ক্যানসার, ডায়াবেটিস কিংবা উচ্চ রক্তচাপ- রোগ যাই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের জন্য ওষুধের প্রেসক্রিপশন এখন যেন একেকটি ‘আর্থিক মৃত্যুপরোয়ানা’। গত কয়েক মাসে বাজারে জীবন রক্ষাকারী ওষুধের দাম ৩০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। একদিকে ওষুধের তীব্র সংকট, অন্যদিকে আকাশচুম্বী দাম; এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। অথচ বিস্ময়করভাবে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর এবং মালিক সমিতি দাবি করছে- বিগত এক বছরে ওষুধের দাম বাড়েনি।
বাস্তবতা আর দাপ্তরিক দাবির এই বিশাল ফারাক ওষুধের বাজারে এক গভীর রহস্যের জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, এই অস্থিরতার নেপথ্যে কি ডলার সংকট ও কাঁচামালের অভাব, নাকি কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিমুনাফা লুটছে অসাধু সিন্ডিকেট?
মাঠ পর্যায়ের চিত্র : হাহাকার ও পকেট খালি হওয়ার গল্প
বাজার ঘুরে দেখা যায়, অ্যান্টিবায়োটিক, ইনসুলিন এবং হূদরোগের ওষুধের জন্য হন্যে হয়ে এক ফার্মেসি থেকে অন্য ফার্মেসিতে ঘুরছেন মানুষ। ২৩ বছর বয়সি নাফি নামের এক তরুণের অভিজ্ঞতা শিউরে ওঠার মতো। তিনি জানান, ‘মিথাইফেনটেন’ নামের একটি ওষুধের দাম প্রথমে বাড়িয়ে ১৭০ টাকা করা হয়। এরপর কৌশলে বাজারে এর সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে এক ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়। এখন ১৫-২০ পিসের একটি স্টকের দাম চাওয়া হচ্ছে ২ হাজার ২০০ টাকা!
শুধু নাফি নন, হাজারো নাফি প্রতিদিন ওষুধের দোকানে গিয়ে দিশেহারা হয়ে ফিরছেন। অনেক ক্ষেত্রে এক-দুই পিস ওষুধের প্রয়োজন হলেও খুচরা বিক্রেতারা পুরো বক্স কিনতে বাধ্য করছেন। পাইকারি দরে ৭৮৫ টাকার ওষুধ খুচরা পর্যায়ে কিনতে গুণতে হচ্ছে ৮২০ টাকারও বেশি।
ওষুধ প্রশাসন ও মালিক সমিতির ‘সব ঠিক আছে’ তত্ত্ব
বাজারের এই অগ্নিমূল্যের বিপরীতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভাষ্য অনেকটা দায়সারা। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. আকতার হোসেন বলেন, ‘গত এক বছরের মধ্যে কোনো ওষুধের দাম বাড়েনি। দাম নির্ধারণের একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া আছে। কোনো কোম্পানি চাইলেই নিজের ইচ্ছামতো দাম মুদ্রণ করে বাজারে ছাড়তে পারে না।
একই সুরে কথা বলছেন বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির মহাসচিব মো. জাকির হোসেন। তার মতে, বাজারে ২৬ থেকে ২৮ হাজার ব্র্যান্ডের ওষুধের মধ্যে মাত্র ৫০-১০০টির দাম হয়তো বছরে সমন্বয় করা হয়। বাকিগুলোর দাম অপরিবর্তিত থাকে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, যদি দাম না-ই বেড়ে থাকে, তবে ভোক্তারা কেন বাড়তি টাকা দিচ্ছেন?
খুচরা বিক্রেতা ও বিশেষজ্ঞদের পাল্টাপাল্টি যুক্তি
খুচরা ওষুধ বিক্রেতারা সরাসরি দুষছেন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে। তাদের দাবি, কোম্পানিগুলো ওষুধের রেট বাড়িয়ে দিয়েছে এবং সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে ইনসুলিন ও নবমিক্সের মতো অতি প্রয়োজনীয় ওষুধের দাম গত দুই মাসে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী মনে করেন, এখানে নজরদারির বিশাল অভাব রয়েছে। তিনি বলেন, ‘মালিক সমিতি দাবি করছে তারা দাম বাড়াচ্ছে না, অথচ মানুষ বাজারে গিয়ে দেখছে দাম চড়া। তার মানে তদারকিতে ফাঁক আছে। ওষুধ প্রশাসনের পাশাপাশি ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে সাথে নিয়ে বহুমুখী তদারকি চালানো গেলে এই অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।’
সুবিধা থাকলেও কেন এই উচ্চমূল্য
বাংলাদেশ ওষুধ উৎপাদনে বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার আওতায় কাঁচামাল আমদানি ওমেধাস্বত্বে বিশেষ ছাড় পায় বাংলাদেশ। এছাড়া উন্নত দেশের তুলনায় এখানে উৎপাদন খরচ অনেক কম। এত সুবিধা থাকা সত্ত্বেও কেন জীবন রক্ষাকারী ওষুধের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে, তা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। সরকার ইতোমধ্যে ২৯৫টি ওষুধকে ‘অত্যাবশ্যকীয়’ তালিকায় রেখে দাম নিয়ন্ত্রণের নির্দেশ দিলেও বাজারে এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
সমাধানের পথ কী : বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল আলোচনার মাধ্যমে ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।
এর জন্য প্রয়োজন- ১. ওষুধ প্রাইসিং অথোরিটি: ওষুধের দাম নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণে দ্রুত একটি স্বাধীন ‘প্রাইসিং অথোরিটি’র কার্যক্রম চালু করা।
২. কঠোর তদারকি: খুচরা ও পাইকারি পর্যায়ে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের চিহ্নিত করা।
৩. ডিজিটাল মনিটরিং: কোন ওষুধের কত উৎপাদন এবং মজুত আছে, তার একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডেটাবেজ তৈরি করা।
ওষুধ কেবল পণ্য নয়, এটি মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার। এই অধিকারকে পুঁজি করে যারা অতিমুনাফার পাহাড় গড়ছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি আরও বাড়বে। ওষুধের বাজারের এই অস্থিরতা নিরসনে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর অবস্থান এখন সময়ের দাবি। সরকার যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়, তবে সাধারণ মানুষের জন্য চিকিৎসা সেবা কেবল ধনীদের বিলাসিতায় পরিণত হবে।