রপ্তানিমুখী শিল্পে স্বস্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: মার্চ ৪, ২০২৬, ১২:২৩ এএম

রপ্তানিমুখী শিল্প খাতে দীর্ঘদিনের বকেয়া নগদ সহায়তার বিপরীতে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ছাড় দিয়েছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তৃতীয় কিস্তির প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে এই বরাদ্দ অনুমোদন দেয়া হয়েছে। শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈশ্বিক বাজারে চাপ, ক্রমবর্ধমান উৎপাদন ব্যয় এবং ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধের বাড়তি চাপের মধ্যে এই সিদ্ধান্ত রপ্তানি খাতের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ স্বস্তি বয়ে আনবে।

এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)। সংগঠনটির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান এক বিবৃতিতে বলেন, ‘ঈদকে সামনে রেখে শিল্প-মালিকদের ওপর বেতন-ভাতা, উৎসব বোনাস এবং ইউটিলিটি বিল পরিশোধের চাপ বেড়েছে। এমন সময়ে নগদ সহায়তার অর্থ ছাড় শিল্পের জন্য বড় স্বস্তি এনে দেবে।’

কীভাবে বরাদ্দ হলো ২,৫০০ কোটি টাকা

অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তৃতীয় কিস্তির প্রথম ধাপে ১,৫০০ কোটি টাকা এবং দ্বিতীয় ধাপে ১,০০০ কোটি টাকা- মোট ২,৫০০ কোটি টাকা ছাড় দেয়া হয়েছে। এই অর্থ মূলত রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পসহ সংশ্লিষ্ট উপখাতগুলোর বকেয়া নগদ সহায়তার দাবির বিপরীতে সমন্বয় করা হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নগদ সহায়তা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে নিজ নিজ লিয়েন ব্যাংকের মাধ্যমে আবেদন ও যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। এরপর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন সাপেক্ষে অর্থ ছাড় হবে।

বিজিএমইএর তৎপরতা ও সরকারের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক

বিজিএমইএ জানায়, আটকে থাকা নগদ সহায়তা দ্রুত ছাড়ের দাবিতে সংগঠনটির বর্তমান বোর্ড সমপ্রতি সরকারের শীর্ষ পর্যায়, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করেছে। এসব আলোচনায় শিল্পের বর্তমান আর্থিক চাপ, আন্তর্জাতিক বাজারে অর্ডার কমে যাওয়া এবং ডলার সংকটের বিষয় তুলে ধরা হয়।

সংগঠনটির নেতারা বলেন, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে তৈরি পোশাকশিল্পকে সচল রাখা জাতীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই নগদ সহায়তার অর্থ দ্রুত ছাড় দেয়া ছিল সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত।

কেন জরুরি ছিল নগদ সহায়তা

রপ্তানিমুখী শিল্প বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত বর্তমানে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। বৈশ্বিক মন্দা, অর্ডার কমে যাওয়া, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যয় বৃদ্ধি- সব মিলিয়ে উৎপাদন খরচ বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে।

এছাড়া ব্যাংকঋণের সুদহার বৃদ্ধি, ডলার সংকটজনিত এলসি খোলায় বিলম্ব, ইউটিলিটি বিল পরিশোধে চাপ, শ্রমিকদের বেতন ও উৎসব বোনাসের বাধ্যবাধকতা। এসব কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান তারল্য সংকটে পড়েছে। শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নগদ সহায়তার অর্থ হাতে পেলে অন্তত স্বল্পমেয়াদে আর্থিক চাপ কিছুটা কমবে।

ঈদকে সামনে রেখে বাড়তি চাপ

আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে কারখানাগুলোতে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও উৎসব বোনাস পরিশোধের সময় ঘনিয়ে এসেছে। প্রতি বছর এ সময়টিতে নগদ প্রবাহের ওপর চাপ বাড়ে।

মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘শ্রমিকদের সময়মতো বেতন-ভাতা ও বোনাস পরিশোধ নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব। সরকার যে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা শিল্প মালিকদের এই দায়িত্ব পালনে সহায়ক হবে।’ শিল্প-মালিকদের মতে, নগদ সহায়তা ছাড়া অনেক প্রতিষ্ঠানকে ব্যাংক থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিতে হতো, যা ভবিষ্যতে ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিত।রপ্তানি আয়ে প্রভাব ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতা : বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের বড় অংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। বৈশ্বিক বাজারে ভিয়েতনাম, ভারত, কম্বোডিয়া ও পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা বাড়ছে।

শিল্প বিশ্লেষকরা বলছেন, নগদ সহায়তা অব্যাহত থাকলে উৎপাদন খরচ কিছুটা সামাল দেয়া সম্ভব হবে এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখা সহজ হবে। একজন অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘নগদ সহায়তা শুধু স্বল্পমেয়াদি আর্থিক সহায়তা নয়; এটি রপ্তানিকারকদের জন্য একটি প্রণোদনামূলক সংকেত। তবে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন দক্ষতা বাড়ানো, পণ্য বৈচিত্র্য এবং বাজার সমপ্রসারণ জরুরি।’

তারল্য সংকট মোকাবিলায় প্রভাব : বর্তমানে অনেক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সুদের হার বৃদ্ধি ও আর্থিক খাতের চাপের কারণে নতুন ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। নগদ সহায়তার অর্থ ছাড় হলে— ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমবে, কর্মপরিচালনার মূলধন বাড়বে, সরবরাহকারীদের পাওনা দ্রুত পরিশোধ করা সম্ভব হবে, উৎপাদন চক্রে গতি ফিরবে। শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, এই অর্থ সরাসরি বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আহ্বান : বিজিএমইএ তাদের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে নিজ নিজ লিয়েন ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগের আহ্বান জানিয়েছে। সঠিক নথিপত্র ও সময়মতো আবেদন নিশ্চিত করতে সংগঠনটি বিশেষ সেল গঠন করেছে বলেও জানা গেছে।

সরকারের নীতিগত অবস্থান : সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, রপ্তানি খাত দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যেও রপ্তানি প্রবাহ ধরে রাখতে প্রণোদনা ও সহায়তা অব্যাহত থাকবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, ‘আমরা চাই রপ্তানিকারকরা আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকুক এবং কর্মসংস্থান বজায় রাখুক। সেই বিবেচনায় এই অর্থ ছাড় দেয়া হয়েছে।’

সমালোচনা ও সতর্কতা

কিছু অর্থনীতিবিদ মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে বারবার নগদ সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা শিল্পকে কাঠামোগত সংস্কার থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারে। তাদের মতে- উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি আধুনিকায়ন, পণ্যের বৈচিত্র্য, নতুন বাজার অনুসন্ধান এসব ক্ষেত্রেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। না হলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট : বিশ্ববাজারে বর্তমানে পোশাকের চাহিদা ধীরগতির। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাজারে মূল্যসংবেদনশীলতা বেড়েছে। ক্রেতারা কম দামে বেশি মানের পণ্য প্রত্যাশা করছেন।

এই প্রেক্ষাপটে উৎপাদন খরচ বাড়লেও রপ্তানিকারকদের দাম বাড়ানোর সুযোগ সীমিত। ফলে সরকারের নগদ সহায়তা অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতির চাপ কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।

শ্রমিক কল্যাণ ও সামাজিক প্রভাব : রপ্তানি খাতে প্রায় কয়েক মিলিয়ন শ্রমিক কাজ করেন, যাদের বড় অংশ নারী। সময়মতো বেতন-ভাতা পরিশোধ না হলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। নগদ সহায়তা দ্রুত ছাড় পাওয়ায় শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধে বিলম্বের আশঙ্কা কমবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, নগদ সহায়তা ছাড় একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও এটি সাময়িক সমাধান। দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজন- রপ্তানি বহুমুখীকরণ, উচ্চমূল্য সংযোজন পণ্য উৎপাদন, সবুজ কারখানা ও টেকসই উৎপাদন, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন ও লজিস্টিকস ও বন্দর ব্যবস্থার উন্নয়ন- এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে রপ্তানি খাত আরও শক্তিশালী হবে।

রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পসহ সংশ্লিষ্ট খাতে ২,৫০০ কোটি টাকার নগদ সহায়তা ছাড়ের সিদ্ধান্ত শিল্পের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ স্বস্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে বাড়তি আর্থিক চাপের সময়ে এ পদক্ষেপ শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ ও উৎপাদন ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে কাঠামোগত সংস্কার, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বাজার সমপ্রসারণের দিকে সমান গুরুত্ব দেয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।