মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে দেশের জ্বালানি বাজারে যে সংকটের কালো মেঘ ঘনীভূত হয়েছিল, তা নিরসনে এবার ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)। দীর্ঘমেয়াদি সংকটের আশঙ্কায় যে কৃচ্ছ্রসাধন ও রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল, তা কিছুটা শিথিল করার ঘোষণা দিয়েছে সংস্থাটি। গতকাল বুধবার এক জরুরি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিপিসি জানিয়েছে, এখন থেকে ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেলের সরবরাহ আগের চেয়ে বাড়ানো হচ্ছে।
রেশনিং পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন
গত রোববার থেকে সরকারি নির্দেশে সারা দেশে জ্বালানি তেলের ওপর বিশেষ রেশনিং ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছিল। সেই সময় বিপণনকারী কোম্পানিগুলো পেট্রোল পাম্পগুলোতে তেলের বরাদ্দ ২৫ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছিল। তবে বর্তমান পরিস্থিতির চাহিদা ও মজুত বিশ্লেষণ করে বিপিসি সেই বরাদ্দ হ্রাসের হার ১০ শতাংশ কমিয়ে এনেছে। অর্থাৎ, এখন থেকে পাম্পগুলোতে ২৫ শতাংশের পরিবর্তে মাত্র ১৫ শতাংশ হ্রাসকৃত বরাদ্দ অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ করা হবে। এর ফলে পাম্পগুলোতে আগের চেয়ে ১০ শতাংশ বেশি তেল পাওয়া যাবে, যা গ্রাহক পর্যায়ে দীর্ঘ ভোগান্তি কমিয়ে আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিপিসির নির্দেশনা ও বাস্তবায়নের কৌশল
বিপিসি তাদের বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, চলমান বৈশ্বিক সংকটময় পরিস্থিতিতে জনগণের ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করাই এই সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী- বিভাগীয় শহরগুলোতে অকটেন ও পেট্রোলের দৈনিক গড় বিক্রয়ের ওপর ভিত্তি করে নতুন বরাদ্দের চার্ট তৈরি করা হয়েছে, বিপিসির আওতাধীন বিপণন কোম্পানিগুলোর ডিপো সুপারভাইজার এবং বিক্রয় কর্মকর্তাদের দ্রুত এই নতুন চার্ট অনুযায়ী তেল সরবরাহের নির্দেশ দেয়া হয়েছে, ফিলিং স্টেশনের ডিলার ও এজেন্টদের অনুরোধ করা হয়েছে যাতে তারা গ্রাহক পর্যায়ে তেলের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করেন।
নেপথ্যের কারণ : মধ্যপ্রাচ্য সংকট ও আগাম প্রস্তুতি
বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি উৎস মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সরবরাহ চেইন মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির সংকীর্ণ জলপথে জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম হু-হু করে বাড়ছে। বাংলাদেশ যাতে আকস্মিক কোনো ‘জ্বালানি শূন্যতা’ বা শাটডাউনের মুখে না পড়ে, সেজন্যই গত রোববার থেকে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। বিপিসি মনে করছে, বর্তমানে যে মজুত রয়েছে এবং আসার অপেক্ষায় আছে, তার ভিত্তিতে সরবরাহ কিছুটা বাড়ানো সম্ভব।
গ্রাহক ও পাম্প মালিকদের প্রতিক্রিয়া
গত কয়েক দিনে ২৫ শতাংশ সরবরাহ হ্রাসের কারণে রাজধানীর পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন এবং অনেক ক্ষেত্রে বাগবিতণ্ডার খবর পাওয়া গেছে। তেলের বরাদ্দ বাড়ানোয় পরিবহন খাতে স্বস্তি ফেরার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি যদি আরও উত্তপ্ত হয়, তবে বিপিসিকে আবারও কড়াকড়ি রেশনিং ব্যবস্থার দিকে ফিরে যেতে হতে পারে।
‘বিপিসির এই সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন খরচ কিছুটা হলেও সহনশীল রাখতে সাহায্য করবে। তবে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি যে অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তাতে জ্বালানি সাশ্রয়ে নাগরিকদের সচেতন হওয়া এখন সময়ের দাবি।’