অনিশ্চয়তায় দেশের শিল্প খাত

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২৬, ১২:২১ এএম

দেশে তীব্র গ্যাস সংকটের প্রভাবে শিল্প খাতে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতির কারণে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত পোশাক, টেক্সটাইল, সিরামিক, স্টিল ও সার শিল্পে উৎপাদন কমে গেছে উল্লেখযোগ্য হারে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সময়মতো পণ্য সরবরাহে ব্যর্থতা দেখা দিচ্ছে, যা রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ কমে অচলাবস্থা : রাজধানীর আশপাশের শিল্পাঞ্চল গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও আশুলিয়ায় কারখানাগুলোতে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিকের তুলনায় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তারা। অনেক কারখানায় দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা উৎপাদন বন্ধ রাখতে হচ্ছে। বিশেষ করে বয়লার ও ডাইং সেকশনে গ্যাসের স্বল্পচাপের কারণে যন্ত্রপাতি পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না।

শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) জানিয়েছে, গ্যাস সংকট অব্যাহত থাকলে রপ্তানি আদেশ সময়মতো সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়বে। সংগঠনটির এক নেতা বলেন, ‘বর্তমানে অনেক কারখানা বিকল্প জ্বালানি যেমন ডিজেল ব্যবহার করছে, যা উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত।’

রপ্তানিতে ভাটা, উদ্বেগ বাড়ছে : দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। এই খাতের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ) জানিয়েছে, উৎপাদন কমে যাওয়ায় ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য পাঠানো কঠিনহয়ে পড়ছে।

ফলে ক্রেতাদের আস্থা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। রপ্তানিকারকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা এখন তীব্র। ভিয়েতনাম, ভারত ও কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলো নিয়মিত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করায় তারা অর্ডার পাচ্ছে বেশি। গ্যাস সংকট অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক বাজারে অংশীদারিত্ব হারাতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিদ্যুৎ উৎপাদনেও প্রভাব : দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বড় একটি অংশ গ্যাসভিত্তিক। গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনও হ্রাস পাচ্ছে। এতে শিল্প কারখানায় লোডশেডিং বেড়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়লেও বৈদেশিক মুদ্রার সংকট ও আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে পর্যাপ্ত গ্যাস আমদানি সম্ভব হচ্ছে না।

সরকারি সূত্র জানিয়েছে, গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন স্বাভাবিকের তুলনায় কমে গেছে এবং নতুন অনুসন্ধান কার্যক্রম প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না। ফলে সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে ব্যবধান বাড়ছে।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত : বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো কোনোভাবে বিকল্প ব্যবস্থায় উৎপাদন চালু রাখলেও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। অনেক কারখানা আংশিক বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা কমে গেছে, ফলে আয়েও প্রভাব পড়ছে। নারায়ণগঞ্জের এক ডাইং কারখানার মালিক বলেন, ‘গ্যাস না থাকলে আমাদের যন্ত্র চলে না। ডিজেল ব্যবহার করলে খরচ দ্বিগুণ হয়ে যায়। এভাবে টিকে থাকা কঠিন।’

ব্যাংকঋণ ও আর্থিক চাপ : উৎপাদন কমে যাওয়ায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর নগদ প্রবাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। সময়মতো ব্যাংকঋণের কিস্তি পরিশোধে হিমশিম খেতে হচ্ছে অনেক উদ্যোক্তাকে। অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট চলতে থাকলে শিল্প খাতে বিনিয়োগ কমে যেতে পারে।

সরকারের আশ্বাস : জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, এলএনজি আমদানি বাড়ানো এবং নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি শিল্প খাতে গ্যাস বণ্টনে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরবরাহ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বাস্তবায়ন কত দ্রুত হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েই গেছে। একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ‘আমরা পরিস্থিতি সামাল দিতে কাজ করছি। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম কিছুটা স্থিতিশীল হলে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হবে।’

বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝোঁক : গ্যাস সংকটের প্রেক্ষাপটে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান সোলার ও বায়োমাসের মতো বিকল্প জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে বড় পরিসরে এই বিকল্প ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ এতে উচ্চ প্রাথমিক বিনিয়োগ প্রয়োজন।

শিল্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি বহুমুখীকরণই হতে পারে টেকসই সমাধান। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করা এবং জ্বালানি দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে সংকট মোকাবিলা সম্ভব।

শ্রমবাজারে প্রভাবের আশঙ্কা : গ্যাস সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে শ্রমবাজারেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তৈরি পোশাক খাতে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। উৎপাদন কমে গেলে কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ইতোমধ্যে কিছু কারখানায় অতিরিক্ত সময় (ওভারটাইম) বন্ধ রাখা হয়েছে। শ্রমিক নেতারা বলেছেন, উৎপাদন ব্যাহত হলে প্রথম আঘাত আসে শ্রমিকদের ওপর। তাই দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাব : বিশ্লেষকদের মতে, শিল্প উৎপাদন ও রপ্তানি কমে গেলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ বাড়বে। একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞ মত : জ্বালানি বিশ্লেষকরা বলছেন, গ্যাসের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়াতে দ্রুত অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি এলএনজি আমদানিতে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও মূল্য স্থিতিশীলতার কৌশল গ্রহণ করা জরুরি। শিল্প খাতের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না হলে রপ্তানি প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে।

সর্বোপরি তীব্র গ্যাস সংকট দেশের শিল্প খাতকে গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় রপ্তানিতে ভাটা পড়ছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে শিল্প খাতের এই সংকট দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। উদ্যোক্তা, শ্রমিক ও অর্থনীতিবিদ সবার একটাই দাবি, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করে শিল্প উৎপাদনের গতি ফিরিয়ে আনতে হবে এখনই।

জেএইচআর