এবং বাজার সিন্ডিকেট ভেঙে নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালে আনা হবে তার সরকারের প্রথম কাজ। এই অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কাছে কোনো কার্যকর পাল্টা যুক্তি দাঁড় করাতে পারছে না বিরোধী জোট।

তারেক ঝড় ও আগামীর বাংলাদেশ
তারেক রহমান এখন কেবল বিএনপির নেতা নন, তিনি হতে যাচ্ছেন একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক বাংলাদেশের স্থপতি। তার সাহসী নেতৃত্ব, দূরদর্শী পরিকল্পনা এবং অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা তাকে রাজনীতির এক অপরাজেয় উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

কালকের শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এক নতুন যুগে প্রবেশ করব্তেযেখানে আইনের শাসন সবার জন্য সমান হবে, যেখানে সুশাসন হবে মূলমন্ত্র এবং যেখানে প্রতিহিংসার বদলে স্থান পাবে সহযোগিতা। তারেক রহমানের এই ‘বিপ্লবী রূপান্তর’ বিরোধী শিবিরকে রাজনৈতিকভাবে এতটাই অপ্রাসঙ্গিক করে দিয়েছে যে, তারা এখন ইতিহাসের পাতায় নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই করছে।

জেএইচআর