সংকটে স্থবির জ্বালানি রপ্তানি

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: মার্চ ১৮, ২০২৬, ১২:৫৪ এএম

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় সরাসরি ঝুঁকিতে পড়েছে অন্তত ৫৮০টি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান। ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল কার্যত স্থবির হয়ে পড়ায় রপ্তানি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এতে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ওপর চাপ সবচেয়ে বেশি পড়েছে।

হরমুজ প্রণালীতে অচলাবস্থা রপ্তানির মূল ধাক্কা : পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে পণ্য পরিবহনের প্রধান পথ হলো হরমুজ প্রণালী। সামপ্রতিক সংঘাতের জেরে এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল বিশ্ব বাণিজ্যের একটি বড় অংশ। ফলে এখানে কোনো ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হলে তার প্রভাব পড়ে বহুদূর পর্যন্ত। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে পণ্য পাঠানোর প্রধান মাধ্যম সমুদ্রপথ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় রপ্তানি কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

রপ্তানির পরিসংখ্যান- সংখ্যার ভেতরের বাস্তবতা : জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে পারস্য উপসাগরীয় আটটি দেশে বাংলাদেশ থেকে মোট ৭৫ কোটি মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এই রপ্তানিতে যুক্ত ছিল মোট ১,৮২৩টি প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ৫৮০টি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে তাদের মোট রপ্তানির ৫০ শতাংশ থেকে ১০০ শতাংশই এই অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ, এসব প্রতিষ্ঠান কার্যত একক বাজারনির্ভর। ফলে বর্তমান সংকট তাদের জন্য সরাসরি অস্তিত্বের ঝুঁকি তৈরি করেছে।

সংঘাতের প্রেক্ষাপট- উত্তেজনা থেকে অর্থনৈতিক প্রভাব : গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক পদক্ষেপের পর পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানায় ইরান। দ্রুতই এই উত্তেজনা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে যখন হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বাধা দেয়ার ঘোষণা আসে। এর ফলে কার্যত সমুদ্রপথে রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, ইরাক ও ওমান- এই দেশগুলোতে পণ্য পরিবহন বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েছে।

বিমানপথে সীমিত রপ্তানি- ব্যয় বাড়ছে বহুগুণ : যদিও কিছু পণ্য এখনো বিমানপথে পাঠানো হচ্ছে, তবে তা খুবই সীমিত। মোট রপ্তানির মাত্র ১৯ শতাংশ এই পথে যায়, বাকি ৮১ শতাংশই সমুদ্রপথনির্ভর। বর্তমানে বিমানভাড়া বেড়ে যাওয়ায় রপ্তানিকারকদের খরচও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। একজন রপ্তানিকারক জানান, আগে যেখানে প্রতি কেজি পণ্য পাঠাতে ১০৭ টাকা খরচ হতো, এখন তা বেড়ে প্রায় ১৫০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। একইভাবেসমুদ্রপথে কনটেইনার ভাড়া দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে।

ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের সংকট : রপ্তানি খাতের বড় একটি অংশ ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের নিয়ে গঠিত। এদের অনেকেই প্রথমে আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশ করে পরে মধ্যপ্রাচ্যে ব্যবসা সমপ্রসারণ করেন। বর্তমান সংকটে এই উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ঢাকার একটি খাদ্যপণ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের মালিক জানান, ‘রপ্তানি অনিশ্চিত হয়ে যাওয়ায় উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছি। অস্থায়ী শ্রমিকদের ছুটি দিতে হয়েছে।’

পণ্যভিত্তিক প্রভাব- বৈচিত্র্যের মধ্যেও ঝুঁকি : মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক ছাড়াও নানা ধরনের পণ্য রপ্তানি হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— পাটজাত পণ্য, খাদ্যপণ্য (বিস্কুট, পানীয়), সবজি, মসলা, পানপাতা, তামাক, জুতা। শুধু মসলা ও বিস্কুটই গত অর্থবছরে প্রায় ১০ কোটি ডলারের রপ্তানি আয় করেছে। সবজি রপ্তানির পরিমাণও প্রায় ৩ কোটি ডলার। এই বহুমুখী পণ্য তালিকা থাকা সত্ত্বেও পরিবহন সংকট পুরো রপ্তানি ব্যবস্থাকেই স্থবির করে তুলেছে।

পাট ও মৎস্য খাত- উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব : পাটজাত পণ্য রপ্তানিকারকরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের উৎপাদন কমিয়ে দিতে হচ্ছে। একটি পাটশিল্প প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, তাদের মোট রপ্তানির প্রায় অর্ধেকই পারস্য অঞ্চলে যায়। যুদ্ধ শুরুর পর সেই রপ্তানি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। একই অবস্থা হিমায়িত মৎস্য খাতেও। চট্টগ্রামের এক রপ্তানিকারক জানান, জাহাজভাড়া বেড়ে যাওয়ায় অর্ডার থাকা সত্ত্বেও পণ্য পাঠানো যাচ্ছে না।

তৈরি পোশাক খাতেও চাপ : মধ্যপ্রাচ্যে তৈরি পোশাক রপ্তানিও কম নয়। গত অর্থবছরে ১,১৪১টি প্রতিষ্ঠান প্রায় ৪১ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে ২৪১টি প্রতিষ্ঠানের জন্য এই অঞ্চলই প্রধান বাজার। ঢাকার একটি পোশাক কারখানার ব্যবস্থাপক জানান, ‘আমাদের পুরো রপ্তানিই সৌদি আরবনির্ভর। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে শিপমেন্ট বন্ধ হয়ে যাবে।’

বাজার সমপ্রসারণে বাধা : মধ্যপ্রাচ্যকে বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনাময় বাজার হিসেবে দেখা হচ্ছিল। প্রবাসী বাংলাদেশিদের চাহিদার পাশাপাশি স্থানীয় বাজারেও পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছিল। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের বিশ্লেষকরা বলছেন, এই অঞ্চলে বাজার সমপ্রসারণের বড় সুযোগ ছিল, যা বর্তমান সংকটে সাময়িকভাবে থমকে গেছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো বছরে শত শত বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে। সেই বিশাল বাজারে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এখনো সীমিত হলেও সম্ভাবনা ছিল ব্যাপক।

সামগ্রিক বিশ্লেষণ- ঝুঁকি ও সম্ভাবনার দ্বৈত চিত্র : বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের একটি দুর্বল দিক সামনে এনে দিয়েছে অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা। একক বা সীমিত বাজারের ওপর নির্ভরশীলতা থাকলে যে কোনো ভূরাজনৈতিক সংকট সরাসরি অর্থনীতিতে আঘাত হানে। তবে একই সঙ্গে এটি একটি সুযোগও তৈরি করছে নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং পণ্য বৈচিত্র্য বাড়ানোর।

সর্বশেষ, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে তাৎক্ষণিক চাপ তৈরি করলেও এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে কতটা হবে, তা নির্ভর করছে পরিস্থিতির স্থায়িত্বের ওপর। ৫৮০টি প্রতিষ্ঠানের সরাসরি ঝুঁকিতে পড়া একটি বড় সতর্কবার্তা- শুধু ব্যবসায়ীদের জন্য নয়, নীতিনির্ধারকদের জন্যও। সংকট কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজন দ্রুত কূটনৈতিক তৎপরতা, বিকল্প রুট ব্যবহার এবং নতুন বাজারে প্রবেশের উদ্যোগ। অন্যথায়, এই সংকট বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে বড় ধরনের ধাক্কা হয়ে দেখা দিতে পারে।