সিসা লাউঞ্জ বন্ধে কঠোর অবস্থান

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: মার্চ ৪, ২০২৬, ১২:৩৮ এএম

রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান-বনানীসহ বিভিন্ন স্থানে অনুমোদনবিহীন সিসা (হুক্কা) লাউঞ্জ পরিচালনার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন হাইকোর্ট। গতকাল মঙ্গলবার এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি শেষে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন আদালত।

বিচারপতি রাজিক আল জলিল ও বিচারপতি আনোয়ারুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। আদেশে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনারসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে রাজধানীর অনুমোদনহীন সিসা লাউঞ্জ চিহ্নিত করে বন্ধ করার কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।

রিটের প্রেক্ষাপট

রাজধানীর অভিজাত এলাকায় অনুমোদনবিহীন সিসা বার ও লাউঞ্জ পরিচালনার বিরুদ্ধে গত ১৮ জানুয়ারি হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করা হয়। রিটে স্বরাষ্ট্র সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), র্যাব মহাপরিচালক এবং ডিএমপি কমিশনারসহ সংশ্লিষ্টদের বিবাদী করা হয়েছে।

এর আগে গত ৮ জানুয়ারি এ বিষয়ে সরকারকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠানো হয়। নোটিশে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন সংযুক্ত করে বলা হয়, আইনগত অনুমতি না থাকলেও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় রাতের বেলায় সিসা লাউঞ্জে মাদক সেবন ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড চলছে। রিটকারী পক্ষের আইনজীবী শুনানিতে বলেন, ‘দেশে সিসা বার পরিচালনার কোনো বৈধ অনুমোদন নেই। অথচ রাজধানীতে প্রকাশ্যেই এসব লাউঞ্জ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যকর নজরদারি না থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাচ্ছে।’

আদালতের নির্দেশনা

হাইকোর্ট তার আদেশে বলেন, আইন স্পষ্টভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও বাস্তবায়নে ঘাটতিরয়েছে। ফলে রাজধানীর অভিজাত এলাকায় সিসা লাউঞ্জ সংস্কৃতি বিস্তার লাভ করছে।

আদালত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন— রাজধানীর গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি ও উত্তরাসহ অভিজাত এলাকাগুলোতে অবৈধ সিসা লাউঞ্জ চিহ্নিত করতে, অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধে প্রয়োজনীয় অভিযান পরিচালনা করতে, ভবিষ্যতে যেন এমন কার্যক্রম পুনরায় চালু না হতে পারে সে বিষয়ে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে। ডিএমপি কমিশনারসহ সংশ্লিষ্টদের দ্রুত এ নির্দেশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি আদালতকে জানাতে বলা হয়েছে।

রাজধানীতে ‘গোপন সিসা সংস্কৃতি’

গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি ও উত্তরার মতো অভিজাত এলাকায় সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত জমে ওঠে সিসা লাউঞ্জকেন্দ্রিক আড্ডা। বাইরে থেকে ক্যাফে বা রেস্টুরেন্টের মতো মনে হলেও ভেতরে এগুলো সিসা বারে রূপ নেয়। সেখানে তামাকজাত সিসার পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের মাদক মেশানোর অভিযোগ রয়েছে। অনেক স্থানে উচ্চ শব্দে সংগীত, মৃদু আলো এবং ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন পরিবেশ তৈরি করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, রাজধানীতে একশরও বেশি সিসা লাউঞ্জ সক্রিয় রয়েছে, যার অন্তত ৫০টি তরুণ-তরুণীদের নিয়মিত আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে।

স্বাস্থ্যঝুঁকি ও আইনি অবস্থান

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিসা বা হুক্কা সেবন অনেকের কাছে ‘কম ক্ষতিকর’ বলে মনে হলেও বাস্তবে এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দীর্ঘ সময় ধরে সিসা সেবনের ফলে ফুসফুস, হূদরোগ এবং ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে।

বাংলাদেশে তামাকজাত দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন থাকলেও সিসা বার পরিচালনার বিষয়ে কোনো বৈধ লাইসেন্সিং কাঠামো নেই। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এ বিষয়ে অনুমোদন দেয় না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে আইনের দুর্বল প্রয়োগ ও তদারকির ঘাটতির সুযোগে রাজধানীতে এ ব্যবসা সমপ্রসারিত হয়েছে।

ভবিষ্যৎ করণীয়

বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে পদক্ষেপ জরুরি- সমন্বিত অভিযান ও নিয়মিত মনিটরিং, লাইসেন্সিং ও নীতিমালা প্রণয়ন (যদি সরকার বৈধতা বিবেচনা করে), তরুণ সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি, জনস্বাস্থ্যভিত্তিক প্রচারণা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

রাজধানীর অভিজাত এলাকায় অনুমোদনবিহীন সিসা লাউঞ্জের বিস্তার নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে হাইকোর্টের এ নির্দেশনা একটি তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কার্যকর পদক্ষেপ, নিয়মিত তদারকি এবং সামাজিক সচেতনতা ছাড়া এ সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আদালতের এ নির্দেশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাজধানীতে মাদকনির্ভর সিসা লাউঞ্জ সংস্কৃতির লাগাম টানা সম্ভব হবে কি না এখন সেটিই দেখার বিষয়।